দুই বছর পর প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের আবার নিয়ন্ত্রণ নিল সুদানের সেনাবাহিনী

প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে আরএসএফের ড্রোন হামলায় নিহত পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দিতে এসেছেন সুদানের সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান। আল-গাদারিফ শহরে, ২১ মার্চ ২০২৫ছবি: রয়টার্স

সুদানের সেনাবাহিনী দুই বছর পর রাজধানী খার্তুমে প্রেসিডেন্টের প্রাসাদ পুনরায় নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। দুই বছর আগে দেশটিতে সংঘাতের শুরুর দিকে আধা সামরিক র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ) প্রাসাদটি দখল করেছিল।

সেনাবাহিনীর সদস্যরা সম্প্রতি প্রাসাদের কাছাকাছি চলে আসে। এ অবস্থায় সেনাসমর্থিত সরকার গত শুক্রবার প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ঘোষণা দিল।

সুদানের তথ্যমন্ত্রী খালেদ আল-আইসার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘আজ (শুক্রবার) আমরা পতাকা উত্তোলন করেছি, প্রাসাদ এখন আমাদের হাতে। বিজয় সম্পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত আমাদের লড়াই চলবে।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে সেনাসদস্যদের প্রাসাদ কমপ্লেক্সে উল্লাস করতে দেখা গেছে।

২০২৩ সালের এপ্রিলে সুদানে সংঘাতের শুরুর দিকে আরএসএফ প্রাসাদ কমপ্লেক্স এবং রাজধানী খার্তুমের বড় অঞ্চল দখল করে নেয়।

আরএসএফ প্রাসাদ কমপ্লেক্স দখলে নেওয়ার পর সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহানের নেতৃত্বাধীন সরকার রাজধানী ছেড়ে লোহিত সাগরের উপকূলীয় শহর পোর্ট সুদানে সরে যেতে বাধ্য হয়।

প্রেসিডেন্টের প্রাসাদ কমপ্লেক্সে দুটি ভবন রয়েছে। মূলটি ওসমানী-মিসরীয় প্রজাতন্ত্রের প্রাসাদ, যা তৈরি করা হয়েছিল ১৮২৫ সালে। পরে ২০১৫ সালে সেখানে সবচেয়ে বড় প্রাসাদটি তৈরি করেন দেশটির ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশির।

আদি ভবনটি ছোট হলেও সেটি প্রতীকীভাবে বেশ গুরুত্বপূর্ণ, এটাকে তখন প্রজাতন্ত্রের প্রাসাদ বলা হতো। নিজেকে ইমাম মাহদি এবং মিসরের শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণাকারী মুহাম্মদ আহমদ বিন আবদুল্লাহর অনুসারীরা ১৮৮৫ সালে বিখ্যাত ব্রিটিশ মেজর জেনারেল চার্লস জর্জ গর্ডনকে রিপাবলিকান প্রাসাদের সিঁড়িতে হত্যা করেছিল।

চার্লস জর্জ গর্ডন ইতিহাসে ‘গর্ডন পাশা’ হিসেবে পরিচিত। তাঁর হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে উত্তর আফ্রিকার দেশটিতে ওসমানি-মিসরীয় শাসনের অবসান ঘটে।

দুই বছর আগে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর নতুন ও পুরোনো দুটি ভবনই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ড্রোন হামলা

নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে একটি ড্রোন দিয়ে হামলা চালিয়েছে আরএসএফ। এতে তিনজন সাংবাদিক নিহত হন। তাঁরা সুদানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের জন্য সেখানে কাজ করছিলেন।

আরএসএফ জানিয়েছে, তারা প্রাসাদের আশপাশেই রয়েছেন। লড়াই এখনো ‘শেষ হয়নি’।

গত কয়েক মাসে সুদানের মধ্যাঞ্চলে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থান নিয়ন্ত্রণে নেয় সেনাবাহিনী। এতে সেখানে আরএসএফ ক্রমে কোণঠাসা হয়ে পড়ে।

তবে পশ্চিম দিকের অঞ্চল দারফুরে নিজেদের অবস্থান আরও মজবুত করেছে আরএসএফ। আধা সামরিক বাহিনীটি সেখানে গণহত্যা চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

প্রেসিডেন্টের প্রাসাদ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর সুদানের সেনাবাহিনীর সদস্যদের উল্লাস। রাজধানী খার্তুমে প্রেসিডেন্টের প্রাসাদে, ২১ মার্চ ২০২৫
ছবি: রয়টার্স

কানাডাভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা রাউল ওয়ালেনবার্গ সেন্টার গত বছর এক প্রতিবেদনে দাবি করে, দারফুরে আরএসএফ এবং মিত্র মিলিশিয়া অ-আরব গোষ্ঠীর ওপর গণহত্যা চালিয়েছে।

গণহত্যার অভিযোগে আরএসএফের নেতা মোহাম্মদ হামদান দাগালো ওরফে হেমেতির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহানের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ওয়াশিংটন।

আরএসএফকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয় সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। আর সুদানের সেনাবাহিনীর নেতৃত্বাধীন সরকারকে সহায়তা দেয় মিসর। গত মাসে কেনিয়াতে আরএসএফ নেতারা সেনাবাহিনীর সমান্তরালে নিজেদের সরকার গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। ইউএই এই সরকারকে সহায়তা দিচ্ছে বলে জানা গেছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতে সুদানে ‘লিবিয়ার মতো পরিস্থিতি’ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে; অর্থাৎ দেশটিতে একই সঙ্গে দুই বা ততোধিক সরকারের শাসন দেখা দিতে পারে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালে দীর্ঘ দিনের শাসক ওমর আল-বশির এক সামরিক অভ্যুত্থানে উৎখাত হন। এরপর দেশটি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেনাবাহিনী ও আরএসএফের দ্বন্দ্বে সেই সম্ভাবনা অকালে বিনাশ হয়।

সেনাবাহিনী ও আরএসএফের দুই বছরের সংঘাতে সুদানে এক কোটির বেশির মানুষ স্থানচ্যুত হয়েছে। ১ কোটি ২০ লাখের বেশি মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে রয়েছে। সেখানে দুই বছরে প্রাণ হারিয়েছে কয়েক হাজার মানুষ।