ফুটবলের বিখ্যাত সেই অভিশাপ সত্য নাকি মিথ্যা
২০১৪ ইউরোপা লিগ ফাইনাল। তুরিনে জুভেন্টাস স্টেডিয়াম। সেভিয়ার বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়েও গোলশূন্য ড্র করল বেনফিকা। খেলা গড়ায় টাইব্রেকারে। তখনই গ্যালারির সিট ছেড়ে বের হয়ে যেতে শুরু করেন বেনফিকার কিছু সমর্থক। টাইব্রেকারে কী ঘটতে পারে, তাঁরা হয়তো আন্দাজ করতে পেরেছিলেন এবং ঘটল সেটাই। টাইব্রেকারে সেভিয়ার কাছে ৪–২ গোলে হারে বেনফিকা।
কেউ কেউ বলেন অভিশাপ। বেলা গুটমানের সেই বিখ্যাত কিংবা কুখ্যাত অভিশাপ। ১১ বছর আগের সে ফাইনালে যা কার্যকর করেছিলেন সেভিয়ার পর্তুগিজ গোলকিপার বেতো। টাইব্রেকারে বেনফিকার দুটি শট রুখে দেন। গুটমান? বেনফিকাকে ১৯৬১ ও ১৯৬২ সালে ইউরোপিয়ান কাপ জেতানো হাঙ্গেরিয়ান সেই প্রয়াত কোচ। কথিত আছে, ইউরোপিয়ান কাপ জেতার পর বেনফিকার কাছে বোনাস দাবি করেন গুটমান। কিন্তু বেনফিকার বোর্ড তাকে বোনাস দিতে অস্বীকৃতি জানায়। অনেক ক্ষোভ নিয়ে ১৯৬২ সালে বেনফিকা ছেড়ে যাওয়ার সময় গুটমান পর্তুগিজ ক্লাবটিকে অভিশাপ দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমাকে ছাড়া আগামী ১০০ বছরে বেনফিকা ইউরোপ–সেরা হতে পারবে না।’
গুটমান মারা গেছেন ১৯৮১ সালে। তিনি চলে যাওয়ার পর বেনফিকা পাঁচবার ইউরোপিয়ান কাপের (চ্যাম্পিয়নস লিগ) ফাইনালে (১৯৬৩, ১৯৬৫, ১৯৬৮, ১৯৮৮ ও ১৯৯০) উঠেও জিততে পারেনি। এর বাইরে ইউরোপে দ্বিতীয় সারির টুর্নামেন্ট উয়েফা কাপ/ইউরোপা লিগেও তিনবার (১৯৮৩, ২০১৩ ও ২০১৪) ফাইনালে উঠে শিরোপা জিততে পারেনি। ভূতে বিশ্বাস না করতে পারেন, কিন্তু অভিশাপ বলে কিছু আছে হয়তো—তা এটুকু পড়ে কেউ কেউ বিশ্বাসও করতে পারেন!
ইউরোপিয়ান ফুটবলে গুটমানের এই অভিশাপ এখন স্বীকৃত। এ নিয়ে দিস্তার পর দিস্তা প্রতিবেদন ও ফিচার হয়েছে। কিন্তু বেনফিকার কাছে গল্পটা ভিন্ন। প্রথমত, গুটমান তাঁদের ক্লাব ইতিহাসের কিংবদন্তি কোচ। ক্লাবের আঙিনায় তাঁর ভাস্কর্যও আছে। বেনফিকায় ইউসেবিও, কোলুনা, আগুয়াসের মতো কিংবদন্তি খেলোয়াড়দের সমান মর্যাদাই পান গুটমান। দ্বিতীয়ত, বেনফিকার দাবি, কথিত এই অভিশাপ প্রথম আলোচনায় এসেছে ১৯৮৮ ইউরোপিয়ান কাপ ফাইনালে টাইব্রেকারে হারের পর। আর সেটা গুটমানের ক্লাব ছেড়ে যাওয়ার ২৬ বছর পর। এর আগে এই অভিশাপের কথা কখনো শোনা যায়নি বলে দাবি ক্লাবটির।
বেনফিকা নিজেদের এই দাবির পক্ষে গুটমানকে নিয়ে লেখা দুটি জীবনীর রেফারেন্স টেনেছে। গুটমান নাৎসি বাহিনীর কনসেনট্রেশন ক্যাম্প থেকে বেঁচে ফিরেছিলেন। ব্রিটিশ লেখক ডেভিড বলশোভেরার তাঁর বই ‘ফ্রম হলোকাস্ট সারভাইভর টু বেনফিকা গ্লোরি’তে এমন অভিশাপের কথা অস্বীকার করেছেন।
’৮৮ ফাইনালের তিন দিন পর পর্তুগিজ সংবাদমাধ্যম ‘এ বোয়া’ এই অভিশাপের কল্পকাহিনি ছড়িয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন বলশোভেরার। আরেকটি বই হলো হাঙ্গেরিয়ান ফুটবল কোচ ও লেখক ইয়েনো সাকান্দির ১৯৬৪ সালে প্রকাশিত বই ‘দ্য স্টোরি অব বেলা গুটমান।’ এই বইয়ে দাবি করা হয়, বোর্ডের সঙ্গে পারিশ্রমিক নিয়ে ঝামেলার আগেই গুটমানের বিদায় নিশ্চিত হয়েছিল বেনফিকা থেকে। দলে পরিবর্তন আসায় ক্লাব ছাড়তে মনস্থির করেছিলেন গুটমান।
শুধু তা–ই নয়, গুটমানের লেখা একটি চিঠিও কথিত সেই অভিশাপের বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে দেখায় বেনফিকা। চিঠিটি তিনি লিখেছিলেন বেনফিকা কিংবদন্তি হোসে আগুয়াসকে। যেখানে এমন একটি বাক্যও আছে, ‘তৃতীয়বারের মতো ইউরোপিয়ান কাপ জয়ের প্রেরণা দিচ্ছি তোমাকে।’ এ ছাড়া পর্তুগিজ সংবাদমাধ্যম ‘রেকর্ড’ ও এ বোয়াকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গুটমান বলেছিলেন, বেনফিকা তাঁকে ছাড়াই ভালো করছে এবং আবারও ইউরোপিয়ান কাপ জিতবে।
বেনফিকার দাবি, ধাপ্পাবাজিমূলক এই অভিশাপের গল্প ছড়িয়ে পড়ার কেন্দ্রে ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত জার্মান সাময়িকী স্পোর্টস ইলাস্ট্রেটেডের একটি সাক্ষাৎকার। সেই সাক্ষাৎকারে গুটমান বেনফিকার খেলার ধরনের সমালোচনা করেন। ইউসেবিওর ওপর বেশি নির্ভরতারও সমালোচনা করেছিলেন, ‘সে ভালো খেললে বেনফিকাও ভালো খেলে। সে খারাপ খেললে বেনফিকাও খারাপ খেলে। আমি থাকতে গোটা একাদশই এমন ছিল। এভাবে তারা আর ইউরোপিয়ান কাপ জিততে পারবে না।’ গুটমানের এই মন্তব্য ধরে বেনফিকার দাবি, তিনি নির্দিষ্ট একটি বিষয় নিয়ে ওই মন্তব্য করেছিলেন। এটা ছাড়াও ২০১১ সালে সাপ্তাহিকী এক্সপ্রেসোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রয়াত ইউসেবিও বলেছিলেন, ‘বেলা গুটমান অভিশাপ দেননি, এটা মিথ্যা।’
তবে বেনফিকার জাদুঘরে পা রাখলে একটি খটকা লাগেই। গুটমান আছেন মাত্র দুটি ছবিতে। একটি—১৯৬১ ইউরোপিয়ান কাপ জয়ে খেলোয়াড়দের সঙ্গে তোলা ছবি। আরেকটি কোচদের কর্নারে। প্রশ্ন হলো, বেনফিকা যে দুটি ইউরোপ–সেরার মুকুট জিতেছে, তা এই গুটমানের হাত ধরেই—জাদুঘরে সেই কোচের জায়গা এত অল্প? অভিশাপ সত্য কিংবা মিথ্যা যেটাই হোক, বেনফিকার অতীত ঘরে গুটমানের জায়গা যে বড্ড কম!