দয়া করে চোখ আর মনকে বোঝান, বিপিএলে আসলে ক্রিকেটই হচ্ছে
‘ওয়াইড বলে ৫ রানের একটা খেলা হচ্ছে সম্ভবত, যাতে কিপার ইনভলভ থাকে না। এমন ওয়াইড হবে যে কিপারও ধরতে পারবে না’—কথাটি বিপিএল-সংশ্লিষ্ট একজনের, গত পরশু যা প্রকাশিত হয়েছে প্রথম আলোয় ‘সন্দেহের বিপিএল; ৫ রানের ওয়াইড আর ওভারে ১১-১৫ রান’ শিরোনামে। প্রশ্ন হলো এই সমস্যার সমাধান কী?
যেহেতু বিষয়টি স্পট ফিক্সিংয়ের সন্দেহ নিয়ে, তাই ব্যাপারটা টেকনিক্যাল কোনো কিছু নয়, একদমই মানসিক। খেলোয়াড়দের মনের ‘রোগ’। যে কারণেই হোক, তাঁরা ওভাবে ওয়াইড করতে চান বলেই অমন হচ্ছে। মনোবিদের শরণাপন্ন হবেন? লাভ নেই।
লেকচারের বিভিন্ন পর্ব শেষ হতে হতে বিপিএলটাই শেষ হয়ে যাবে। আর তাতে কাজ হবে কি না, সন্দেহ আছে। কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলীর গল্পে আছে না, ‘কুইনাইন জ্বর সারাবে, কিন্তু কুইনাইন সারাবে কে!’ আসলে স্বীকৃত পথে কোনো সমাধানই নেই। মনের ওপর তো আর জোর চলে না। তবে অন্য পথ আছে।
সে পথটা অতিশয় গোপন। তা নিয়ে কথা বলতেও লোকজনের অতিশয় সংকোচ। ব্যাপারটা এমন যে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়বে ঠিকই, কিন্তু কাউকে টের পেতে দেবে না। বুঝলেন না?
আরে সেই সব ছোট্ট কার্ড কিংবা চিরকুট, বাসের সিটে বসে থাকতে যেগুলো জানালা দিয়ে উড়ে আসে কিংবা ফুটপাত দিয়ে যাওয়ার সময় কেউ একজন হাতে ধরিয়ে দেয়। মাঝেমধ্যে দেয়ালে পোস্টার হিসেবেও চোখে পড়ে—মনের মানুষ বশীকরণ থেকে দুশমনকে শেষ করে দেওয়া কিংবা যেকোনো অসাধ্য সাধন করা হয় চোখের পলকে; কামরূপ–কামাখ্যাফেরত অমুক তান্ত্রিক কিংবা তমুক মহাতান্ত্রিক অথবা সিদ্ধ পুরুষ।
না, মোটেও ফাজলামো নয়। ব্যাপার অতিশয় সিরিয়াস। মরণাপন্ন রোগীকে যখন চিকিৎসক বেটে খাইয়েও কাজ হয় না, তখন লোকে বাধ্য হয়েই তুকতাক মন্ত্রপূত কবিরাজের দরবারে ধরনা দেয়। বাস্তবতা জেনেও মনকে বুঝ দেয়, যদি কাজ হয়!
গাঁও–গেরাম থেকে শহুরে কিছু লোকের কিন্তু আজও বিশ্বাস, কাজ হয়! নইলে মহাতান্ত্রিকদের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিস হতো না, পসারও জমত না। আর বিপিএল কিন্তু গাঁও–গেরাম, মফস্সলের চায়ের দোকানেই চলে বেশি। প্রচুর বাজি–টাজির কারবার হয় তো, তাই।
সেটাও বিশ্বাসের ব্যাপার আর মহাতান্ত্রিকদের কাছেও ধরনা দিতে হয় বিশ্বাস নিয়েই। এখন দুইয়ে দুইয়ে চার মেলার মতো এই বিশ্বাসে বিশ্বাসে যদি মিলে যায়, তাহলে তো কাজ হলেও হতে পারে! তখন কোনো বোলার ওয়াইড দেওয়ার ইচ্ছায় পিচ নয়, মাঠে ৩০ গজের বাইরে বল ফেলতে চাইলেও কাজ হবে না। বশীকরণ হওয়ায় স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বল পিচে পড়তে বাধ্য। প্রশ্ন করতে পারেন, ইলন মাস্ক যখন মহাকাশে বেড়াতে যাওয়ার রুট চালু করতে চাইছেন, তখন শত বছর পিছিয়ে কেন ওসব আখড়ায় যাওয়া?
যদি পাল্টা প্রশ্ন করা হয়, এ ছাড়া আর কোনো উপায় আছে কি? আইসিসি থেকে আকসু, সব রকম ওষুধই তো বেটে খাওয়ানো হলো, তবু কি ‘রোগ’টা কিছু কমল? বছর বছর বিপিএল আসে আর বছর বছর শোনা যায়—ফিক্সিং! স্পট ফিক্সিং শব্দগুলো!
বিপিএলের দশা তাই শয্যাশায়ী মুমূর্ষু রোগীর চেয়ে মোটেও ভালো কিছু নয়। আর রূপক অর্থে বিসিবির মনের মানুষ তো খেলোয়াড়েরাই। তাঁরা ছাড়া বিসিবি অস্তিত্বহীন, যেমনটা মজনু বিনে লাইলি, ফরহাদ বিনে শিরি। ব্যাপারটা বেশি রোমান্টিক হয়ে গেলে অন্যভাবেও দেখা যায়। ক্রিকেটার ছাড়া ক্রিকেট বোর্ড অর্থহীন।
এখন সেই ক্রিকেটারদের মন যদি বিপথগামী হয়, অজানা–অদৃশ্য দুশমনেরা যদি তাঁদের সেই পথে চালিত করে বিভিন্ন লোভ দেখিয়ে এবং বিভিন্ন শাস্তির ভয়ভীতি কিংবা সোনা রে–বাবা রে ‘ওসব করে না’ বলেও যদি কাজ না হয়—তখন এই অসাধ্য সাধন করতে শক্তিশালী বশীকরণ তান্ত্রিক ছাড়া উপায় কী! অন্তত একবার চেষ্টা তো করে দেখা যায়।
তবে সেই চেষ্টায় সমভিব্যাহারে নামার আগে হাতে যদি ফোন থাকে, তাহলে একবার ইউটিউবে যেতে পারেন। না, বল কীভাবে পিচে রাখতে হবে তা হাতে–কলমে শেখানোর ভিডিও দেখতে হবে না। সার্চ দিন একটি নাম লিখে—ডেভিড হুকস। চেনা চেনা লাগছে? হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। প্রয়াত এই ভদ্রলোক বাংলাদেশের একটু বয়সী ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে হয়তো ভদ্রলোক না–ও হতে পারেন। সাবেক এই অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যান ২০০৩ সালে বাংলাদেশ দলের অস্ট্রেলিয়া সফরে কীভাবে এক দিনে টেস্ট জেতা যায়, সেই পথ স্বাগতিকদের বাতলে দিয়েছিলেন তো, তাই!
সবার চোখেই খোঁচা মেরে বুঝিয়ে দেওয়া যেত, খেলার নামে এখানে আসলে হচ্ছে কী! তারপরও যে প্রশ্নটি থেকে যায়, এটা যে ছেলেখেলা সেটাও সবাই বোঝে কি না?
কিন্তু ওই ব্যাপারটি ভালো লাগেনি বলে যে হুকসের কাছ থেকে শেখার কিছুই নেই, সেটা ভেবে নেওয়াও ভুল। বরং এমন এক উদাহরণ তিনি রেখে গেছেন, যেটা কাজে লাগিয়ে বিপিএলে বোলারদের ‘ওয়াইডভ্যাস(!)’ ঠিক করা সম্ভব। সেটা ১৯৯০ সালে শেফিল্ড শিল্ডে এক ম্যাচের ঘটনা, স্ট্রাইকে হুকস। তাসমানিয়ার পেসার অফ স্টাম্পে ওয়াইড দাগের কাছাকাছি জায়গা দিয়ে বল করলেন। বোঝাই যাচ্ছিল যে কাজটা ইচ্ছা করেই। ভীষণ বিরক্ত হুকস করলেন কী, অফ স্টাম্পটা তুলে ওয়াইড দাগের কাছাকাছি জায়গায় নিয়ে পুঁতলেন!
বোলার যেন ওয়াইড করতে না পারেন, সে জন্য অদ্ভুত সেই কাজটি করেছিলেন হুকস। এখন বিপিএলে ব্যাটসম্যানরা সেই ভিডিও দেখে একটু সচেতন এবং সমাজ সংস্কারে এগিয়ে এলেই হয়। ঝামেলাটা হলো, বিপিএলে স্টাম্প পিচের ওয়াইড মার্কেও পোঁতার সুযোগ নেই। পুঁততে হবে লেগ সাইডে পিচের বাইরে। উইকেটকিপার যেন বল ধরতে না পারেন, সে জন্যই পিচের বাইরে বড় বড় ওয়াইডে চারসহ মোট ৫ রান দেওয়া।
তবু একবার যদি কেউ ওই কাজটা করতেন, অর্থাৎ স্টাম্প তুলে বল যেদিক দিয়ে গেছে, সেটা হোক না পিচের বাইরে, সেখানেই যদি পুঁততেন—তাহলে অন্তত বোলার থেকে সবার চোখেই খোঁচা মেরে বুঝিয়ে দেওয়া যেত, খেলার নামে এখানে আসলে হচ্ছে কী! তারপরও যে প্রশ্নটি থেকে যায়, এটা যে ছেলেখেলা সেটাও সবাই বোঝে কি না? গতকালই দুর্বার রাজশাহীর ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিকুর রহমান মহোদয় বলেছেন, ‘ফিক্সিং শব্দটাই আমার জানা নেই, এটা কীভাবে করে, সেটা তো আরও জানা নেই।’
ভদ্রলোকের কথা শুনে কেউ কেউ বলে বসতে পারেন, ভাই কি দুনিয়ায় নতুন? না, ভাইটির দাবি অনুযায়ী, তিনি ‘বিপিএলে নতুন’। ক্রিকেট খেলাটাও ‘কম বোঝেন।’ ক্রিকেটের সঙ্গে কাজ করছেন এবারই প্রথম। যদিও সব ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিকপক্ষের লোকজন তেমন নন। রংপুর রাইডার্সের টিম ডিরেক্টর শাহনিয়ান তানিম যেমন বেশ দুঁদে লোক। তাঁর ‘কিছু ফ্র্যাঞ্চাইজির খেলোয়াড়দের দেখে মনে হয়েছে সন্দেহজনক কিছু একটা হচ্ছে।’
লেগ সাইডের বাইরে বড় বড় ওয়াইড যে সেই সন্দেহজনক কিছু একটার অংশ—তা সরাসরি কেউ না বললেও ঠারেঠোরে সবাই সেটাই বুঝে নিচ্ছেন। সমাধানটা হলো বোলারদের এভাবে ওয়াইড দেওয়া বন্ধ করতে পারলে কিন্তু এটার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত আরেকটি সন্দেহজনক কাজও থামানো সম্ভব। ওভারপ্রতি ১১ থেকে ১৫ রানের মতো দেওয়ার রোগের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, যেটিকে স্পট ফিক্সিংয়ের ট্রেন্ড বলে বিপিএলের দলগুলোর সঙ্গে থাকা কারও কারও পর্যবেক্ষণ।
ওয়াইড বল থামানোয় সিদ্ধ পুরুষ হুকসের পথে হেঁটে ওয়াইড যদি থামানো কিংবা কমানো যায়, তাহলে বলগুলো তো পিচেই করতে হবে। তখন বোলার চাইলেও সব সময় অত রান সম্ভবত দিতে পারবেন না। কারণ তখন ‘কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা’র অবকাশও থাকবে। যেমন ধরুন, ম্যাচের কোনো কোনো পর্যায়ে কিছু ফ্র্যাঞ্চাইজির ব্যাটসম্যানদের হুট করে স্থবির ব্যাটিং করতে দেখা যাচ্ছে। সেই সময়টা যদি বোলারের ১১–১৫ রান দেওয়ার সময় হয়, তাহলে কী মজাটাই না হয়। তাহলে এমন দৃশ্য দেখা গেলেও যেতে পারে—বোলার লেগ সাইডে লম্বা ওয়াইড করছেন আর ব্যাটসম্যান দৌড়ে গিয়ে সেই বল পায়ে লাগিয়ে ওয়াইড বাঁচাচ্ছেন! হয়তো এভাবেই বিষে বিষ ক্ষয় সম্ভব!
অথচ বাজার কথা ছিল বিশের বাঁশি। কিন্তু বিপিএলে বাজছে সন্দেহের ভেঁপু! সন্দেহ বাড়তে বাড়তে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে উপর্যুপরি বাউন্সার থেকে ওভার থ্রোও ঠিক সহজাত ক্রিকেটের অংশ বলে মনে হচ্ছে না। রান কম উঠছে না, চার–ছক্কাও হচ্ছে এন্তার, উইকেট পাচ্ছেন বোলারও, তবু ঠিক ক্রিকেট–ক্রিকেট লাগছে না!
তবে কি এ নস্টালজিক ভাবনার ভুল? পৃথিবী ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটকে মাথার মুকুট করে ঠিকই এগিয়ে যাচ্ছে। আর এই ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের জন্ম থেকেই বিভিন্ন রকম ফিক্সিংয়ের উপাদানও বেড়েছে, সামনে হয়তো আরও বাড়বে। বিপিএলে না হয় সেসব ‘দক্ষতা’ই একটু উদোম হয়ে চর্চা করা হয়—অস্বীকার করতে পারেন, সেটা ‘আধুনিক’ ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের সঙ্গে তাল মেলানো নয়? তাহলে কিসের এত আপত্তি, কিসের এত সন্দেহ? মনটা পরিষ্কার করে টিভি সেটের সামনে বসলেই হয়। সন্দেহ বাতিকগ্রস্ত মনকে বোঝালেই হয়—ক্রিকেটে নো বল, ওয়াইড বল, ওভার থ্রো; সবকিছুই তো স্বাভাবিক! বিপিএলে খেলা ক্রিকেটাররাও তো রক্ত–মাংসের মানুষই!
তবু যদি কিছুতেই মন পরিষ্কার না হয়, তাহলে আসলে তান্ত্রিকের তাবিজই শেষ ভরসা। কারণ, সন্দেহরোগ দূরের যে কোনো অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ নেই। আয়ুর্বেদ, হোমিওপ্যাথ, ইউনানিশাস্ত্রেও নেই। আছে শুধু দেয়ালে সাঁটানো সেই সব পোস্টারের ঠিকানায়। লেখার এ পর্যায়ে এসে প্রশ্নটি একটু ঘোরাতেই হচ্ছে—আসলে এই চিকিৎসাটা কার বেশি প্রয়োজন; দর্শকদের চোখের নাকি ক্রিকেটারদের মনের?
খেলোয়াড়দের ওপর প্রয়োগ করা হলে ‘স্পট ফিক্সিং বাছতে ফ্র্যাঞ্চাইজি উজাড়’ হয়ে যেতে পারে, তা ছাড়া বিপিএল তো খেলোয়াড়দের রুটি–রুজিরও জায়গা। চাকরিজীবীরা যেমন মাসিক বেতনের পাশাপাশি অন্য কাজ করে অতিরিক্ত দুপয়সা কামান, বিপিএলেও তেমনি ম্যাচ ফি পারিশ্রমিকের বাইরে ক্রিকেটাররা যদি ‘টু পাইস’ কামান, এতে এত আপত্তি কিসের! সে বা তারা তো আপনার ঘর থেকে কেড়ে নিচ্ছে না! ফ্র্যাঞ্চাইজিদের তো নয়ই। কারণ, দু–একটি ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিক আবার এই তো সেদিন পৃথিবীতে আসা শিশু—ফিক্সিং শব্দটাই বোঝেন না!
কিন্তু বিপিএল নামের ক্রিকেটের এই পসার যাঁরা দেখছেন, উপভোগ করছেন; তাঁরা তো আর নিষ্পাপ শিশু নন! তাই তো অনেক কিছু দেখেই তাঁদের চোখ জ্বালা করে, মুখ ফসকে বেরিয়ে যায়—এটা ক্রিকেট, নাকি ব্যবসা! এরপরও সেই সব ক্রিকেটপ্রেমীকে একটা পরামর্শ দেওয়ার লোভ সামলাতে পারছি না—বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর। বিপিএলকে বিশ্বাস করুন, শান্তিতে থাকুন। আর চোখ জ্বালা করলে একবার চক্ষু হাসপাতাল থেকে ঘুরে আসতে পারেন!