যুক্তরাষ্ট্রে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসতে চলেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ২০ জানুয়ারি শপথ নেবেন তিনি। ট্রাম্প নিজের মতো করে যুক্তরাষ্ট্রকে সাজাতে চান। তাঁর পক্ষে একা এ কাজ করা সম্ভব নয়। তাই আস্থাভাজন ব্যক্তিদের নিয়ে প্রশাসন সাজাচ্ছেন তিনি। তাঁর প্রশাসনের শীর্ষস্থানীয় পদগুলোর জন্য তিনি যাঁদের বেছে নিয়েছেন, তাঁদের সবাই তাঁর প্রতি দারুণভাবে অনুগত। যদিও এই কর্মকর্তাদের কাউকে কাউকে নিয়োগ পেতে কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটের অনুমোদন লাগবে। আসুন, দেখে নেওয়া যাক ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষস্থানীয় ১০ পদে স্থান পাওয়া এই ব্যক্তিরা কারা, কীই–বা তাঁদের পরিচয়—
ট্রাম্প তাঁর দেশের নিরাপত্তা সামলাতে বেছে নিয়েছেন সাউথ ডাকোটা অঙ্গরাজ্যের গভর্নর ক্রিস্টি নোয়েমকে। ক্রিস্টি প্রথম পুরো দেশের নজর কেড়েছিলেন কোভিড মহামারির সময়। সেবার তিনি লকডাউন জারি ও মাস্ক পরার বাধ্যবাধকতা নিয়ে জোরালো ভাষায় আপত্তি জানিয়েছিলেন।
নোয়েম বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সীমান্ত নীতিরও তীব্র সমালোচনা করেছেন। শরণার্থীদের নিয়ে তিনি বলেছেন, ‘প্রত্যেক অবৈধ এলিয়েনের আমাদের দেশে এসে প্রথম কাজ হলো, আইন ভঙ্গ করা।’ গভর্নর নোয়েম আফগান শরণার্থীদের গ্রহণ করতেও অস্বীকার করেছেন। তিনিই প্রথম গভর্নর যিনি সীমান্তে পাহারা দেওয়ার জন্য তাঁর অঙ্গরাজ্যের ন্যাশনাল গার্ড সদস্যদের টেক্সাসে পাঠান। ট্রাম্পও শরণার্থীদের নিয়ে একই রকম মনোভাব পোষণ করেন।
এবারের নির্বাচনী প্রচারের সময় ট্রাম্প খুবই জোরালো গলায় যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত নিশ্ছিদ্র করা ও অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করা ব্যক্তিদের বিতাড়িত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। প্রতিশ্রুতি পূরণে নিজের ‘সীমান্ত জার’ হিসেবে তিনি সম্ভবত সেরা লোকটিই বেছে নিয়েছেন। আইন প্রয়োগ ও সীমান্তে কয়েক দশক ধরে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে টম হোম্যানের। হোম্যান একজন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের সাবেক ভারপ্রাপ্ত পরিচালক।
ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে অভিবাসন বিষয়ে বিতর্কিত একটি নীতি গ্রহণ করেছিলেন। ট্রাম্পের ওই নীতিতে অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করা বাবা-মা বা অভিভাবকদের থেকে তাঁদের শিশুদের আলাদা করে ফেলা হয়। একেবারে শুরুতে এ নীতির পক্ষে যাঁরা সরব হয়েছিলেন, তাঁদের একজন হোম্যান।
২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেতে ট্রাম্পের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছিলেন মার্কো রুবিও। দুজন পরস্পরের বিরুদ্ধে বিদ্বেষভরা বক্তব্যও দিয়েছেন। যদিও রুবিও সেবার ট্রাম্পকে সমর্থন জানিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। গত কয়েক বছরে ট্রাম্পের পক্ষে রীতিমতো সরব ছিলেন রুবিও, বিশেষ করে এবারের (২০২৪) নির্বাচনী প্রচারের সময় ও সংবাদমাধ্যমের সামনে। ২০১১ সাল থেকে ফ্লোরিডার সিনেটরের দায়িত্ব পালন করছেন রুবিও। সিনেটের গোয়েন্দা ও পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির অংশ হিসেবে তিনি ইরান, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও চীনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাইকেল ওয়ালৎস একজন কংগ্রেস সদস্য। রুবিওর মতো তিনিও ফ্লোরিডার একজন প্রতিনিধি ও কট্টর চীনবিরোধী। ২০২২ সালে বেইজিংয়ে শীতকালীন অলিম্পিক বয়কট করার ডাক উঠেছিল যুক্তরাষ্ট্রে। প্রথম যে কয়জন কংগ্রেস সদস্য ওই ডাক দিয়েছিলেন, তাঁদের একজন ওয়ালৎস। তিনি বর্তমান জো বাইডেন প্রশাসনের তীব্র সমালোচনা করেছেন। আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করে নেওয়াতেও জোরালো আপত্তি ছিল তাঁর।
বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক। দীর্ঘদিন তিনি নিজেকে রাজনীতির বাইরে রেখেছিলেন। কিন্তু ট্রাম্পের এবারের নির্বাচনী প্রচারশিবিরে সবচেয়ে বেশি অর্থ দেওয়া ব্যক্তিদের একজন ছিলেন তিনি। সহায়তা হিসেবে শুধু অর্থ দিয়েই শেষ নয়, নানা সমাবেশে ট্রাম্পের সঙ্গে মঞ্চেও উঠেছেন। গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যগুলোতে ট্রাম্পের পক্ষে নানা অনুষ্ঠান আয়োজন করেছেন। ট্রাম্প নির্বাচনে জেতার পর ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিশিয়েন্সি নামে নতুন একটি বিভাগ চালু করছেন। যে বিভাগের কাজ হবে সরকারের ব্যয় কমানো। আর এ বিভাগের প্রধান হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছেন মাস্ককে।
মাস্কের পাশাপাশি নিজের ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিশিয়েন্সির জন্য আরও একজন প্রধান বেছে নিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি ভারতীয় বংশোদ্ভূত বিবেক রামাস্বামী। প্রযুক্তি খাতের এ উদ্যোক্তা, অধিকারকর্মী ও বিনিয়োগকারী এবারের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি থেকে প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন। পরে প্রাথমিক বাছাইয়ে হেরে ট্রাম্পকে সমর্থন জানিয়ে সরে দাঁড়ান। এরপরই তিনি ট্রাম্পের পছন্দের তালিকায় চলে আসেন। রামাস্বামী বলেছেন, ‘এফবিআইয়ের সংস্কার সম্ভব নয়। এটাকে বন্ধ করে দিন। প্রেসিডেন্ট (ট্রাম্প) এটা করতে পারেন। আমিও।’
যুক্তরাষ্ট্রের এক খ্যাতনামা ডেমোক্র্যাট পরিবারের সন্তান রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়র নবনির্বাচিত ট্রাম্পের পছন্দের ব্যক্তিদের তালিকা জায়গা করে নিয়েছেন। ট্রাম্পের মতো কেনেডি জুনিয়রও টিকার ঘোরবিরোধী। একজন আইনজীবী ও পরিবেশকর্মী কেনেডি জুনিয়রকে ট্রাম্প তাঁর স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে বেছে নিয়েছেন। কেনেডি জুনিয়র বলেছেন, ‘অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার স্থূলতা মহামারির দিকে (মার্কিনদের) নিয়ে যাচ্ছে। যখন আমরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে হোয়াইট হাউসে ফিরে পাব ও আমি ওয়াশিংটনে, তখন আমরা আমাদের ভেঙে পড়া খাদ্যব্যবস্থাকে মেরামত করব এবং আমেরিকা আবার স্বাস্থ্যবান হয়ে উঠবে।’
একসময় ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সদস্য। রাজনীতি করেছেন ডেমোক্রেটিক পার্টির হয়ে। পরে রিপাবলিকান পার্টিতে যোগ দেন। তাঁর নাম তুলসী গ্যাবার্ড। ট্রাম্প নির্বাচনে জেতার পর তুলসীকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক হিসেবে বেছে নিয়েছেন। ট্রাম্পকে নিয়ে তুলসী বলেন, ‘আমরা আমাদের নেতার কাছ থেকে যেমনটা আশা করি, তিনি (ট্রাম্প) তেমনটা সাহস দেখান। শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে একজন নেতার প্রতিপক্ষ, একনায়ক, মিত্র ও অংশীদারদের মুখোমুখি হওয়ার সাহস থাকতে হয়; যুদ্ধকে সর্বশেষ উপায় হিসেবে দেখতে হয়।’
ছবি: 8.Tulsi Gabbard
ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারশিবিরের বড় অর্থদাতাদের একজন হাওয়ার্ড লুটনিক। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের শতকোটিপতি প্রধান নির্বাহীদের একজন। ট্রাম্পের আর্থিক নীতি বিশেষ করে শুল্ক বাড়ানোর পক্ষে সব সময় সরব থেকেছেন তিনি। লুটনিক ট্রাম্পের ক্ষমতাগ্রহণ প্রক্রিয়া দলের (ট্রানজিশন টিম) উপপ্রধান। তাঁকেই নিজের বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে বেছে নিয়েছেন ট্রাম্প।
নিজের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা স্কট বেসেন্টকে অর্থমন্ত্রী হিসেবে বেছে নিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। হেজ ফান্ডে দীর্ঘদিনের বিনিয়োগকারী বেসেন্ট ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ কয়েক বছর শিক্ষকতা করেছেন। ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর উষ্ণ সম্পর্ক রয়েছে। শুল্কের ব্যবহার বিষয়ে ট্রাম্পের নীতির পক্ষে তাঁকে কথা বলতে শোনা গেছে। শুল্কারোপ নিয়ে তিনি বলেছেন, ‘আমেরিকান পরিবার ও ব্যবসায়ীদের জীবনযাত্রা আরও উন্নত করতে শুল্কের শক্তিকে ব্যবহার করতে আলেক্সান্ডার হ্যামিল্টনের মতো আমাদেরও ভয় পাওয়া উচিত নয়।’ তিনি আমদানির ওপর ট্রাম্পের নতুন করে শুল্কারোপের ঘোষণাকে সমর্থন করেছেন।