ঢাকার ক্লাবের কাছে জিম্মি দেশের ক্রিকেট

দেশের ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে চায় একটি পক্ষ, নির্দিষ্ট করে বললে ঢাকার ক্লাবগুলো।গ্রাফিক্স: আসাদ

ঢাকা প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লিগ শুরু হওয়ার কথা ছিল আজ থেকে। হচ্ছে না। কারণ কী? কারণ, ঢাকার ক্লাবগুলো একজোট হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাদের দাবি না মানা পর্যন্ত শুধু প্রথম বিভাগ নয়, কোনো লিগেই তারা খেলবে না। দাবিগুলো হয়তো নতুন, তবে এর মাধ্যমে সেই পুরোনো সত্যিটাই আবার নতুন করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ঢাকার ক্লাবগুলো নিজেদের স্বার্থ ছাড়া কিছু বোঝে না এবং সেই স্বার্থ চরিতার্থ করতে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে জিম্মি করে রাখতেও দুবার ভাবে না।

একাধিকবার যে ‘ঢাকার ক্লাবগুলো’ লেখা হয়েছে, এটা খেয়াল করাটা খুব জরুরি। কেন, সেই প্রসঙ্গ একটু পরে। তার আগে ঢাকার ক্লাবগুলোর এমন রাগ করার কারণটা জানিয়ে দেওয়া যাক। জুলাই–জাগরণের পর দেশের সব ক্ষেত্রে সংস্কারের যে আওয়াজ উঠেছে, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডও সেই পথে মাত্রই হাঁটতে শুরু করেছিল।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি পদটির প্রায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নিয়ে ফেলা নাজমুল হাসানকে বিদায় নিতে হয়েছে। নতুন সভাপতি হয়েছেন ফারুক আহমেদ। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ, বলা ভালো নতুন সরকারের হাতে বিসিবির দুজন পরিচালক নিয়োগ করার ক্ষমতা ছিল। সেই ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ফারুক আহমেদের সঙ্গে নতুন পরিচালক হিসেবে বিসিবির পরিচালনা পর্ষদে ঢোকানো হয়েছে নাজমূল আবেদীনকে।

এসব পুরোনো কথা বলার কারণ, নাজমূল আবেদীনের নেতৃত্বেই পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি বিসিবির গঠনতন্ত্র সংশোধনের একটা প্রস্তাব তৈরি করছে। ফাঁস হয়ে যাওয়া সেটির প্রাথমিক খসড়া দেখেই ঢাকার ক্লাবগুলোর মাথা খারাপ অবস্থা। গঠনতন্ত্র সংশোধন কমিটি প্রস্তাব করলেই তা চূড়ান্ত, মোটেই এমন নয়। প্রথমে এটি বিসিবির পরিচালনা পর্যদে পাস হতে হবে, পরে বিশেষ সাধারণ সভা বা বার্ষিক সাধারণ সভায়।

নাজমূল আবেদীনের নেতৃত্বেই পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি বিসিবির গঠনতন্ত্র সংশোধনের একটা প্রস্তাব তৈরি করছে
প্রথম আলো

জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন কমিশনের কাছ থেকে প্রস্তাব পাওয়ার পর সরকার যেমন বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা করছে, বিসিবির প্রস্তাবিত নতুন গঠনতন্ত্র নিয়েও নিশ্চয়ই তা করা হবে।

কিন্তু ঢাকার ক্লাবগুলোর সেই পর্যন্ত অপেক্ষা করার ধৈর্য থাকলে তো! বিসিবিতে তাদের ‘অন্যায্য’ একাধিপত্য শেষ হয়ে যাওয়ার শঙ্কায় ঢাকার বিভিন্ন ক্লাবের সংগঠকেরা নতুন এক ব্যানারে একত্র হয়ে এর বিরুদ্ধে তাই রীতিমতো আন্দোলনে নেমে গেছেন। তুলেছেন নাজমূল আবেদীনের পদত্যাগের দাবিও। আন্দোলনের সেই পুরোনো অস্ত্র ‘তাহলে আমরা খেলব না।’

আরও পড়ুন
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে বর্তমান গঠনতন্ত্রে ১৭১ জন কাউন্সিলরের ৭৬ জনই ঢাকার ক্লাব থেকে, ২৫ সদস্যের পরিচালনা পর্যদের ১২ জন। যেখানে বিভাগীয় বা আঞ্চলিক পর্যায় থেকে আসেন ১০ জন। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে যে অনেকেই ‘ঢাকা ক্রিকেট বোর্ড’ বলেন, এতে তাই আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।

তা প্রস্তাবিত নতুন গঠনতন্ত্রে কী আছে যে ঢাকার ক্লাবগুলো যেভাবে হোক তা ঠেকাতে উঠেপড়ে লেগেছে? তা বলার আগে বিসিবির বর্তমান গঠনতন্ত্রটা দেখে নেওয়া জরুরি। এই গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, যাঁদের ভোটে বিসিবির পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচিত হয়, সেই কাউন্সিলরের সংখ্যা ১৭১। এই ১৭১ জন কাউন্সিলর মানে বোর্ড সদস্যের ৭৬ জনই ঢাকার বিভিন্ন বিভাগের ক্লাবগুলোর মনোনীত প্রতিনিধি। এর অর্থটা বুঝেছেন তো?

তৃতীয় বিভাগ লিগ, অর্থাৎ ঢাকাই ক্রিকেটের চতুর্থ স্তরের একটা ক্লাব, যারা বছরে শুধুই একটা মহাবিতর্কিত ৫০ ওভারের প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়, সেই ক্লাব থেকে একজন বিসিবির সদস্য হয়ে যাচ্ছেন; যেখানে একটা গোটা জেলা থেকে, তা রাজশাহী বা খুলনার মতো ক্রিকেট কেন্দ্র হলেই–বা কী, সেখান থেকেও একজনই। কোনো টেস্ট খেলুড়ে দেশের ক্রিকেট বোর্ড যে এমন হতে পারে, এটা বিশ্বাস করতেই তো কষ্ট হয়।

বাংলাদেশের একমাত্র লিস্ট ‘এ’ টুর্নামেন্ট ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ
ফাইল ছবি

পরিচালনা পর্যদের গঠন দেখলে প্রশ্নটা আরও বড় হয়ে উঠবে। ২৫ সদস্যের পরিচালনা পর্যদের ১২ জনই ঢাকার ক্লাবের। বিভাগীয় বা আঞ্চলিক পর্যায় থেকে ১০ জন। বাকি তিনজনের দুজন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ মনোনীত, বিভিন্ন সংস্থা ও সাবেক খেলোয়াড়দের কোটা থেকে একজন। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে যে অনেকেই ‘ঢাকা ক্রিকেট বোর্ড’ বলেন, এতে তাই আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।

প্রস্তাবিত নতুন গঠনতন্ত্রে এই অপবাদ থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা আছে। এতে কী আছে না আছে, তা জানানোর দায়িত্বটা ঢাকার ক্লাব সংগঠকেরা নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। তাদের দেওয়া তথ্য যদি ঠিক হয়ে থাকে, তাহলে এতে ঢাকার ক্লাবগুলো থেকে কাউন্সিলর–সংখ্যা ৩০–এ কমিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে, পরিচালকের সংখ্যা ৪–এ। জেলা–বিভাগ থেকে আসবেন ১৩ জন পরিচালক। দুজন করে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ এবং বিভিন্ন সংস্থা ও সাবেক খেলোয়াড়ের কোটায়। পরিচালনা পর্ষদের আকার ২৫ জন থেকে কমে হবে ২১ জনের।

ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ বাংলাদেশে ওয়ানডে ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় টুর্নামেন্ট, লিস্ট ‘এ’ মর্যাদাও সে কারণেই। কিন্তু এর কাছাকাছি মানের লিগ কেন চট্টগ্রামে হবে না, কেন খুলনা–সিলেট–রাজশাহীতেও নয়?

কাউন্সিলর ও পরিচালকের সংখ্যা কমবে কেন—এই প্রশ্ন তোলা ঢাকার ক্লাব সংগঠকদের বরং উল্টো একটা প্রশ্ন করা উচিত। শুধুই দুই–আড়াই মাসের একটা ওয়ানডে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া ক্লাবগুলো থেকে কেন পুরো দেশের ক্রিকেট বোর্ডে এতজন কাউন্সিলর ও পরিচালক থাকবেন? এতে তো সারা দেশের যৌক্তিক প্রতিনিধিত্ব থাকার কথা।

তা ছাড়া টেস্ট খেলুড়ে একটা দেশের ক্রিকেটের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট। ক্রিকেট বোর্ডেও তো সেটির প্রতিফলন থাকবে। এটা কোনো মহাকাশবিজ্ঞান নয়, অন্য সব দেশের ক্রিকেট বোর্ডগুলো এমনই হয়। আন্দোলনে নামা ক্লাব সংগঠকদের কেউ কি অন্য কোনো দেশে শুধুই একদিনের ম্যাচ খেলা ক্লাবগুলোর এমন আধিপত্যের উদাহরণ দিতে পারবেন?

প্রস্তাবিত গঠনতন্ত্রেও কিন্তু সেই আধিপত্য থাকছে। ৩০ জন কাউন্সিলর ও চারজন পরিচালক কি কম নাকি! আগের তুলনায় অবশ্যই কম। তবে সারা দেশের প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে এটাই কি করা উচিত নয়?

বিসিবির সিংহভাগ কাউন্সিলরই ঢাকা লিগের ক্লাবগুলোর
প্রথম আলো

বাংলাদেশের ক্রিকেটে ঢাকার ক্লাবগুলোর অবশ্যই অবদান আছে। টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ায় আইসিসি ট্রফি জয়ের সঙ্গে জগমোহন ডালমিয়ার ক্রিকেটের বিশ্বায়ন দর্শনের বড় ভূমিকা ছিল, সঙ্গে ঢাকা ক্রিকেট লিগের জনপ্রিয়তাও।

ঢাকার ক্লাবগুলোই তাই ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশের ক্রিকেটে ছড়ি ঘুরিয়ে এসেছে। টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পরই যা বদলে যাওয়া উচিত ছিল। কারণ, টেস্ট খেলুড়ে একটা দেশের ক্রিকেট কাঠামোর সবচেয়ে নিচের স্তর হলো ক্লাব ক্রিকেট।

আদর্শ ক্রিকেট কাঠামো অনুযায়ী, টেস্ট খেলুড়ে একটা দেশের সব শহরেই ক্লাব প্রতিযোগিতা থাকবে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা জনপ্রিয়তার বিচারে কোনোটার গুরুত্ব বেশি থাকবে, কোনোটার কম।

ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ যেমন বাংলাদেশে ওয়ানডে ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় টুর্নামেন্ট, লিস্ট ‘এ’ মর্যাদাও সে কারণেই। কিন্তু এর কাছাকাছি মানের লিগ কেন চট্টগ্রামে হবে না, কেন খুলনা–সিলেট–রাজশাহীতেও নয়?

আরও পড়ুন
আদর্শ কি এটাই হওয়া উচিত নয় যে ঢাকার সব ক্লাবের প্রতিনিধির ভোটে নির্বাচিত হবে ঢাকা বিভাগীয় ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন, একইভাবে অন্য সব বিভাগেরও। বিভাগের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আসবেন বিসিবিতে।

তা হওয়ার পূর্বশর্ত ক্রিকেটের বিকেন্দ্রীকরণ। টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার দুই যুগের বেশি সময়েও যে তা হতে পারেনি, আঞ্চলিক ক্রিকেট সংস্থা কাজির গরুর মতো ‘কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই’ হয়ে আছে—এর মূলেও তো ঢাকার ক্লাবগুলোর ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার অপচেষ্টা। একই ক্লাবের তিন–চারজন, কখনোবা তার চেয়েও বেশিসংখ্যক সংগঠক বিভিন্ন ক্লাবে কিছু টাকাপয়সা দিয়ে বোর্ড পরিচালক হওয়ার রাস্তা করে ফেলেন।

অথচ আদর্শ কি এটাই হওয়া উচিত নয় যে ঢাকার সব ক্লাবের প্রতিনিধির ভোটে নির্বাচিত হবে ঢাকা বিভাগীয় ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন, একইভাবে সব বিভাগেরও। বিভাগের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আসবেন বিসিবিতে। বাংলাদেশের ক্রিকেটের বাস্তবতা চিন্তা করে ঢাকা বিভাগীয় ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি সংখ্যা তাতে বেশি থাকবে কি না—এই আলোচনা অবশ্যই হতে পারে।

সব ক্ষেত্রেই সংস্কার–সংস্কার বলে যে রব উঠেছে, বাংলাদেশের ক্রিকেটেও তা করার এখনই সময়। ঢাকার ক্লাবগুলোর চাপের কাছে নতি স্বীকার করা মানে এই সুবর্ণ সুযোগটা হেলায় হারানো।

আরও পড়ুন