রাগ সংবরণ করার উপায় নিয়ে মহানবী (সা.)–এর পরামর্শ
রাগ চরম বিধ্বংসী। শুধু অন্যের জন্য নয়, নিজের জন্যও। এ কারণে নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘আদম সন্তানের অন্তর একটি উত্তপ্ত কয়লা।’ (তিরমিজি)।
কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল অবস্থায় ব্যয় করে ও যারা ক্রোধ সংবরণ করে আর মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল, আল্লাহ্ (সেই) সৎকর্মপরায়ণদেরকে ভালোবাসেন।।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৪)।
আল্লাহ বলেন, ‘আসলে তোমাদেরকে যা-কিছু দেওয়া হয়েছে তা পার্থিব জীবনের ভোগ, কিন্তু আল্লাহ্র কাছে যা আছে তা আরও ভালো ও আরও স্থায়ী—তাদের জন্য যারা বিশ্বাস করে ও তাদের প্রতিপালকের ওপর নির্ভর করে, যারা গুরুতর পাপ ও অশ্লীল কাজ থেকে নিজেদেরকে বাঁচিয়ে রাখে, আর রাগ করেও ক্ষমা করে দেয়, (সুরা আশ-শুরা, আয়াত: ৩৬-৩৭)।
হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আত্মসংযম ও ধৈর্যশীলতা ছিল অপরিসীম। তাঁকে অপমান, অপদস্থ ও শারীরিক নির্যাতন করার পরও তিনি অসংখ্যবার অসামান্য ধৈর্য দেখিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘যে নিজের ক্রোধ চরিতার্থ করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা সংবরণ করে, আল্লাহ তাকে কিয়ামতের দিন সমগ্র সৃষ্টির সামনে ডেকে আনবেন এবং জান্নাতের যেকোনো হুর নিজের ইচ্ছামতো বেছে নেওয়ার অধিকার দান করবেন।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪,১৮৬)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য বান্দার ক্রোধ সংবরণে যে মহান প্রতিদান রয়েছে, তা অন্য কিছুতে নেই।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪,১৮৯)।
এক ব্যক্তি নবীজি (সা.)-কে বললেন, আপনি আমাকে অসিয়ত করুন। তিনি বললেন, তুমি রাগ কোরো না। ওই ব্যক্তি কয়েকবার তা বললেন। নবীজি (সা.) প্রতিবারই বললেন, রাগ কোরো না। (বুখারি, হাদিস: ১৩৭)।
রাগ হলে কী করা উচিত
রাগ হলে কী করা উচিত, সে প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) উপদেশ দিয়েছেন, ‘যদি তোমাদের কেউ দাঁড়ানো অবস্থায় রাগান্বিত হয়ে পড়ে, তবে তার উচিত বসে পড়া। যদি তার রাগ কমে যায়, তবে ভালো; নয়তো তার উচিত শুয়ে পড়া।’ (তিরমিজি)।
নবী করিম (সা.) রাগান্বিত হলে অজু করতেও পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘রাগ আসে শয়তানের পক্ষ থেকে; শয়তানকে তৈরি করা হয়েছে আগুন থেকে, আর একমাত্র পানির মাধ্যমেই আগুন নেভানো সম্ভব। তাই তোমাদের মধ্যে কেউ যখন রাগান্বিত হয়ে পড়ে, তার উচিত অজু করা।’ (আবু দাউদ)।
নবীজি (সা.) শয়তানের প্রভাব থেকে বাঁচার জন্য অন্যান্য পদ্ধতি প্রয়োগের কথাও বলেছেন। নবী করিম (সা.) বলেন, ‘আমি এমন একটি কালিমা জানি, যা পাঠ করলে ক্রোধ দূর হয়ে যায়। (আর তা হলো) আউজুবিল্লাহি মিনাশ্ শাইত্বনির রাজিম অর্থাৎ, আমি বিতাড়িত শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাই।’ (মুসলিম, হাদিস: ৬,৩১৭)।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (র.) বর্ণনা করেছেন যে নবীজি (সা.) উপদেশ দিয়েছিলেন, ‘তোমাদের কেউ রাগান্বিত হয়ে পড়লে, তাকে নীরব থাকতে দাও।’
জীবনের এক কঠিনতম সময়ে নবীজি (সা.) তায়েফে গিয়েছিলেন। তায়েফবাসী তাঁকে সহযোগিতার বদলে আঘাত করেছিল। তাঁর শরীর থেকে রক্ত গড়িয়ে পায়ে গিয়ে জমাট বাঁধল। আল্লাহর পক্ষ থেকে এক ফেরেশতা এসে তায়েফের দুপাশের পাহাড় এক করে দিয়ে তায়েফবাসীকে হত্যা করার অনুমতি চাইলেন। নবী (সা.)-এর উত্তর ছিল, ‘(না, তা হতে পারে না) বরং আমি আশা করি মহান আল্লাহ তাদের বংশে এমন সন্তান দেবেন, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে, তাঁর সঙ্গে শরিক করবে না।’ (বুখারি, হাদিস: ৪৫৪)।
নবীজি (সা.) একবার সাহাবিদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমাদের মধ্যে কাকে তোমরা বেশি শক্তিশালী মনে করো?’ তাঁরা উত্তর দিলেন, ‘যে ব্যক্তি কুস্তিতে অন্যকে হারিয়ে দিতে পারে।’ নবী করিম (সা.) বললেন, ‘যে কাউকে কুস্তিতে হারিয়ে দেয় সে প্রকৃত বীর নয়; সে-ই প্রকৃত বীর যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়।’ (বুখারি, হাদিস: ৫৬৮৪)।
হজরত আলী (রা.) এক যুদ্ধে অমুসলিম বাহিনীর সেনাপ্রধানকে সম্মুখযুদ্ধে ধরাশায়ী করে তাকে হত্যা করতে উদ্যত হলে তিনি আলী (রা.)-এর মুখে থুতু নিক্ষেপ করলেন। সঙ্গে সঙ্গে আলী (রা.) লোকটিকে ছেড়ে দিয়ে পিছিয়ে গেলেন। সেনাপ্রধান বললেন, ‘আপনি আমাকে হত্যা করতে পারতেন, কিন্তু তা করলেন না কেন?’ আলী (রা.) বললেন, ‘আপনার সঙ্গে তো আমার কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ নেই। আপনার সঙ্গে আমি যুদ্ধ করেছি শুধু আপনার অবিশ্বাস ও আল্লাহর প্রতি বিদ্রোহের কারণে। আমার মুখে থুতু নিক্ষেপের পর আমি যদি আপনাকে হত্যা করতাম, তবে তা হয়ে পড়ত আমার ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও প্রতিশোধস্পৃহার বহিঃপ্রকাশ, যা আমি কখনোই চাই না।’ (সাহাবা চরিত)।