বাংলাদেশ-পাকিস্তানকে নিয়ম রক্ষা করতে দেবে তো প্রকৃতি

শেষটা এমন হাসিমুখে শেষ করতে পারবে তো বাংলাদেশএএফপি

জিতলেও কিছু নেই, হারলেও কিছু নেই। যে-ই জিতুক, যে-ই হারুক, এই ম্যাচ শেষে বাংলাদেশ দল দেশে ফিরে যাবে, পাকিস্তান দল হয়ে যাবে শুধুই দর্শক। ক্রিকেটীয় পরিভাষায় এসব ম্যাচকে বলে নিয়ম রক্ষার ম্যাচ।

তো রাওয়ালপিন্ডি স্টেডিয়ামের আজকের নিয়ম রক্ষার ম্যাচটিতে বাংলাদেশকে ফেবারিট বললে ভুল কিছু বলা হবে না। পাকিস্তান ঘরের মাঠে খেলছে বলেই তাদের ফেবারিট বলা যাবে না। টুর্নামেন্টে তাদের অবস্থাও তো বাংলাদেশের মতোই—প্রথম দুই ম্যাচেই হার এবং বিদায়। আবার এমনও নয় যে গত আগস্টে এই মাঠে পাকিস্তানকে ২-০–তে টেস্ট সিরিজে হারিয়েছে বলেই বাংলাদেশ আজ ফেবারিট।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশ ফেবারিট; কারণ, এ ধরনের ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতায় বিশ্বে খুব কম দলই তাদের চেয়ে এগিয়ে। টুর্নামেন্টে দুই দলেরই শেষ ম্যাচ, যাতে দুই দলেরই বা অন্তত একটি দলের পাওয়ার মতো কিছু থাকবে না, ম্যাচের দুই দল বা অন্তত একটি দল টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় হলে অন্যরা ঝামেলামুক্ত হয়—এ রকম ম্যাচ বাংলাদেশের তুলনায় বেশি খেলেছে খুব কম দলই। কে জানে, হয়তো খেলেইনি! আজ তাই অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশই এগিয়ে।

গতকাল সংবাদ সম্মেলনে এসেছিলেন বাংলাদেশ দলের সিনিয়র সহকারী কোচ মোহাম্মদ সালাহউদ্দীন
এএফপি

সমস্যা হলো, প্রকৃতিও বুঝে গেছে, এই ম্যাচটার কোনো মূল্য নেই। কাজেই পাকিস্তানের রাজধানীতে কাল বৃষ্টি হলো। বৃষ্টি আসলে হচ্ছে পরশু থেকেই। কাল সকালটা ভালো যাওয়ার পর দুপুর নাগাদ আবার বৃষ্টি। দুপুরের দিকে পাকিস্তান দল মাঠে নামল এবং মিনিট তিরিশেক থেকেই উঠে হোটেলে চলে গেল। বাংলাদেশ দল তো মাঠে এলই না। প্রকৃতি যেন বুঝিয়ে দিল, এ রকম আনুষ্ঠানিকতা রক্ষার ম্যাচের আগের দিনটা আসলে কী রকম হওয়া উচিত। অনুশীলন হলে সেটি ঘিরে কত লোকের ব্যস্ততা। মূল্যহীন এক ম্যাচ নিয়ে এত কষ্টের দরকার কী!

তবে দুজন মানুষকে বাড়তি একটু কষ্ট করতে হলো। একজন পাকিস্তানের অন্তর্বর্তীকালীন কোচ আকিব জাভেদ, আরেকজন বাংলাদেশ দলের সিনিয়র সহকারী কোচ মোহাম্মদ সালাহউদ্দীন। দুই দলের প্রতিনিধি হয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসে তাঁরা অবশ্য পাল্টা বোঝাতে চাইলেন, এ রকম ম্যাচও কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পড়ুন

পাকিস্তানের সাবেক ফাস্ট বোলার আকিব জাভেদ তো এ ধরনের ম্যাচকে জীবনের সঙ্গেই মিলিয়ে ফেললেন! তাঁর কথা, ‘কালকের (আজ) ম্যাচটা অন্য যেকোনো ম্যাচের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। জীবনে আপনি যখন একবার পিছিয়ে পড়বেন, আপনি চেষ্টা করবেন একটা ভালো কিছু করে আবার জীবনে ফিরতে। কালকের (আজ) দিনটা সেদিক দিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

এ রকম ম্যাচ থেকে অনেকে চোখ ফিরিয়ে রাখতে পারেন। কিন্তু খেলোয়াড়দের সেই উপায় কোথায়! এমন তো নয় যে এসব ম্যাচ এমনি এমনি শেষ হয়ে যায়। খেলোয়াড়দের এ রকম ম্যাচেও পোশাক-আশাক পরে মাঠে নামতে হয়, খেলতে হয়। উইকেট পেলে আনন্দ করতে হয়, আউট হলে মন খারাপ করতে হয়। আকিব যেন তাঁদের সবার সমব্যথী, ‘আমরা যারা বাইরে আছি, আমরা শুধু একটা ম্যাচ ধরেই আমাদের মনোযোগটা দিই। তবে খেলোয়াড়দের জন্য প্রতিটা ম্যাচই চাপের। ব্যাটিং করতে যাবেন, কিছুই সহজ নয় সেখানে। সব সময় শূন্য থেকে শুরু করতে হয়। আর এটা তো চ্যাম্পিয়নস ট্রফি, কোনো বাছাইপর্বের খেলা নয়।’

সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের কোচ আকিব জাভেদ
এএফপি

আসলেই তো, এই এক চ্যাম্পিয়নস ট্রফির জন্য সেই কবে থেকে কত চেষ্টা! ২০২৩ বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচটা নিশ্চয়ই ভুলে যাননি। অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুসকে সাকিব আল হাসান টাইমড আউট করে দিলেন তো চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে খেলার জন্যই। তারপর না হয় যেকোনো কারণেই হোক সাকিব নিজেই টুর্নামেন্টটা খেলতে পারলেন না, কিন্তু চ্যাম্পিয়নস ট্রফি তো চ্যাম্পিয়নস ট্রফি। বিশ্বকাপের পর আইসিসির সবচেয়ে বড় টুর্নামেন্ট। নিয়ম রক্ষার ম্যাচও দুলকি চালে খেলে এমন টুর্নামেন্টকে অপমানিত করার কোনো সুযোগ নেই।

আরও পড়ুন

সালাউদ্দিনের আনুষ্ঠানিকতা রক্ষার ম্যাচ-দর্শনও তাই আকিবের মতোই জীবনমুখী। অনেকটা ‘যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখো তাই’-এর মতো। তাঁর অনুসন্ধিৎসু মন বলছে, অনাগ্রহের এই ম্যাচেও লুকিয়ে থাকতে পারে কোনো ক্রিকেটারের ঘুরে দাঁড়ানোর টনিক, ‘আপনি কখন, কোন সময় আত্মবিশ্বাস পাবেন এবং কখন আপনার জীবনের মোমেন্টাম ঘুরে যাবে, কেউ বলতে পারে না। আমি মনে করি, প্রতিটা ম্যাচই প্রত্যেক খেলোয়াড়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এখান থেকেও অনেকে অনেক কিছু নিয়ে যেতে পারে।’ ব্যাটিংয়ে আগের দুই ম্যাচের ভুলত্রুটি শুধরে নেওয়ার লক্ষ্যের কথাও বললেন। আর বললেন একটা অতৃপ্তির কথা। সেটা অবশ্য আনুষ্ঠানিকতা রক্ষার শেষ ম্যাচ নিয়ে নয়, পুরো চ্যাম্পিয়নস ট্রফি নিয়েই। সালাউদ্দিনের দৃষ্টিতে এই টুর্নামেন্টের আগে যথাযথ প্রস্তুতিই নেয়নি বাংলাদেশ দল।

বাংলাদেশের মুখোমুখি হওয়ার আগে অনুশীলনে পাকিস্তান দল। কাল রাওয়ালপিন্ডি স্টেডিয়ামে
এএফপি

এরপর আর কী বলার থাকে? প্রস্তুতিহীন অবস্থায় খেলতে এলে ২১-২২ দিনের একটা টুর্নামেন্ট আপনার জন্য ৭-৮ দিনে শেষ হয়ে যাবে, সেটাই তো স্বাভাবিক। টুর্নামেন্টের অর্ধেক না যেতেই তাই বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়ে যাচ্ছে। সেই বিদায়টাও খেলে কতটা নেওয়া যাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। কারণ, রাওয়ালপিন্ডিতে বৃষ্টির সম্ভাবনা আছে আজও।

প্রকৃতি যদি মনে করে বসে, ‘ধুর, এ রকম ম্যাচ হওয়ারই দরকার কী’, তাহলে কিন্তু বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের চ্যাম্পিয়নস ট্রফি এরই মধ্যে শেষ।