কাঠমান্ডুর স্মৃতিতে বিভোর বিপ্লব

বিপ্লব ভট্টাচার্য
বিপ্লব ভট্টাচার্য

দশরথ স্টেডিয়ামে পা রাখলেই স্মৃতির কোলাজ ভিড় করে তাঁর মনে। আগামীকাল আরও একবার সেই স্মৃতি ১৪ বছর আগে ফিরিয়ে নেবে বিপ্লব ভট্টাচার্যকে।
অষ্টম সাফ ফুটবলে বাংলাদেশের উদ্বোধনী ম্যাচে নেপালের বিপক্ষে পোস্টের নিচে দাঁড়ানোর সুযোগ মিলবে কি না জানেন না। সেটি শুধু বলতে পারেন কোচ লোডভিক ডি ক্রুইফ। খেলার সুযোগ পেলে ভালো, না পেলেও হতাশা নেই। কাঠমান্ডুর দশরথ ‘রঙ্গশালা’ যে বিপ্লবের ফুটবল-জীবনের বড় এক বাঁক।
এখানেই ১৯৯৭ সাফ ফুটবলটা বাংলাদেশের কেটেছিল দুঃস্বপ্নের মতো। কিন্তু বুকের মধ্যে জমে থাকা কষ্টটাকে দুই বছর পর শক্তিতে পরিণত করলেন বিপ্লব। ১৯৯৯ কাঠমান্ডু সাফ গেমসে বাংলাদেশ প্রথম পেল দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবল-শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট। দীর্ঘ হাহাকার ঘুচিয়ে আরাধ্য সোনা সেবার গলায় তুলতে বিপ্লব নিয়েছিলেন অগ্রণী ভূমিকা। প্রথম ম্যাচে মালদ্বীপের কাছে ২-০ গোলে হারের পর পোস্টের নিচে আর মোহাম্মদ পনিরকে নামাননি কোচ শামির সাকির। বছর তিনেক আগে মাত্র ১৬ বছর বয়সে জাতীয় দলে অভিষিক্ত তরুণ বিপ্লব এরপর মঞ্চে।
সেমিফাইনালে ভারতের বিপক্ষে ১-০ জয়। ফাইনালে স্থানীয় ২০ হাজার দর্শককে স্তব্ধ করে নেপালকে ১-০ গোলে হারিয়ে জয়োল্লাস বাংলাদেশের। সেমিফাইনাল-ফাইনালে চীনের প্রাচীর তুলে বাংলাদেশের পোস্ট আগলে রাখা নামটি বিপ্লব ভট্টাচার্য।
পদ্মায় জল গড়িয়েছে অনেক। বিপ্লবের ক্যারিয়ার এগিয়েছে ভাঙাগড়ার খেলায় ভেসে। তাঁর সঙ্গেই জাতীয় দলে শুরু করা আমিনুল এক নম্বর গোলরক্ষক হিসেবে বছর তিনেক আগে অবসর নেন। মনে হচ্ছিল, আমিনুলের বিদায়ে এবার বুঝি বিপ্লব এক নম্বর হবেন। হতে পারেননি। গত দিল্লি সাফ ফুটবলে অধিনায়ক হিসেবে গেলেও কাটল বেঞ্চেই। জাতীয় দলে শেষের ঘণ্টা শুনতে শুনতেই দেড় বছর পর পুনরুজ্জীবন ডি ক্রুইফের হাত ধরে। তবে বিপ্লবের গোলরক্ষক জীবনের গল্প এমনই যে, এখনো প্রথম একাদশে খেলা নিয়ে দোলাচলে থাকেন।
‘এ বছরই দেশের মাটিতে কোনো একটা ম্যাচ খেলে অবসর নিতে চাই জাতীয় দল থেকে’—নিজের এই ইচ্ছের কথা বলতে গিয়ে আবেগ ছুঁয়ে যায় পৃথিবীর সম্ভবত সবচেয়ে ধৈর্যশীল গোলরক্ষককে। বছরের পর বছর জাতীয় দলের বেঞ্চে কাটিয়েও যাঁর কোনো ক্ষোভ নেই। বরং নিজেকে সুখী ভাবেন এই ভেবে, ‘ফুটবল আমাকে অনেক দিয়েছে।’
হ্যাঁ, ফুটবল বিপ্লবকে অনেক কিছুই দিয়েছে। পেছনে ফেলে এসেছেন রূপকথার মতো কিছু গল্পও। বাংলাদেশের ফুটবলে এখন তারকা-সংকট। অথচ সাফ গেমস সোনা জেতার পর এই কাঠমান্ডুতেই বিপ্লবকে নিয়ে সে কী উন্মাদনা! দেশে ফেরার পর অনেক নেপালি ভক্তের চিঠি পেতেন, যাঁদের ভিড়ে থাকা এক তরুণী বিয়ের প্রস্তাবও দিয়েছিলেন।
হরি খাড়কা একবার বিপ্লবকে বলেছিলেন, ‘তুমি চাইলে নেপালে বিয়ে করতে পারো। অনেক পাত্রী আছে।’ ওই নস্টালজিয়ায় কাল ফিরে গিয়ে অভিজ্ঞ গোলরক্ষক বলছিলেন, ‘হরিকে তখন না বলেছিলাম। কারণ, সেটা সম্ভব মনে করিনি।’ নেপাল জাতীয় দলের সাবেক এই স্ট্রাইকার ঢাকায় বেশ কয়েক বছর খেলেছেন। সেই সুবাদে বাংলাদেশের এই দলের শুধু বিপ্লবই তাঁর পরিচিত। মজার ব্যাপার, সাফ গেমস জয়ের ১৪ বছর পরও এই সাফ মিশনে বিপ্লবকে বাংলাদেশ দলে দেখে বিস্মিত হরি!
‘হরি এসেছিল আমার রুমে। আমি এখনো খেলছি শুনে সে অবাক। ভারতের সন্দ্বীপ নন্দীর মতো সিনিয়রও শুভাশিস জানিয়ে গেছে আমাকে, বলেছে খেলে যাও বন্ধু’—আরও আপ্লুত বিপ্লব।
ও হ্যাঁ, আসল কথাই বলা হয়নি। ১৯৯৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত হওয়া আটটি সাফ ফুটবলেই আছেন বিপ্লব, যেটি রেকর্ড। শুরু হয়েছিল কাঠমান্ডু থেকেই। বাংলাদেশের ‘ফুটবল বিপ্লবে’র অগ্রসেনানী এখন তাই কাঠমান্ডুর স্মৃতি রোমন্থনে বিভোর।