ভূমিকম্পের দ্বিতীয় দিনে মিয়ানমার-থাইল্যান্ডে এখন পর্যন্ত যা জানা গেল

ভূমিকম্পে ধ্বসে পড়েছে অনেক ভবন। মান্দালয়, মিয়ানমারছবি: রয়টার্স

মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডে গতকাল শুক্রবার আঘাত হানা শক্তিশালী ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত এক হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আহত হয়েছেন কয়েক হাজার। ভূমিকম্পে মিয়ানমারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সবচেয়ে বেশি। সড়ক যোগাযোগ, চিকিৎসাসেবা ও মুঠোফোন নেটওয়ার্ক ব্যাহত হচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে চোখে পড়ছে ধ্বংসস্তূপ। এমন অবস্থায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সহায়তা নিয়ে এগিয়ে এসেছে। ভূমিকম্পের দ্বিতীয় দিনে যা জানা যাচ্ছে—

ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিল মিয়ানমারের দ্বিতীয় বড় শহর মান্দালয় থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে সাইগাইংয়ে। ভূমিকম্পের পর সেখানকার একটি সড়কের দৃশ্য। সাইগাইং, মিয়ানমার
ছবি: এএফপি

শক্তিশালী ও অগভীর

ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল মিয়ানমার। গতকাল শুক্রবার দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে আঘাত হানে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প। এর কয়েক মিনিটের মধ্যে ৬ দশমিক ৭ মাত্রার পরাঘাত (আফটার শক) আঘাত হানে। কয়েক দশকের মধ্যে মিয়ানমারে আঘাত হানা সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্প ছিল এটি।

শুধু মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডই নয়, ভারতের পশ্চিমাঞ্চল, চীনের পূর্বাঞ্চল, বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া ও লাওসেও ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে।

ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিল মিয়ানমারের দ্বিতীয় বড় শহর মান্দালয় থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে সাইগাইংয়ে।

থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে ভবন ধ্বসে নিখোঁজদের সন্ধানে অপেক্ষা করছেন স্বজনেরা। ব্যাংকক, থাইল্যান্ড
ছবি: এএফপি

প্রাণহানি ১ হাজার ছাড়িয়েছে

মিয়ানমারের জান্তা সরকার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ভূমিকম্পে ১ হাজার ২ জন নিহত ও ২ হাজার ৪০০ জন আহত হয়েছেন।

জান্তাপ্রধান মিন অং হ্লাং সতর্ক করে বলেছেন, ভূমিকম্পের কারণে দেশজুড়ে এত ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে যে প্রাণহানি আরও বাড়তে পারে।

চার বছর ধরে মিয়ানমারের ক্ষমতা জান্তা সরকারের হাতে। এর মধ্যে দেশটিতে চলছে গৃহযুদ্ধ। দেশটির জরুরি সেবা ও স্বাস্থ্য পরিষেবারও ভঙ্গুর দশা। তাই এ ধরনের দুর্যোগ সামাল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও সরঞ্জাম নেই দেশটির।

অন্যদিকে পর্যটনের দেশ থাইল্যান্ডে ১০ জন নিহত হয়েছেন। তাঁদের বেশির ভাগেরই মৃত্যু হয়েছে নির্মাণাধীন আকাশচুম্বী অট্টালিকা ধসে। ওই নির্মাণধীন ভবনের নিচে আরও শতাধিক নির্মাণশ্রমিক আটকা পড়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে উদ্ধার অভিযান চালানো হচ্ছে। তা দেখতে ভিড় করেছেন উৎসুক এলাকাবাসী। মান্দালয়, মিয়ানমার
ছবি: এএফপি

চারদিকে শুধুই ধ্বংসস্তূপ

ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে মিয়ানমারে। দেশটির মান্দালয় শহরে ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছে। সেখানে অসংখ্য ভবন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ওই সব এলাকায় ধুলায় মোচড়ানো ধাতুর আস্তরণ পড়েছে। এমন অবস্থায় উদ্ধারকাজ চালানো চেষ্টা করছে।

সাইগাইংয়ে ইরাবতী নদীর ওপর অবস্থিত আভা সেতুটি প্রায় ১০০ বছর আগের। ভূমিকম্পের কারণে সেতুটি নদীতে ভেঙে পড়েছে।

শুধু ভবন কিংবা রাস্তাঘাটই নয়, ভূমিকম্পের কারণে মিয়ামনারের বিমানবন্দরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মান্দালয় বিমানবন্দরটি। ফলে ত্রাণ কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে বলে জানিয়েছে রেডক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি।

এএফপির প্রতিবেদকেরা নেপিডোতে বিভিন্ন ভবন ধসে পড়তে দেখেছেন। দেখেছেন ফাটল ধরা সড়ক। ভূমিকম্পের কারণে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে প্রবেশ করা যাচ্ছে না। তাই রোগীদের বাইরে বসেই সেবা দিতে হচ্ছে রাজধানীর হাসপাতালগুলোকে।

ভূমিকম্পের কারণে মিয়ানমারের বিদ্যুৎসেবা ব্যাহত হচ্ছে। দেশটির বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ–বিভ্রাট দেখা দিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। ইয়াঙ্গুনে সীমিতভাবে চার ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর যোগাযোগব্যবস্থাও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক মূলত বিচ্ছিন্ন।

থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে একটি ভবনের ওপর ক্রেন ভেঙে পড়েছে। এ কারণে মেট্রোরেল ও অন্যান্য রেল পরিষেবা বন্ধ রাখা হয়েছে।

ব্যাংকক নগর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের শত শত বাসিন্দা পার্কে রাত কাটিয়েছেন। তাঁরা হয় বাড়ি ফিরতে পারছেন না, অথবা তাঁদের ভবনের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত।

আহতদের দেখতে হাসপাতালে এসেছেন মিয়ানমারের জান্তাপ্রধান। নেপিডো, মিয়ানমার
ছবি: এপি

সাহায্যের আবেদন

ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা এতটাই যে মিয়ানমারের বিচ্ছিন্ন জান্তা সরকার আন্তর্জাতিক সহায়তার আবেদন করতে বাধ্য হয়েছে। মিয়ানমারের জান্তাপ্রধান ‘যেকোনো দেশ, যেকোনো সংস্থাকে’ ত্রাণসহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বলেছেন, ‘বিদেশি সাহায্যের জন্য সব পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছে’ তাঁর সরকার।

বিভিন্ন দেশ থেকে মিয়ানমারে ত্রাণ পাঠানো হয়েছে।
ছবি: এএফপি

আজ শনিবার প্রতিবেশী ভারত থেকে ইয়াঙ্গুনে একটি ত্রাণবাহী উড়োজাহাজ পৌঁছেছে। এর মধ্যে স্বাস্থ্যবিধির সরঞ্জাম, কম্বল, প্যাকেটজাত খাবার এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নও সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। এর আগে চীন উদ্ধারকারীদের একটি দল মিয়ানমারে পাঠিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলছেন, সাহায্যের বিষয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে ওয়াশিংটন ‘ইতিমধ্যেই কথা বলেছে।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, প্রাণ ও স্বাস্থ্যর জন্য হুমকি, এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি সহায়তা পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা।