ত্রিফলায় ম্লান হলান্ড, রিয়ালের প্রত্যাবর্তনের গল্পে এবার স্তব্ধ সিটি

শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় ম্যানচেস্টার সিটির কাছ থেকে জয় ছিনিয়ে নিয়েছে রিয়াল মাদ্রিদছবি: এএফপি

🔵ম্যানচেস্টার সিটি ২–৩ রিয়াল মাদ্রিদ ⚪

ইতিহাদ স্টেডিয়ামে বিশাল এক তিফো নিয়ে হাজির ম্যানচেস্টার সিটির সমর্থকেরা। তিফোর এক পাশে রদ্রিকে ব্যালন ডি’অরে চুমু দিতে দেখা যাচ্ছে, অন্য পাশে লেখা—‘তোমাদের এই কান্না এবার থামাও’। গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে রদ্রি আবার সেই দৃশ্য মুঠোফোনের ক্যামেরায় ধারণ করছেন। রিয়াল মাদ্রিদকে উসকানি দিতে আর কী চাই!

কিন্তু সিটি সমর্থকদের এই উসকানিমূলক তিফোই হয়তো তাতিয়ে দিল রিয়ালকে। তাদের কোনো পরিকল্পনাই কাজে এল না। ইতিহাদে এর আগে কখনোই ৯০ মিনিটের মধ্যে সিটিকে হারাতে না পারা রিয়াল এবার ঠিকই কাজটা করে দেখাল এবং সেটা ‘রিয়ালীয় ঢঙে’ কিংবা বলা যায়, ‘ওস্তাদের মার শেষ রাতে’র মতো করে।

আর্লিং হলান্ডের জোড়া গোলে ৮৫ মিনিট পর্যন্তও ২–১ ব্যবধানে পিছিয়ে ছিল রিয়াল। ঘুরে দাঁড়ানোর ডিএনএ বয়ে নিয়ে বেড়ানো দলটা এরপর লিখল প্রত্যাবর্তনের আরেকটি গল্প। বদলি ব্রাহিম দিয়াজ ৮৬ মিনিটে সমতায় ফেরানোর পর শেষ বাঁশি বাজার আগমুহূর্তে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের পাস থেকে জুড বেলিংহামের গোল। আর প্রথম গোলটা কিলিয়ান এমবাপ্পের।

ইতিহাদ স্টেডিয়ামের এই দৃশ্যটা রিয়াল মাদ্রিদকে হয়তো একটু বেশিই তাতিয়ে দিয়েছিল
ছবি: এক্স

ব্যস, রিয়ালের ত্রিফলার একত্রে জ্বলে ওঠার রাতে নিজেদের ডেরায় পুড়ে ছারখার ম্যানচেস্টার সিটি। ৩–২ গোলের জয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগের শেষ ষোলোর পথে অনেকটা এগিয়েও গেল কার্লো আনচেলত্তির দল। ১৯ ফেব্রুয়ারি প্লে–অফ পর্বের ফিরতি লেগের ম্যাচটা যে লস ব্লাঙ্কোদের ডেরা সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে।

বিরতির আগে এগিয়ে গিয়েও চ্যাম্পিয়নস লিগে ম্যানচেস্টার সিটি কোনো ম্যাচ হারল প্রায় সাত বছর পর। সর্বশেষ তারা প্রথমার্ধে গোল করেও হেরেছিল ২০১৮ সালের এপ্রিলে লিভারপুলের বিপক্ষে। এর পর থেকে এমন ৩২ ম্যাচে (২৯ জয়, ৩ ড্র) অপরাজিত ছিল পেপ গার্দিওলার দল।

আর ঘরের মাঠে দুবার এগিয়ে গিয়েও প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়নস লিগে কোনো ম্যাচ হারল সিটি। সব ভেন্যু মিলিয়ে এভাবে হারল তৃতীয়বার, প্রতিবারই প্রতিপক্ষ রিয়াল মাদ্রিদ।

অথচ ম্যাচের শুরুতে সিটিই দাপট দেখিয়েছে। ১৯ মিনিটে আর্লিং হলান্ডের যে গোলে স্বাগতিকেরা এগিয়ে গিয়েছিল, তা ছিল নিখাঁদ দলীয় সমন্বয়ের ফসল।

আর্লিং হলান্ডের এই আনন্দ ম্যাচ শেষে বিষাদে রূপ নিয়েছে
ছবি: এক্স

সতীর্থদের সঙ্গে কয়েকবার বল দেওয়া–নেওয়ার পর হাওয়ায় ভাসানো দারুণ এক পাস বাড়ান জ্যাক গ্রিলিশ। এরপর বক্সে বল পেয়ে ইওস্কো গাভারদিওল বুক দিয়ে বাড়িয়ে দেন পাশেই থাকা হলান্ডের দিকে। বাকি কাজ সারতে ভুল করেননি নরওয়ের তারকা স্ট্রাইকার।

এগিয়ে যাওয়ার পর দুবার উদ্‌যাপন করেছে সিটির সমর্থকেরা। একবার হলান্ড গোল করার পর, আরেকবার ভিএআর যাচাইয়ের পর। গাভারদিওলের কাছ থেকে বল পাওয়ার সময় হলান্ড অফসাইডে ছিলেন কি না, তা যাচাই করতেই মিনিট চারেক লেগে যায় ভিএআরের।

আরও পড়ুন

পিছিয়ে পড়ার পরপরই গোলের জন্য হন্যে হয়ে ওঠে রিয়াল মাদ্রিদ। ২৫ মিনিটে ভিনিসিয়ুসের শট পোস্টে লেগে ফিরলে হতাশ হতে হয়।

৩০ মিনিটে সিটির জন্য বড় ধাক্কা হয়ে আসে গ্রিলিশের চোট। দারুণ খেলতে থাকা এই উইঙ্গারকে তুলে নিতে বাধ্য হন গার্দিওলা। তাঁর জায়গায় নামেন ফিল ফোডেন।

মাঠে নামার কিছুক্ষণের মধ্যে দারুণ এক সুযোগও তৈরি করেন ফোডেন। কিন্তু তাঁর নেওয়া জোরালো শট ডান দিকে ঝাঁপিয়ে রুখে দেন রিয়াল গোলকিপার থিবো কোর্তোয়া। একটু পরেই সাভিনিওর পাস থেকে হলান্ডের শট কর্নারের বিনিমিয়ে বিপদমুক্ত করেন রাউল আসেনসিও।

প্রথমার্ধে রিয়াল সেরা সুযোগটা পেয়েছিল যোগ করা সময়ে। কিন্তু অরক্ষিত কিলিয়ান এমবাপ্পে সিটির গোলকিপার এদেরসনকে একা পেয়েও বল উড়িয়ে মারেন।

বিরতির পর ম্যাচের ৫৪ মিনিটেও সহজ সুযোগ নষ্ট করেন এমবাপ্পে। রদ্রিগোর ক্রস থেকে বল পেয়ে শট নেন এদেরসনের শরীর বরাবর।

এই শটেই ম্যাচে রিয়ালের প্রথম গোলটি করেন এমবাপ্পে
ছবি: এক্স

কিন্তু ৬০ মিনিটে আর ভুল করেননি এমবাপ্পে। ফেদে ভালভের্দের নেওয় ফ্রি কিক সিটির এক খেলোয়াড় আটকে দিলে বল পেয়ে যান দানি সিবায়োস। তাঁর উঁচু করে বাড়ানো বলে শট নেন এমবাপ্পে। যদিও দেখে মনে হতে পারে, শটটা যেভাবে নিতে চেয়েছিলেন, সেভাবে পারেননি। কিন্তু সেটাই ছিল এদেরসনকে ফাঁকি দেওয়ার কৌশল। ম্যাচে ১–১ সমতা।

ম্যাচে ফেরার পরের ১৫ মিনিট একরকম দাপিয়ে খেলেছে রিয়াল। কিন্তু সিটি আবার এগিয়ে গেছে খেলার ধারার বিপরীতে। নিজেদের বক্সে ফোডেনকে ফাউল করলে পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি। কোর্তোয়াকে পুরো বিপরীত দিকে পাঠিয়ে ব্যবধান ২–১ করে ফেলেন হলান্ড।

৮০ মিনিটে পিছিয়ে পড়ার কিছুক্ষণ পরেই ‘আসল চাল’টা চালেন রিয়াল কোচ কার্লো আনচেলত্তি। ৮৪ মিনিটে রদ্রিগোর বদলি হিসেবে নামান ব্রাহিম দিয়াজকে, যিনি ২০১৬ থেকে ২০১৯ মৌসুম পর্যন্ত খেলেছেন ম্যানচেস্টার সিটিতে।

মাঠে নামার ২ মিনিটের মধ্যে গোল করে বসেন দিয়াজ। তবে গোলটা সাবেক ক্লাবের বিপক্ষে করায় উদ্‌যাপন করেননি।

এরপর যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে আসে রিয়ালের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। শেষ প্রচেষ্টা হিসেবে বল নিয়ে ছুটে যান ভিনিসিয়ুস। রিকো লুইসকে পেছনে ফেলার পর রুবেন দিয়াজকেও ফাঁকি দেন। তা দেখে এগিয়ে আসেন এদেরসন। সেই সুযোগে ভিনিসিয়ুস বল বাড়ায় বেলিংহামের সামনে। জন স্টোনস আটকানোর চেষ্টা করলেও অরক্ষিত জাল কাঁপিয়ে সিটিকে স্তব্ধ করে দিতে কোনো ভুল করেননি বেলিংহাম।