নেইমারের বিশৃঙ্খল দুনিয়াটা কেমন
নেইমার—নামটা শুনলেই চোখের সামনে একটি ছবি ভেসে ওঠে। অমিত প্রতিভাধর ফুটবলার। আমাদের সঙ্গে এই পৃথিবীতেই তাঁর বসবাস। কিন্তু তাঁর চারপাশটা আমাদের মতো নয়, খ্যাতি ও অর্থের সঙ্গে বড় বিশৃঙ্খলও। নানা রকম বিতর্কের ধোঁয়া। এমন সব ধোঁয়ায় বেষ্টিত কোনো মানুষকে কি বাইরে থেকে পুরোটা চেনা যায়? তাঁর ভেতরটাই–বা কতুটুকু বোঝা সম্ভব?
নেইমারকে যাঁরা বুঝতে চান, তাঁকে নিয়ে বিতর্ক, চোট ও প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে না পারার ধূসর-কালো ধোঁয়ার আস্তরণ ভেদ করে যাঁরা দেখতে চান আসল নেইমারকে; তারকা নয়, মানুষ নেইমার আসলে কেমন, কেমন তাঁর পরিবার, রোজকার জীবনটাই–বা কেমন, তাঁদের জন্য ২০২২ সালেই মুক্তি পেয়েছে নেটফ্লিক্সের ডকুসিরিজ ‘নেইমার: দ্য পারফেক্ট ক্যাওয়াস’।
গুগলে ‘পারফেক্ট ক্যাওয়াস’ শব্দটির অর্থ সার্চ করলে অর্থ আসে—এমন কেউ, পৃথিবীতে যার অস্তিত্ব বিশৃঙ্খলাপূর্ণ। তবে গভীরে তাকালে বোঝা যায়, সবকিছু সৃষ্টিকর্তার ইশারায় একদম নিখুঁত পরিকল্পনা অনুযায়ীই ঘটছে। নেইমারের জীবনও যেন তা–ই। বাইরে থেকে তাঁর জীবন ও ক্যারিয়ারে যে বিশৃঙখলা আমরা দেখি, এর সবকিছুতেই তাঁর ভূমিকা নেই। কিছু বিষয় আরোপিতও।
এই যে নেইমারকে ঘিরে মাঠে এত প্রত্যাশা, এত গলা–ফাটানো সমর্থন, এত সমালোচনা ও বিশ্লেষণ—এ সবকিছুই তাঁর জীবনে আসলে বিশৃঙ্খলাপূর্ণ কোলাহলের মতো। সমর্থকেরা আজ নেইমারকে গালি দিচ্ছেন তো কাল তাঁকে ভালোবেসে গলা–ফাটানো স্লোগানও ধরছেন। একটা পর একটা মৌসুম আসছে, একটার পর একটা টুর্নামেন্টে তাঁকে খেলতে হচ্ছে শিরোপা জয়ের চ্যালেঞ্জ নিয়ে। কোনোটায় পারছেন, কোনোটায় না। নেইমারের বাবা নেইমার সিনিয়র যেমন তথ্যচিত্রে বলছেন, এই পারা না–পারা মিলিয়েই নেইমার। আর এসব সাফল্য-ব্যর্থতার ভেতরে তাঁর ছেলের ‘নায়ক হয়ে ওঠার সম্ভাবনাই বেশি’।
ঠিক সে কারণেই নেইমারের জীবনে সব বিতর্ক ও বিশৃঙ্খলাকে মনে হয় পরিকল্পনা অনুযায়ী থরে থরে সাজানো, যেগুলো না থাকলে তাঁর ছেলের সামনে চ্যালেঞ্জ থাকত না, নেইমারেরও আর নেইমার হয়ে ওঠা হতো না। নেইমার সিনিয়র এটাও মনে করিয়ে দিয়েছেন, নিখুঁত বিশৃঙ্খলতার এই গল্প কিন্তু এখনো শেষ হয়নি। গল্প এখনো চলমান।
ব্রাজিলিয়ান ও গ্রিক বংশোদ্ভূত আমেরিকান পরিচালক ডেভিড চার্লস রদ্রিগেজ নেইমারের সেই চলমান গল্পেরই শুরু থেকে সিংহভাগ পর্যন্ত ক্যামেরায় বলার চেষ্টা করেছেন। তিন পর্বে বিভক্ত এই তথ্যচিত্রের প্রথম অংশটুকুর নাম, ‘দ্য গ্রেট ব্রাজিলিয়ান প্রমিজ’। মাঝের অংশটুকু, ‘দ্য কামব্যাক’ এবং তারপর শেষ অংশটুকুর নাম ‘দিস ইজ প্যারিস’।
সবাই জানেন, নেইমার নামের গল্পের শেষটা প্যারিসে হয়নি। পিএসজি ছেড়ে সৌদি আরবের ক্লাব আল হিলাল ঘুরে নেইমার ফিরেছেন তাঁর শিকড়ের ক্লাব সান্তোসে। এটা তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ পর্ব। তবে ক্যারিয়ারের মধ্যগগন ভাবলে এখন পর্যন্ত সেটা সান্তোস থেকে বার্সা ঘুরে পিএসজি পর্যন্তই। ১৬৪ মিনিটের ফ্রেমে ডেভিড সেই মধ্যগগন পর্যন্তই তাকিয়েছেন, আইএমডিবিতে যার রেটিং ৬.৬।
তথ্যচিত্রের শুরুতে নেইমারের কাছে জানতে চাওয়া হয়, তিনি এটা কীভাবে শুরু করতে চান? নেইমারের ইচ্ছা, সমালোচনাগুলো দিয়ে শুরু হোক। ‘নেইমার ইজ আ মনস্টার’, ‘নেইমার ইজ আ জার্ক’, ‘কেউ তাকে আচরণ শেখাক, নইলে আমরা একটি দৈত্যের জন্ম দিচ্ছি’...এসব। নেইমারের বাসায় কমিক চরিত্র ব্যাটম্যান ও খলনায়ক ‘জোকার’–এর মিশেলে একটি মুখায়বের ভাস্কর্য আছে, যার অর্ধেকটুকু ব্যাটম্যানের, বাকিটা জোকারের। নেইমার বলছেন, আমাকে চিনতে হলে আগে জোকার হয়ে তারপর ব্যাটম্যানে আসতে হবে। নেইমার সিনিয়রের যুক্তি তেমনটি না হলেও কাছাকাছি। তথ্যচিত্রে নিজের প্রথম ভূমিকাতেই নেইমার সিনিয়রের দাবি, এটা বানাতে হলে আপনাকে সত্যি সত্যিই নেইমারকে বুঝতে হবে। নইলে মানুষের কাছে ভুল বার্তা যাবে।
ডেভিড সঠিক বার্তাটুকু পৌঁছে দেওয়ার প্রয়াসে তথ্যচিত্রে কিছূ আসল ফুটেজ ব্যবহার করেছেন। যেখানে একটি ফুটেজ এমন, দেখতে আলাভোলা লিকলিকে গড়নের একটি বাচ্চা ছেলে খালি গায়ে বসে। নাম জিজ্ঞাসা করতেই ক্ষীণস্বরে ‘নেইমার’ বলাতে যেন দারিদ্রতাটুকুও স্পষ্ট। জোরে বলার কথা বলতেই ধীরে ধীরে বেরিয়ে এল নিজের নাম থেকে মা–বাবার নাম। তারপর পেলে!
ব্রাজিয়ের শয়ে শয়ে প্রতিভা অঙ্কুরে যে নাম ধারণ করে, নেইমারের বেড়ে ওঠাও সেভাবেই। তথ্যচিত্রের প্রথম ১০ মিনিটে নেইমারের পুরো ক্যারিয়ার খণ্ড খণ্ড ছবি ও ভিডিওতে দেখানো হয়। এরপর নেইমারের গল্পটা শুরু হয়, যার শুরু সাও পাওলোর প্রাইয়া গ্রান্দে থেকে। নেইমারের শৈশব ধারণ করেছে এই পৌরশহরের রাস্তাঘাট। বন্ধুদের সঙ্গে সেখানে ফুটবল খেলতে খেলতে বড় হওয়া। কিন্তু মাঠে যাওয়া তারও আগে। পেশাদার ফুটবলার বাবার সঙ্গে, দুই দল বিশ্রাম নেওয়ার সময় অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে সেই মাঠেও খেলেছন। ১৯৯৮ সালে তাঁকে ছয় বছর বয়সে আবিষ্কার করলেন সান্তোসের স্কাউট ও প্রয়াত কোচ বেতিনিও। সেই যে শুরু হলো।
বেতিনিওর মাধ্যমে নেইমার সান্তোসে যোগ দেওয়ার পর কী ঘটেছিল, সেটা তথ্যচিত্রে বলছেন ব্রাজিলের খ্যাতিমান সাংবাদিক জুকা কাফৌরি, ‘নেইমার যখন সান্তোসে খেলা শুরু করল, আমরা বললাম “অসম্ভব”। ভিলা বেলমিরোয় একই বজ্রপাত দুবার হলো। প্রথমবার আমরা পেলেকে পেয়েছি, এখন নেইমার।’
ভিলা বেলমিরোয় নেইমার কতটা আনন্দে ছিলেন, ফুটবল তখন কতটা রঙিন হয়ে উঠেছিল, সেটাই দেখানোর চেষ্টা করেছে ‘দ্য গ্রেট ব্রাজিলিয়ান প্রমিজ’ পর্ব। যার সবকিছুকে একসূত্রে গেঁথেছে ডেভিড বেকহামের কথা, ‘খেলা থেকে শুরু করে সে যা কিছু করে, সেটাই বিনোদন।’
সেই বিনোদনের চূড়ান্ত হলো কোপা লিবার্তোদোরেস জিতে। কারণ, স্পেন থেকে ডাক এসেছে। সেখানে যে নেইমার আগে যাননি, তা নয়। যে কাতালান শহরের ক্লাব থেকে ডাক এসেছে, তাদেরই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাবে ট্রায়াল দিয়ে টিকেও গিয়েছিলেন। কিন্তু নেইমারের মন টেকেনি সেখানে। আর শৈশবের স্বপ্ন সান্তোসে খেলা পূরণ হয়েছে তত দিনে। ব্রাজিল জাতীয় দলও তখন ‘নেইমার অ্যান্ড কোং’। কৈশোর পেরিয়ে তারুণ্যে পা রেখে নেইমার টের পেয়েছিলেন নতুন এক স্বপ্ন দানা বেঁধেছে তাঁর মধ্যে। বার্সেলোনা!
নেইমারের স্পেনে ফেরার দ্বিতীয় পর্বই তাঁর ক্যারিয়ারকে ধারণ করতে পারে। সাফল্যের চূড়া থেকে পতন বিতর্ক, প্রস্থান—সবই আছে। ২০১৪ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে তাঁর সেই প্রথম বড় চোট, বার্সেলোনার হয়ে ‘লা রেমোনতেদা’র নায়ক হয়ে ওঠা এবং তারপর বুঝে ফেলা, যতই নিংড়ে দাও না কেন, বার্সা আসলে লিওনেল মেসিরই দল। অতএব নিজের জন্য একটু আলাদা জায়গা পেতে হলে প্রস্থানই পথ! দলবদলের বিশ্ব রেকর্ড গড়ে নেইমার কেন সে পথে হাঁটলেন, তা নিয়ে বলেছেন স্বয়ং মেসি। লুইস সুয়ারেজ! আর শেষ দিকে জুকা কাফৌরি বলছেন, ‘নো ওয়ান লিভস বার্সেলোনা।’
বাকিটা আপনি বোঝেন ও জানেন। গোটা পৃথিবী এখনো সেই প্রশ্নে বিভক্ত, নেইমারের বার্সা ছাড়ার সিদ্ধান্ত ঠিক ছিল, না ভুল?
শেষ পর্ব দেখে মনে হতেই পারে ভুল ছিল। নেইমার নিজে বলছেন, দল হারলে কিংবা এটা থেকে সেটা হলেই আমার দোষ। প্রত্যাশার পাহাড়সমান চাপ তিনি নিতে পারেননি কিংবা চাননি, লিওনেল মেসি কিংবা শচীন টেন্ডুলকারের মতো ওভাবে প্রত্যাশার পাহাড়সমান চাপ নিয়ে খেলাটা হয়তো তাঁর স্টাইল নয়। নেইমার মানেই তো বলে প্রতি স্পর্শে বল্গাহীন আনন্দ, যেটা অনূদিত হয়েছে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনেও।
তথ্যচিত্রে নেইমারের ব্যক্তিগত জীবনও এসেছে ভালোভাবে। ছেলে দাভি লুকার প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা, বাবার কর্তব্য পালন, মা-বাবার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি। নেইমারের জীবনে তাঁর মা নাদিন আধ্যাত্মিক শক্তি হিসেবে দেখা দিয়েছেন এই তথ্যচিত্রে। দুনিয়াবি সব কাজকর্মে নেইমার এবং তাঁর বাবা ও এজেন্ট নেইমার সিনিয়র। আর সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনায় মা নাদিন।
বাবা এজেন্ট হওয়ায় সিনিয়রের সঙ্গে জুনিয়রের বাবা-ছেলে সম্পর্কটাও ঠিক শান্ত শীতলপাটির মতো নয়। সিনিয়রের দাবি, নেইমারকে তিনি রক্ষা করছেন। ছেলের ক্যারিয়ার শেষে তাঁর ব্র্যান্ডকে তিনি এমন অবস্থায় দেখতে চান, যেখান থেকে ছেলেকে যেন বিশ্লেষক বা ধারাভাষ্যকার হতে না হয়। তাই একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নেইমারের ব্র্যান্ডকে রক্ষার পাশাপাশি বড় করছেন। কিন্তু নেইমারকে বাবার প্রতি সব সময় শ্রদ্ধাশীল ও প্রসন্নও মনে হয়নি—এমন ফুটেজও আছে তথ্যচিত্রে।
ফুটেজ আছে আরও কয়েকটি। মাঝেমধ্যে নেইমারের শূন্য দৃষ্টি, যার অর্থ আমরা জানি না। তবে এটুকু বোঝা যায়, সেই শূন্য দৃষ্টিতে সান্তোসের জন্য ভালোবাসা, বার্সার দিনগুলো ছাড়াও নেইমারের পাঁজরে আরও একটি বিষয় টান মারে। সমর্থকদের প্রতি ভালোবাসা। তিনিও জানেন, প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় এই দোষারোপের খেলায় সব দোষ সমর্থকের নয়।
কেউ কেউ অবশ্য নেইমারকে এ সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখেন। যেমনটা রেখেছেন প্রয়াত বাস্কেটবল কিংবদন্তি কোবি ব্রায়ান্ট। তাঁর মৃত্যুতে নেইমারের কতটা খারাপ লেগেছে, সম্পর্কটা কেমন ছিল সেসবের গল্পও আছে। আরেকজন পর্দায় না থেকেও আছেন। বাস্কেটবলেরই আরেক কিংবদন্তি লেব্রন জেমস। নেইমারকে অনেকবারই তাঁর জার্সি পরতে দেখা গেছে। সেটা যে শুধুই লেব্রন এই তথ্যচিত্রের সহপ্রযোজক, সে জন্য নয়। দুজনের সম্পর্কটা দারুণ জমাট।
দানি আলভেজের সঙ্গেও নেইমারের সম্পর্কটা খুব ভালো। নেইমারের খোলনলচে জানা আলভেজ বলেছেন এই তথ্যচিত্রের সারকথা, ‘সে অনবরত কোলাহলের মধ্যে থাকে। মাঝেমধ্যে নিজেই এসব তৈরি করে। সম্ভবত সে “পারফেক্ট ক্যাওয়াস” ভালোবাসে।’
নেইমারের নিখুঁত বিশৃঙ্খলার জগতে আপনাকে আমন্ত্রণ।
নেইমার: দ্য পারফেক্ট ক্যাওয়াস
ধরন: ওয়েব সিরিজ
ভাষা: পর্তুগিজ (ইংরেজি সাবটাইটেল আছে)
কোথায় দেখা যাবে: নেটফ্লিক্স
পর্ব: তিনটি।
রানিং টাইম: প্রথম পর্ব ৫১ মিনিট, দ্বিতীয় পর্ব ৬১ মিনিট, তৃতীয় পর্ব ৫৩ মিনিট।
পরিচালক: ডেভিড চার্লস রদ্রিগেজ।
অভিনয়: নেইমার, নেইমার সিনিয়র, নাদিন, ডেভিড বেকহাম, লিওনেল মেসি, লুইস সুয়ারেজ, থিয়াগো সিলভা, দানি আলভেজ, কিলিয়ান এমবাপ্পে, মারকিনিওস।
আইএমডিবি রেটিং: ৬.৬/১০