ট্রাম্প-জেলেনস্কির নজিরবিহীন বাগ্বিতণ্ডার পর ইউক্রেনে শান্তি ফেরানোর লক্ষ্যে তৎপর হয়েছে ইউরোপ। ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়ার সঙ্গে একটি সমঝোতা করতে লন্ডন সম্মেলনে আলোচনায় বসেছেন ইউরোপের নেতারা। যুক্তরাষ্ট্রকে সঙ্গে নিয়েই এটা করতে চান তাঁরা। ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও তাঁদের এ সম্মেলনের লক্ষ্য।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের আহ্বানে লন্ডনে এ সম্মেলন শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ সময় রোববার রাত সাড়ে আটটার দিকে এ সম্মেলনে ইউরোপের এক ডজনের বেশি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানেরা এতে যোগ দিয়েছেন।
গত শুক্রবার হোয়াইট হাউসে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের বাগ্বিতণ্ডা হয়। এরপর জেলেনস্কি ও ইউক্রেনের পাশে দাঁড়িয়েছেন ইউরোপের নেতারা। লন্ডন সম্মেলন শুরু হওয়ার আগেই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেছেন, ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও ইউক্রেনে শান্তি ফেরানোর জন্য করণীয় ঠিক করা হবে এ সম্মেলনের লক্ষ্য।
যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের ওপর থেকে সমর্থন পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে এবং এর ফলে দেশটি রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে আরও ‘ব্যাকফুটে’ চলে যাবে—ইউরোপের শঙ্কার মধ্যে এ সম্মেলন হচ্ছে। হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে ট্রাম্প ও ভ্যান্সের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডার পরদিন ওয়াশিংটন থেকে লন্ডনে যান জেলেনস্কি। ইউরোপের নেতাদের গতকালের সম্মেলনে তিনিও যোগ দিয়েছেন।
সম্মেলন শুরুর আগে রোববার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্টারমার বলেন, হোয়াইট হাউসের ওই বৈঠকের পর ট্রাম্প, জেলেনস্কি ও ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর সঙ্গে তিনি একাধিকবার ফোনালাপ করেন। স্টারমার বলেন, ইউক্রেনে শান্তি ফেরাতে একটি পরিকল্পনা তৈরির লক্ষ্যে ইউরোপের নেতাদের একজোট হয়ে কাজ করতে হবে। নিজেরা আলোচনা করে পরিকল্পনা প্রণয়নের পর তা উপস্থাপন করা হবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে।
স্টারমার বলেছেন, ‘ইউরোপের প্রতিটি দেশের সঙ্গে আলোচনা করতে চাইলে সময়ক্ষেপণ হবে। আমরা এ বিষয়ে কাজ করতে আগ্রহীদের নিয়ে সম্ভবত একটি জোট করতে পেরেছি। এ বিষয়ে সবচেয়ে এগিয়ে আছে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স। এ কারণে আমি ও প্রেসিডেন্ট মাখোঁ এ পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছি। আমরা নিজেরা আলোচনা করে পরিকল্পনা তৈরির পর তা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তুলে ধরা হবে।’
মূল্য লক্ষ্য ইউক্রেনে শান্তি ফেরানো
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার আগে থেকেই বলে আসছিলেন, তিনি দায়িত্ব নিয়েই ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করবেন। গত ২০ জানুয়ারি তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর এ লক্ষ্যে কাজও শুরু করে ট্রাম্প প্রশাসন। কিন্তু ট্রাম্পের সঙ্গে জেলেনস্কির বাগ্বিতণ্ডার পর সেই তৎপরতায় ভাটা পড়েছে। এরপরই মূলত এ বিষয়ে উদ্যোগী হয়েছেন স্টারমার ও মাখোঁ।
জেলেনস্কিকে দলবদলসহ হোয়াইট হাউস থেকে কার্যত ‘বের করে দেন’ ট্রাম্প। পাশাপাশি ইউক্রেনকে মার্কিন সহায়তা বন্ধ করে দেওয়ারও হুমকি দিয়েছেন। লন্ডন সম্মেলনের মূল লক্ষ্য ইউক্রেনে শান্তি ফেরাতে একটি পরিকল্পনা তৈরি করা হলেও যেকোনো শান্তি আলোচনা শুরুর আগে কিয়েভকে ইউরোপ কীভাবে সহায়তা করবে, তা বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের কাছে জানতে চাইবেন স্টারমার।
গতকাল সম্মেলন শুরুর আগে স্টারমার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে বলেন, ‘আমাদের এমন একটি উপায় খুঁজে বের করতে হবে, যেখানে আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে পারব। কারণ, তিন বছর ধরে রক্তক্ষয়ী এ সংঘাত চলছে। এখন আমাদের টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করতে হবে।’
যুদ্ধ বন্ধে ইউক্রেনের সঙ্গে রাশিয়ার সম্ভাব্য একটি শান্তি সমঝোতার জন্য সব নেতাকে এক করেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি ট্রাম্পকেও তিনি বোঝাতে চাচ্ছেন যে ইউরোপ নিজেদের আত্মরক্ষার জন্য নিজেরাই একজোট হয়ে এগিয়ে আসতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, সম্মেলনে অংশ নেওয়া ইউরোপীয় নেতাদের কেউ কেউ ট্রাম্পের সঙ্গে আবার আলোচনার জন্য জেলেনস্কিকে উৎসাহ দিতে পারেন।
ইউরোপের দেশগুলোর এ উদ্যোগ নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সঙ্গেও সম্পর্কিত। এ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, বিশেষ করে সামরিক জোট ন্যাটোকে শক্তভাবে টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি। ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক জোট ন্যাটোর বর্তমান সদস্য ৩২টি দেশ। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ ১২টি দেশ এই জোটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। গত বছরের মার্চে সুইডেন সর্বশেষ সদস্য হিসেবে এই জোটে যুক্ত হয়। ট্রাম্প এবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর গত জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার আগেই এই জোটের জন্য সদস্যদেশগুলোর কম চাঁদা দেওয়া নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। ওই সময় তিনি এসব দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশ ন্যাটোর পেছনে ব্যয় করা উচিত বলে মন্তব্য। ২০২৩ সালে জোটের সদস্যরা জিডিপির ২ শতাংশ করে বার্ষিক চাঁদা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
রোববার লন্ডন সম্মেলনে যোগ দেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ, জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎজ, ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেন, ন্যাটোর প্রধান মার্ক রুটে। পোল্যান্ড, ডেনমার্ক, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, স্পেন, কানাডা, ফিনল্যান্ড, সুইডেন, চেক প্রজাতন্ত্রের নেতারাও লন্ডন সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন। এতে অংশ নিয়েছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও।
ইউক্রেনের পক্ষে বিক্ষোভ
ট্রাম্প-জেলেনস্কি বৈঠকে বাগ্বিতণ্ডার পর ইউক্রেনের সমর্থনে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ হয়েছে। বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার নিউইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেস বোস্টনসহ কয়েকটি শহরে বিক্ষোভ করেন হাজারো মানুষ। তাঁরা জেলেনস্কির সঙ্গে ট্রাম্পের আচরণের নিন্দা জানিয়েছেন।
ভারমন্ট অঙ্গরাজ্যের ওয়েস্টফিল্ড শহরে বিক্ষোভকারীদের হাতে ইউক্রেনের সমর্থনসংবলিত বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। বিক্ষোভের সময় পরিবার নিয়ে সেখানে সফর করছিলেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিক্ষোভের মুখে পরিবারসহ জেডি ভ্যান্সকে ‘অজানা’ এক স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়।
ট্রাম্প প্রশাসনের নানা হঠকারী সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ভারমন্টে গত সপ্তাহেও বিক্ষোভ হয়েছে। বিক্ষোভের আয়োজকদের একজন জুডি ডালি বলেন, ‘আমার মনে হয়, শুক্রবার হোয়াইট হাউসের সে কাণ্ড ঘটে গেল, তা-ই আরও বেশি মানুষকে বিক্ষোভে টেনে এনেছে। ভ্যান্সই সেদিন সীমা অতিক্রম করেছিলেন।’