এক সপ্তাহ আগে কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে নিউরাইপিএস কনফারেন্সে একটা মজার বক্তৃতা দিয়েছিলেন ওপেনএআইয়ের সাবেক কো-ফাউন্ডার ইলিয়া সাতস্কেভার। এত দিন আমরা ভেবেছি যত বেশি ডেটা, তত বেশি কম্পিউটিং পাওয়ার, তত ভালো এআই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমাদের কাছে এটাই স্বতঃসিদ্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু সামনে একটা বড় সমস্যা আসছে। যেটা আমাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে সনাতন ভাবনাকে একেবারে পাল্টে দিতে পারে।
কম্পিউটারের প্রসেসিং পাওয়ার দিন দিন বাড়ছে, কিন্তু ডেটা বাড়ছে না। পৃথিবীতে তো একটাই ইন্টারনেট। ইলিয়া এটাকে ‘এআইয়ের ফসিল ফুয়েল’ হিসেবে উল্লেখ করে জানালেন যে একদিন এই জ্বালানিও শেষ হয়ে যাবে। হয়তো আমাদের নতুন পথ খুঁজতে হবে, যেখানে খুব কম ডেটা দিয়েও এআই অনেক বেশি শিখতে পারবে। তিনি একটা মজার তুলনা করলেন।
প্রাণীদের শরীরের ওজন আর মস্তিষ্কের ওজনের মধ্যে একটা সম্পর্ক আছে। বিশেষ করে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের শরীরের ওজন আর তাদের মস্তিষ্কের ওজনের সম্পর্কটা আনুপাতিক। যেমন একটা ছোট ইঁদুরের শরীর আর মস্তিষ্কের ওজন, একটা বিড়ালের শরীর আর মস্তিষ্কের ওজন, একটা কুকুরের শরীর আর মস্তিষ্কের ওজন, এদের মধ্যে একটা নির্দিষ্ট অনুপাত থাকে। শরীর যত বড় হয়, মস্তিষ্কও তত বড় হয় একটা নির্দিষ্ট হারে।
কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে এ সম্পর্কটা আলাদা। হোমিনিডদের (মানুষ প্রজাতি) ক্ষেত্রে এ অনুপাতটা অন্য রকম। তাদের মস্তিষ্কের ওজন অনেক দ্রুত বাড়ে শরীরের ওজনের তুলনায়। ইলিয়া সাতস্কেভার ওই কনফারেন্সে এই অনুপাতের গ্রাফটা একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণে দেখিয়েছেন।
তিনি বলতে চাইছেন প্রকৃতিতেও এমন উদাহরণ আছে, যেখানে একই জিনিসের স্কেলিং (বৃদ্ধির হার) হঠাৎ করে অন্য রকম হয়ে যেতে পারে। যেমন হোমিনিডদের মস্তিষ্কের বিকাশ অন্য প্রাণীদের থেকে আলাদা পথে হয়েছে। এ পার্থক্যটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এর মানে হলো, হোমিনিডদের মস্তিষ্ক অন্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের তুলনায় অনেক দ্রুত হারে বড় হয়েছে শরীরের তুলনায়। এটা আমাদেরকে রাস্তা দেখাচ্ছে যে প্রকৃতিতেও অন্য রকম স্কেলিং সম্ভব।
পুরোনো নিয়ম ভেঙে যেভাবে নতুন পথে হাঁটা সম্ভব, সেভাবে নতুন সম্ভাবনা খোঁজা সম্ভব। ঠিক যেমন প্রকৃতি তার নিজের নিয়ম ভেঙে মানুষের মস্তিষ্কের বিকাশ ঘটিয়েছিল, তেমনি আমরাও হয়তো এআইয়ের ক্ষেত্রে নতুন রাস্তা পেয়ে যাব। আমাদের শুধু সেই সম্ভাবনাগুলো খুঁজে বের করতে হবে আর সাহস করে নতুন পথে হাঁটতে হবে।
ইলিয়া সাতস্কেভার এ জিনিসটাই এআইয়ের ক্ষেত্রে বলতে চাইছেন। এত দিন আমরা ভেবেছি, যত বেশি ডেটা, তত বেশি কম্পিউটিং পাওয়ার, তত ভালো এআই। এখন হয়তোবা এটাই স্বতঃসিদ্ধ পথ। এটা সেই সাধারণ স্তন্যপায়ী প্রাণীদের লাইনের মতো সরলরেখা, অনেকটাই প্রেডিক্টেড। কিন্তু হয়তো আমরা এখন এমন একটা মোড়ে এসেছি, যেখানে এই নিয়ম আর খাটবে না। হয়তো আমাদের নতুন পথ খুঁজতে হবে, যেখানে খুব কম ডেটা দিয়েও এআই অনেক বেশি শিখতে পারবে, ঠিক যেমন হোমিনিডরা তাদের নিজস্ব পথে বিকশিত হয়েছিল।
প্রকৃতি আমাদের দেখাচ্ছে যে বড় পরিবর্তন সম্ভব, কিন্তু সেটা হতে পারে আমরা যে পথে হাঁটছি তার বাইরেও। আমাদের শুধু সেই নতুন পথগুলো খুঁজে বের করতে হবে। হয়তো সেখানেই লুকিয়ে আছে এআইয়ের পরবর্তী ‘বিগ জাম্প’। এটা শুধু একটা বৈজ্ঞানিক তথ্য নয়, এটা আমাদের একটা আশার রাস্তা দেয়।
পুরোনো নিয়ম ভেঙে যেভাবে নতুন পথে হাঁটা সম্ভব, সেভাবে নতুন সম্ভাবনা খোঁজা সম্ভব। ঠিক যেমন প্রকৃতি তার নিজের নিয়ম ভেঙে মানুষের মস্তিষ্কের বিকাশ ঘটিয়েছিল, তেমনি আমরাও হয়তো এআইয়ের ক্ষেত্রে নতুন রাস্তা পেয়ে যাব। আমাদের শুধু সেই সম্ভাবনাগুলো খুঁজে বের করতে হবে আর সাহস করে নতুন পথে হাঁটতে হবে।
রকিবুল হাসান
টেলিকম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক লেখক ও একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা