‘রাজা’র বিদায়ে ইউনাইটেডে শোকের আঁধার
১৯৫৫ সালের শুরুর দিকের কথা। হাডার্সফিল্ড রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে আছে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোর। রোগাপাতলা গড়নের চশমা পরা সেই কিশোর প্রথম দেখায় চোখে পড়ার মতো নয়। এমন কোনো মুখও নয়, যাকে একাধিকবার দেখার পরও মনে কারও মনে থাকবে। বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার মতো গড়নের ছেলেটিকে ফুটবলার হিসেবে কল্পনা করা তো আরও কঠিন।
সেই কিশোরকে স্বাগত জানাতে স্টেশনে যাওয়া হাডার্সফিল্ড টাউন ক্লাবের কর্মকর্তাদের মনেও ছিল বিস্ময় ও প্রশ্ন। বিস্ময় আড়াল না করেই একজন জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি ল?’ আরেকজন অবিশ্বাস নিয়েই বললেন, ‘সত্যিই?’
ডেনিস লকে প্রথমবার দেখে এমন বিস্ময় পরবর্তী সময়ে অনেকেরই জেগেছে। তবে কারণটা বদলে গেছে। একসময় যাঁরা তাঁর গড়ন দেখে বিস্মিত হতো, পরে সেই একই মানুষদের বিস্ময়ের কারণ ছিল লর খেলা। ছিপছিপে গড়নের সেই কিশোরটিই যে একসময় হয়ে ওঠেন সর্বকালের সেরাদের একজন। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে যিনি পরিচিত ‘দ্য কিং’ নামে।
আধুনিক ফুটবলের দর্শক-সমর্থকদের কাছে ডেনিস ল অবশ্য খুব পরিচিত নাম নয়। অন্য অনেক কিছুর মতো ইতিহাসের ধুলার আস্তরণ আড়াল করে রেখেছিল তাঁকেও। কিন্তু ইতিহাসের সেই ধুলো পরিষ্কার করে মণিমুক্তোর খোঁজ চলছে গত কাল রাতে ৮৪ বছর বয়সে ল প্রয়াত হওয়ার পর। এর আগে ২০২১ সালে চিকিৎসকেরা তাঁর আলঝেইমার এবং ভাস্কুলার ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছিল।
লর মৃত্যুর খবর জানিয়ে এক বিবৃতিতে তাঁর মেয়েসন্তানদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আমরা জানাচ্ছি যে আমাদের বাবা ডেনিস ল সবাইকে ছেড়ে গেছেন। কঠিন লড়াইয়ের পর অবশেষে এখন তিনি শান্তিতে শায়িত আছেন।’ তাঁর বিদায়ে শোক প্রকাশ করেছে ইউনাইটেডসহ অনেকেই। ওল্ড ট্রাফোর্ডের ক্লাবটি লিখেছে, ‘স্ট্রাটফোর্ড এন্ডের রাজার মৃত্যুতে আমরা শোকাহত।’
‘ইউনাইটেডের রাজা’ অভিধাও অবশ্য ডেনিস লর কীর্তির পুরোটা বোঝাতে যথেষ্ট নয়। তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব উপলব্ধি করতে দ্বারস্থ হওয়া যাক আরও কজন কিংবদন্তির, যাঁরা তাঁকে দেখেছিলেন কাছ থেকে। তাঁকে নিয়ে ফুটবলের রাজা পেলে বলেছিলেন, ‘সে সময় তিনিই (ডেনিস ল) একমাত্র ব্রিটিশ ফুটবলার, যিনি ব্রাজিল দলে খেলার যোগ্য ছিলেন।’
কিংবদন্তি লিভারপুল কোচ বিল শাঙ্কলি বলেছিলেন, ‘মাঠে তার মতো দ্রুত চিন্তা করতে আমি আর কাউকে দেখিনি।’ ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কিংবদন্তি কোচ স্যার আলেক্স ফার্গুসন লকে নৈবেদ্য দিতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘আমার নায়ক।’ ফার্গির সেই নায়ক পৃথিবীর মায়া ছেড়েছেন বটে, কিন্তু যে মায়ায় তিনি খেলাটিকে জড়িয়ে রেখেছিলেন, তা থেকে যাবে আরও অনেক দিন।
মাঠের বাইরে ডেনিস ল সহজে চোখে না পড়লেও মাঠে নামতেই ভোজবাজির মতো বদলে যেত সব। গোলমুখে শিকারি বাঘের মতো চকচক করত তাঁর চোখ। বক্সের ভেতর মুহূর্তের মধ্যে বাঘের থাবায় ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলতে পারতেন প্রতিপক্ষের রক্ষণকে। গতি বাড়িয়ে কমিয়ে এবং দুর্দান্ত অ্যাক্রোবেটিক ভঙ্গিতে তাঁর করা গোলগুলো যেন প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়েরাও খেলা থামিয়ে উপভোগ করতেন। গোল করার পাশাপাশি দলের প্রয়োজনে নিচে নেমে প্লে-মেকার হিসেবেও ভূমিকা রাখতে পারতেন ল।
গোল করায় অবিশ্বাস্য দক্ষতার পরও সতীর্থদের কাছে তিনি ছিলেন নিঃস্বার্থ এক সহযোদ্ধা। আর প্রতিপক্ষের কাছে ছিলেন এমন একজন, যাঁরা কখনোই তাঁর মুখোমুখি হতে চাইতেন না। সমর্থকদের কাছেও ডেনিস ল ছিলেন তুমুল জনপ্রিয়। তাঁর খেলার তেমনই ভক্ত ছিলেন উইম বার্গক্যাম্প নামের এক ডাচ ভদ্রলোক। যিনি ডেনিস লয়ে প্রভাবিত হয়ে নিজের ছেলের নাম রেখেছিলেন ডেনিস বার্গক্যাম্প। আর এই বার্গক্যাম্পই পরে কাঁপিয়েছেন ফুটবল-বিশ্ব। হয়ে উঠেছেন কিংবদন্তিদের একজন।
শুধু নৈবেদ্য বা প্রশংসায় মোড়ানো কথাতে নয়, পরিসংখ্যানও পাশে এসে দাঁড়াচ্ছে লর। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে গোল করায় তৃতীয় স্থানটি তাঁর। ৪০৬ ম্যাচে লর গোল ২৩৭টি। তাঁর চেয়ে বেশি গোল আছে শুধু স্যার ববি চার্লটন ও ওয়েইন রুনির। দুইয়ে থাকা চার্লটন ৭৪৬ ম্যাচে করেছেন ২৪৫ গোল। আর রুনির গোল ৫৫৯ ম্যাচে ২৫৩টি।
তবে রুনি কিংবা চার্লটনের সমান ম্যাচ খেলার সুযোগ পেলে নিশ্চিতভাবেই তাঁদের ছাড়িয়ে যেতে পারতেন এই স্কটিশ কিংবদন্তি। এমন পারফরম্যান্সের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৬৪ সালে জিতেছিলেন ব্যালন ডি’অরও। স্কটিশদের মধ্যে এখন পর্যন্ত একমাত্র তাঁর হাতেই উঠেছে ফুটবলের ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের পুরস্কারটি।
ইউনাইটেডে সাফল্যের চূড়া স্পর্শ করলেও লর শুরুটা হয়েছিল হাডার্সফিল্ডে। এরপর যোগ দেন ম্যানচেস্টার সিটিতে, সেখান থেকে পাড়ি জমান ইতালিয়ান ক্লাব তুরিনোতে। কিন্তু ডানা মেলে উড়তে ভালোবাসা লর ভালো লাগেনি তুরিনোর শৃঙ্খলিত জীবন। ১৯৬২ সালে ইংল্যান্ডে ফিরে এসে যোগ দেন ইউনাইটেডে।
এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ইউনাইটেডেই ববি চার্লটন এবং জর্জ বেস্টকে নিয়ে গঠন করেন ‘হলি ট্রিনিটি’ নামের বিখ্যাত ত্রয়ী। যাঁরা সে সময় খেলাটিকে নিয়ে গিয়েছিলেন ভিন্ন এক স্তরে। শুধু ক্লাবেই নয়, লম্বা সময় ধরে সমৃদ্ধ করেছেন স্কটল্যান্ড জাতীয় দলকেও। জাতীয় দলের হয়ে ৫০ ম্যাচে করেছিলেন ৩০ গোল।
তবে নিয়তি এমন যে সব ভালোরই কখনো না কখনো শেষ হয়। সে নিয়মেই একসময় থেমেছিল ফুটবলার লর ক্যারিয়ার। এবার ফুরিয়ে গেল জীবনের সব লেনদেনও। কিন্তু ফুটবলের মুখোমুখি বসার জন্য থেকে যাবে ডেনিস লর ক্যারিয়ারের সব কীর্তিগাথা।