খেলোয়াড়দের টাকাপয়সা নিয়ে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময় পার করে দুর্বার রাজশাহী যেন সত্যিই দুর্বার হয়ে উঠেছে! এনামুল হক বিজয় সেই যাত্রার দুরন্ত কাপ্তান। তবে আজ সেই যাত্রার শেষটা হলো বড় অতৃপ্তিতে। দুর্বার এক সেঞ্চুরি করেও যে দলকে জেতাতে পারেননি অধিনায়ক!
খুলনা টাইগার্সের ২০৯ রান তাড়া করতে নেমে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ছিল রাজশাহী, যার শেষটা গিয়ে ঠেকল ২ ওভারে ২৫ রানের সমীকরণে। তখনো সম্ভাবনা ছিল, কারণ উইকেটে ছিলেন তার আগেই ৪৯ বলে ৯০ রান করা এনামুল, সঙ্গে ১২ বলে ১৯ রান নিয়ে রায়ার্ন বার্ল।
কিন্তু শেষটা দুর্বার হলো না রাজশাহীর। সালমান ইরশাদের করা ১৯তম ওভারে এল মাত্র ৮ রান, সেটাও শেষ বলে বার্লের উইকেট হারিয়ে। শেষ ওভারে লক্ষ্য আরও কঠিন—৬ বলে ১৭। জিততে পারলে ৯১ রান নিয়ে ওভার শুরু করা এনামুলের সেঞ্চুরিটাও নিশ্চয়ই হয়ে যাবে। একসঙ্গে দুই উদ্যাপন দেখার অপেক্ষায় তখন রাজশাহী। ওদিকে খুলনা দিতে চায় মরণ কামড়। মিরপুরে প্রথম দুই ম্যাচ জেতার পর টানা চার ম্যাচে হার। এরপর কি ২০৯ রান করেও জেতার সুযোগ হাতছাড়া করা যায়!
অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ শেষ ওভারে বল তুলে দিলেন হাসান মাহমুদের হাতে। প্রথম বলে এনামুলের হাতে চার খেলেও পরের প্রতিটি বলেই আস্থার প্রতিদান দিয়েছেন জাতীয় দলের এই পেসার। বাকি ৫ বলে একটিও বাউন্ডারি না দিয়ে দিলেন মাত্র ৫ রান। শেষ বলে অবশ্য ১ রান নিয়ে ৫৭ বলে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেছেন রাজশাহীর অধিনায়ক এনামুল। কিন্তু সেটা যেন করার জন্যই করা। সেঞ্চুরি এবং হার একই বলে এলে হারের হতাশার জ্বালায় যে ব্যাটটাও তোলা যায় না!
বড় লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ৪.১ ওভারে ৪৭ রানের উদ্বোধনী জুটি—সম্ভাবনা জাগানো শুরুই করেছিল রাজশাহী। অল্প রানের প্রথম ম্যাচে হেরে চিটাগং কিংস চট্টগ্রামের দর্শকদের আরেকবার হতাশ করলেও রাজশাহীর অমন শুরুর পর অনুমান করা যাচ্ছিল দ্বিতীয় ম্যাচ থেকে হয়তো টি-টোয়েন্টির রোমাঞ্চ ছড়াবে।
জিশান আলম (১৫ বলে ৩০), ইয়াসির আলী (১৭ বলে ২০), বার্লদের (১৬ বলে ২৫) নিয়ে এনামুল সেরকম এক সমাপ্তির দিকেই নিয়ে যান ম্যাচটাকে। ৫৭ বলে অপরাজিত ১০০ রানের ইনিংসে ৫ ছক্কার সঙ্গে বাউন্ডারি মেরেছেন ৯টি। এর আগে মিরাজকে চার মেরে ৩৩ বলে করেছেন ফিফটি। তখনই তাঁর ইনিংসে তিন ছক্কা আর চার বাউন্ডারি। যেকোনো টি-টোয়েন্টিতে তৃতীয় সেঞ্চুরি করা এনামুল বিপিএলে তিন অঙ্কের দেখা পেলেন এই প্রথম। এবারের বিপিএলে এটি সপ্তম সেঞ্চুরি, যা কিনা বিপিএলের এক মৌসুমে সর্বোচ্চ।
দিনের প্রথম ম্যাচটা হয়েছিল অল্প রানের। চিটাগং কিংসের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে এর দায় উইকেটকেও কিছুটা দিয়েছেন ফরচুন বরিশালের অধিনায়ক তামিম ইকবাল আর ডেভিড ম্যালান। কিন্তু চিটাগং কিংসের স্পিন বোলিং কোচ এনামুল হক উইকেটটাকে শুধু ভালোই বলেননি, সংবাদ সম্মেলন কক্ষ থেকে বের হয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন—পরের ম্যাচে দুই শ রান হবে।
জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে আজ রাতে হলো ঠিক সেটাই। খুলনার ৪ উইকেটে ২০৯ রান তাড়া করে সমান উইকেটে ২০২ রান পর্যন্ত করেছে রাজশাহী। আগের ম্যাচে সিলেট সিক্সার্সকে হারানোর পর এনামুলের সেঞ্চুরিতে ভর করে এত কাছে গিয়েও ৭ রানের হার মেনে নেওয়াটা কষ্টকরই তাঁদের জন্য।
এর আগে মোহাম্মদ নাঈমের সঙ্গে ওপেনিংয়ে জুটি বেঁধে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ছিলেন খুলনার অধিনায়ক মিরাজ। সানজামুল ইসলামের করা ইনিংসের তৃতীয় বলে ছক্কা মেরে শুরুটা অবশ্য নাঈমই করেছিলেন। শেষ দুই বলে মিরাজের দুই বাউন্ডারিতে প্রথম ওভারেই ১৭ রান। জিশান আলমের করা পরের ওভারে আসা ১৩ রানসহ পাওয়ারপ্লেতে খুলনার রান ছিল ৬০।
দুই ওপেনারসহ ওই ৬ ওভারে খুলনাকে অবশ্য তিনটি উইকেটও হারাতে হয়েছিল। আউট হওয়া তৃতীয় ব্যাটসম্যান দলের হয়ে আজই প্রথম খেলতে নামা অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার অ্যালেক্স রস। পাওয়ারপ্লের শেষ বলে রসের রান আউটের পর একটু সময় নিলেন উইকেটে থাকা দুই ব্যাটসম্যান আফিফ হোসেন ও উইলিয়াম বোসিস্ট। পরের তিন ওভারে মাত্র একটাই বাউন্ডারি, বোসিস্টের ব্যাট থেকে।
সময় নিয়ে আসলে উইকেটে থিতু হচ্ছিলেন দুই ব্যাটসম্যান। দশম ওভারে মার্ক দেয়ালকে আফিফের ছক্কা যার প্রথম ফলাফল। এর পর থেকে প্রায় প্রতি ওভারেই বাউন্ডারি, ওভার বাউন্ডারি; কখনো বা দুটোই। ১০ থেকে ১৫—এই ৫ ওভারে ৫২ রান। আর শেষ ৫ ওভারে ৬২। এর প্রায় পুরোটাই চতুর্থ উইকেটে আফিফ-বোসিস্টের ৭১ বলে ১১৩ রানের জুটির সৌজন্যে। ফিফটি করেছেন দুজনই। ১৭.৫ ওভারে আউট হয়ে যাওয়া আফিফের (৪২ বলে ৫৬) চেয়ে বেশি আক্রমণাত্মক ছিল বোসিস্টের ব্যাট। ৩২ বলে ফিফটি করে তিনি অপরাজিত ছিলেন ৩৭ বলে ৫৫ রানে।
শেষ দিকে মাহিদুল ইসলাম তো ছোট একটা ঝড়ই তুললেন জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামের উইকেটে। পঞ্চম উইকেটে বোসিস্টের সঙ্গে অবিচ্ছিন্ন ৩৬ রানের জুটি গড়েছেন মাত্র ১৩ বলে, যার ৩০-ই চারটি ছক্কা মারা মাহিদুলের ব্যাট থেকে আসা।
দুর্বার ব্যাটিংয়ে সবাইকেই অবশ্য ছাপিয়ে গিয়েছিলেন এনামুল। কিন্তু শেষটা জয় দিয়ে হলো না বলেই উঠল না তাঁর ব্যাট। দুরন্ত উদ্যাপনে মাততে পারল না দুর্বার রাজশাহী।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
খুলনা টাইগার্স: ২০ ওভারে ২০৯/৪ (আফিফ ৫৬, বসিস্টো ৫৫*, মাহিদুল ৩০*, নাঈম ২৭, মিরাজ ২৬; তাসকিন ২/৩৬)।
দুর্বার রাজশাহী: ২০ ওভারে ২০২/৪ (এনামুল ১০০*, জিশান ৩০, বার্ল ২৫, ইয়াসির ২০; হাসান মাহমুদ ২/২৫)।
ফল: খুলনা টাইগার্স ৭ রানে জয়ী।
ম্যান অব দ্য ম্যাচ: হাসান মাহমুদ