মেসি–সুয়ারেজ জুটিই কি সর্বকালের সেরা

ইন্টার মায়ামিতে অনুশীলনের ফাঁকে লিওনেল মেসি ও লুইস সুয়ারেজইনস্টাগ্রাম

ফুটবলে গোলটাই বেশি মনে থাকে, বাকি সব খুব দ্রুত ঝাপসা হয়ে যায়। আর গোলটা যদি লিওনেল মেসি নামের কেউ করেন, সম্ভবত আগে–পরে আর কিছুই মনে থাকে না। শুধু মেসির গোল করার ফ্রেমটাই খোদাই হয়ে যায় মাথার ভেতর। কিন্তু এরপরও কেউ কেউ আসেন, মেসির পাশে এসে দাঁড়ান।

এমন কিছু করেন, যা মেসির সঙ্গে জুড়ে দেয় তাঁর নামও। এমন বিরল ঘটনার ধারা থেকেই জন্ম নিয়েছে মেসি–সুয়ারেজের অসাধারণ জুটি। কারও কারও মতে যা সর্বকালের সেরা জুটিও বটে।

সর্বশেষ ঘটনা দিয়েই শুরু করা যাক। পরশু কনক্যাকাফ চ্যাম্পিয়নস কাপে ইন্টার মায়ামি ও স্পোর্টিং কেসির খেলা চলছিল। ম্যাচের ১৯ মিনিটে বাঁ প্রান্ত দিয়ে বক্সে ঢুকে সামনে থাকা প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারকে ফাঁকি দিয়ে ক্রস করেন সুয়ারেজ। উরুগুইয়ান স্ট্রাইকার বলটা যখন বাড়াচ্ছেন, মেসি তখন বক্সের অনেকটা বাইরে। কিন্তু বল মাটিতে পড়ার আগে ঠিকই কাছে পৌঁছে যান আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। প্রথমে বুক দিয়ে বলটা নামিয়ে নেন, তারপর দারুণ এক ভলিতে লক্ষ্যভেদ করে এগিয়ে দেন দলকে।

আরও পড়ুন

এই গোলের জন্য সুয়ারেজের মেসিকে খুঁজে নেওয়ার ঘটনা দুজনের পারস্পরিক বোঝাপড়ার অনন্য এক দৃষ্টান্ত। সুয়ারেজ চাইলে পোস্টের মুখে থাকা অন্য সতীর্থের উদ্দেশ্যেও বলটা বাড়াতে পারতেন। সেটিই বরং সহজ ছিল।

কিন্তু মুহূর্তের ব্যবধানে সুয়ারেজের নেওয়া সিদ্ধান্ত দুজনের মধ্যে আস্থা ও নির্ভরতাকেই সামনে নিয়ে আসে। পাশাপাশি সুয়ারেজের সহায়তায় মেসির এই গোলে অনন্য এক মাইলফলকও রচিত হয়েছে। ফুটবলের পরিসংখ্যানভিত্তিক সাইট অপ্টার হিসাব অনুযায়ী এটি ছিল দুজনের সম্মিলিত অবদানের ১০০তম গোল।

অনুশীলনে মেসি–সুয়ারেজ
এএফপি

ক্যারিয়ারের লম্বা সময় একসঙ্গে খেলা সুয়ারেজ ৫৫ গোলে সহায়তা করেছেন মেসিকে। বিপরীতে মেসির সহায়তায় সুয়ারেজ করেছেন ৪৫ গোল। আর্জেন্টাইন মহাতারকার অ্যাসিস্টে এর চেয়ে বেশি গোল আর কারও নেই। এ তালিকার দ্বিতীয় স্থানে মেসির সঙ্গে আছেন নেইমার। যাঁকে মেসি অ্যাসিস্ট করেছেন ২৭ গোলে। তবে একসঙ্গে গোল করার এই ধারা নিশ্চয়ই এখানেই থামছে না। সামনের দিনগুলোয়ও মায়ামির গোলে একসঙ্গে অবদান রাখতে দেখা যেতে পারে দুজনকে।

ক্যারিয়ারের লম্বা সময় একসঙ্গে খেলা সুয়ারেজ ৫৫ গোলে সহায়তা করেছেন মেসিকে। বিপরীতে মেসির সহায়তায় সুয়ারেজ করেছেন ৪৫ গোল।

মেসি–সুয়ারেজ জুটির একসঙ্গে গোল করার শুরুটা ২০১৪ সালে। সেবার দলবদলে লিভারপুল থেকে বার্সেলোনায় যোগ দেন সুয়ারেজ। মেসি তত দিনে ফুটবলের মহাতারকা হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত। ফুটবল–প্রতিভার দিক তো বটেই, ব্যক্তি হিসেবেও বিতর্কমুক্ত। অন্যদিকে লিভারপুল ও উরুগুয়ের হয়ে ফুটবলীয় দক্ষতা প্রমাণের পাশাপাশি কামড়–কাণ্ডের কারণেও সুয়ারেজ তখন বেশ আলোচিত।  

বার্সেলোনায় মাঠে ও মাঠের বাইরে এই দুই বিপরীত প্রকৃতির মানুষের সম্পর্ক কেমন হবে, তা নিয়ে ছিল নানা গুঞ্জন। কিন্তু সব গুঞ্জন হাওয়ায় উড়িয়ে মেসি–সুয়ারেজ শুধু মাঠেই সেরা জুটি হয়ে ওঠেননি, মাঠের বাইরেও অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে উঠেছেন। বলা যায়, একে অপরের সবচেয়ে কাছের বন্ধুও। যার ফল হাতেনাতে পেয়েছে বার্সেলোনা। মাঠের দুজন মিলে রচনা করেছেন অনেক স্মরণীয় মুহূর্ত। একসঙ্গে জিতেছেন ৪টি লা লিগা, ১টি চ্যাম্পিয়নস লিগ, ৪টি কোপা দেল রে, ২টি স্প্যানিশ সুপার কাপ, ১টি উয়েফা সুপার কাপ এবং ১টি ক্লাব বিশ্বকাপের ট্রফি।

লিওনেল মেসি ও লুইস সুয়ারেজ যখন বার্সেলোনায় ছিলেন
এএফপি

২০২০ সালে সুয়ারেজের বার্সেলোনা ছাড়ার মধ্য দিয়ে ভেঙে যায় এই জুটি। মাঠের জুটি ভাঙলেও মাঠের বাইরে দুজনের সম্পর্ক আগের মতোই ছিল। এমনকি দুজনের পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও সম্পর্ক বেশ অটুট। অবকাশে বিভিন্ন সময় একসঙ্গে পরিবার নিয়ে ছুটি কাটাতেও দেখা যায় তাঁদের। সেই বন্ধুত্বের জেরেই ইন্টার মায়ামিতে আবার জুটি বাঁধলেন দুজন। আর ধরে রেখেছেন একসঙ্গে গোল করার পুরোনো ধারাবাহিকতাও। যা এখন নতুন এক মাইলফলকেও রূপ নিয়েছে।

এই মাইলফলকের পর মেসি–সুয়ারেজ জুটি সর্বকালের সেরা কি না, সেই আলোচনাও সামনে এসেছে। কেউ কেউ এ তালিকায় হয়তো রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে খেলা ডি স্টেফোনো এবং ফেরেঙ্ক পুসকাসকে এগিয়ে রাখতে চাইবেন। কিন্তু পরিসংখ্যান মোটেই তাতে সাক্ষ্য দেবে না।

আরও পড়ুন

পরিসংখ্যানমতে, ডি স্টেফানোর সহায়তায় পুসকাস গোল করেছেন মাত্র ৭টি। আর পুসকাসের সহায়তায় ডি স্টেফানো করেছেন ১১ গোল। এ ছাড়া এই শতকে রিয়ালের ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো–করিম বেনজেমা জুটির কথাও সামনে আসতে পারে। রোনালদোর অ্যাসিস্টে বেনজেমা ২৯টি এবং বেনজেমার অ্যাসিস্টে রোনালদো ৪৭টি গোল করেছেন।

কিন্তু লম্বা সময় ধরে খেলা, গোল করার ধারাবাহিকতা এবং মাঠের বাইরে সম্পর্ক বিবেচনায় নিলে মেসি–সুয়ারেজ জুটিকে সর্বকালের সেরার স্বীকৃতিটা বোধ হয় দেওয়াই যায়!