বই পড়ে ও টিভি–রেডিও মেরামত করে কারাগারে ১ বছর রবিনিওর

রবিনিওকে ৯ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছেপ্রতীকী ছবি

একসময় ফুটবল মাঠে দাপট দেখিয়েছেন। খেলেছেন রিয়াল মাদ্রিদ, এসি মিলান, ম্যানচেস্টার সিটির মতো ক্লাবে। ব্রাজিলের সেই তারকা ফরোয়ার্ড রবিনিও এখন কারাগারের চার দেয়ালে বন্দী।

৪১ বছর বয়সী রবিনিওর অপরাধ সবার জানা। ২০১৩ সালে এসি মিলানে থাকতে এক আলবেনিয়ান নারীকে ইতালির একটি নৈশক্লাবে ধর্ষণ করেছিলেন। দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় দেশটির আদালত তাঁকে ৯ বছরের কারাদণ্ড দেন। কিন্তু রায়ের আগেই তিনি ইতালি ছেড়ে যাওয়ায় ব্রাজিল সরকারকে শাস্তি কার্যকরের আহ্বান জানান ইতালির সর্বোচ্চ আদালত।

শাস্তি কার্যকর করতেই গত বছর মার্চের শেষ দিকে রবিনিওকে গ্রেপ্তার করে ব্রাজিলের ফেডারেল পুলিশ। এরপর থেকে তাঁর জীবন কাটছে সাও পাওলোর ত্রেমেম্বে কারাগারে। সম্প্রতি সাবেক এই ফুটবলারের কারাবন্দী জীবনের এক বছর পূর্ণ হয়েছে।

বিখ্যাত ও কুখ্যাত উভয় ধরনের ব্যক্তিদের কারাগার হিসেবে ত্রেমেম্বের সুনাম আছে। সেখানে যেমন লুইস এস্তেভাওয়ের মতো রাজনীতিবিদ, পিমেন্তা নেভেসের মতো সাংবাদিক জেল খাটছেন আবার ক্রিস্তিয়ান ক্রাভিনিওস, আলেক্সান্দার নার্দোনির মতো খুনিরাও আছেন।

সাও পাওলোর ত্রেমেম্বে কারাগারে বন্দী রবিনিও
ছবি: এএফপি

কারাগারে রবিনিওর এক বছর কীভাবে কেটেছে, তা নিয়ে একটি প্রতিবেদন করেছে স্প্যানিশ ক্রীড়া দৈনিক মার্কা। সংবাদপত্রটিকে রবিনিওর আইনজীবী মারিও রোসো অনেক তথ্যই দিয়েছেন।

ব্রাজিলের কারা আইন অনুযায়ী, কোনো কয়েদি ভালো আচরণ ও ভালো কাজ করলে তাঁর সাজা কমানোর সুযোগ থাকে, এমনকি প্যারোলে মুক্তিও পেতে পারেন। রবিনিও এখন সেদিকেই মনোযোগী।

ত্রেমেম্বে কারাগারে আট বর্গমিটারের একটি কক্ষে আছেন রবিনিও। তাঁর সঙ্গে ২২ বছর বয়সী এক যুবক আছেন, যাঁকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

ব্রাজিলের একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, কারাগারে রবিনিওর আচরণ অনেকের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে। অন্য বন্দীদের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক খুব ভালো। কারাগারে রবিনিও নতুন চাকরিও পেয়েছেন।

গত বছর গ্রেপ্তার হওয়ার পর ১০ দিন একটি আইসোলেশন সেলে ছিলেন রবিনিও। পরে তাঁকে সাধারণ সেলে স্থানান্তর করা হয়। আইনজীবী মারিও রোসো বলেছেন, ‘সে (রবিনিও) মাথা নিচু করে চুপচাপ কারাগারের দিকে এগিয়ে গেছে। তাকে আদর্শ বন্দী বলা যেতে পারে। অন্য বন্দীদের সঙ্গে তার কোনো সমস্যা হয়নি। নিজেকে সে নানা কাজে ব্যস্ত রাখে।’

ব্রাজিলের হয়ে ১০০ ম্যাচ খেলেছেন রবিনিও
ছবি: সিবিএফ

রোদ পোহানোর সময় রবিনিও প্রায় দিনই খেলাধুলায় অংশ নেন। ফুটবল খেলার সময় অন্যদের কাছ থেকে বুট ধার নেন। কারাগারেই তিনি ৬০০ ঘণ্টার ইলেকট্রনিকস কোর্স করেছেন। এখন তিনি টেলিভিশন ও রেডিও মেরামত করেন।

বই পড়ুয়াদের ক্লাবেও ভর্তি হয়েছেন রবিনিও। এ ছাড়া তিনি সবজি বাগানের পরিচর্যা করেন। সম্প্রতি কাজের বিনিময়ে শিক্ষা ও নাগরিকত্ব কর্মমূচির ১০টি মডিউল সম্পন্ন করেছেন রবিনিও। প্রতি ১২ ঘণ্টা কাজের জন্য তাঁর শাস্তির মেয়াদ একদিন করে কমানো হচ্ছে।  

রবিনিওর সঙ্গে দেখা করতে কারাগারে শুধু নিকটাত্মীয়রাই যেতে পারেন—বাবা, মা, স্ত্রী ও সন্তান। ১৭ বছর বয়সী ছেলে রবসন রবিনিও জুনিয়র মাসে অন্তত একবার বাবার সঙ্গে দেখা করে যান। রবসন জুনিয়র সম্প্রতি রবিনিওর শৈশবের ক্লাব সান্তোসের মূল দলে ডাক পেয়েছেন। বর্তমানে তিনি নেইমারের সতীর্থ।

রবিনিওর ছেলে রবসন জুনিয়র (বাঁয়ে) এখন সান্তোসে নেইমারের সতীর্থ
ছবি: ইনস্টাগ্রাম

রবিনিওর আত্মীয়রা তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলে জন্য মিষ্টি, গোশত, শাকসবজি, কোমল পানীয়, সালাদ, পোশাক (ফ্লিপ-ফ্লপস, শর্টস, সোয়েটার ইত্যাদি), দাবা বা চেকারের মতো খেলার উপকরণ, লেখার উপকরণ, বই বা সাময়িকী দিয়ে আসেন।

আলবেনিয়ান নারীকে ধর্ষণের অভিযোগ কখনোই অস্বীকার করেননি রবিনিও। তবে তিনি বারবার দাবি করে এসেছেন, ওই নারীর সঙ্গে তিনি খুব অল্প সময়েই ঘনিষ্ঠ হয়েছিলেন এবং সেই রাতে নৈশক্লাবে সবকিছু সম্মতির ভিত্তিতেই করেছিলেন। যেহেতু তিনি কনডম ব্যবহার করেছিলেন, তাই পুলিশ তাঁর ডিএনএ পরীক্ষায় কোনো নমুনা পায়নি।

এ ব্যাপারে এক সাক্ষাৎকারে রবিনিও বলেছিলেন, ‘চাইলে আমি অস্বীকার করতে পারতাম। কারণ, আমার ডিএনএ সেখানে নেই। কিন্তু আমি মিথ্যাবাদী নই। আমাদের সম্পর্ক অতি-প্রাকৃতিক এবং দ্রুত হয়েছিল। সেখানে আরও লোকজন ছিল।’

এমন সুখের সংসার থাকতেও বিপথে পা বাড়িয়েছিলেন রবিনিও
ছবি: ইনস্টাগ্রাম

২০২০ সালে ইতালির রাজধানী রোমের আদালত জানায়, রবিনিওসহ ছয়জন ওই রাতে সেই নারী ধর্ষণ করেন এবং তাঁরা সবাই ব্রাজিলিয়ান। তাঁদের একজন রিকার্দো ফালকো রবিনিওর বন্ধু, আরেকজন রুদনি গোমেজ রবিনিওর দেহরক্ষী ছিলেন। এই সপ্তাহেই ৪৬ বছর বয়সী রুদনি গোমেজের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি আত্মহত্যা করেছেন।