ট্র্রাম্পের চাপে কেন গাজায় যুদ্ধবিরতি মানলেন নেতানিয়াহু

ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুফাইল ছবি

কাতারে গত বুধবার আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর এটা এখন নিশ্চিত যে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে জিম্মি মুক্তির বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে। এখন ইসরায়েলের অভ্যন্তরে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হলে আশা করা যায় যে রোববার থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে, শুরু হবে জিম্মিদের মুক্তি দেওয়া।

রোববারই নারী জিম্মিদের ছোট একটি দল ইসরায়েলে ফেরত আসবে। আর ঘটনাটি ঘটবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের ঠিক আগের দিন, যেমনটি তিনি চেয়েছেন। দুই মধ্যস্থতাকারী মিসর ও কাতারসহ ইসরায়েল ও হামাসের ওপর তিনি প্রবল চাপ প্রয়োগ করায় অবশেষে ১৫ মাসব্যাপী যুদ্ধের একটা বিরতি ঘটতে যাচ্ছে।

অনেক মূল্যের বিনিময়ে এই সুখবরটা এসেছে। জিম্মিদের অবস্থা তেমন সুবিধার নয়। ২০২৩ সালের নভেম্বরে এক সপ্তাহের বিরতিতে যে কয়জন জিম্মি ফেরত এসেছিলেন, তাঁদের অবস্থা আমরা তখন দেখেছি।

ট্রাম্প ও বিদায়ী মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ছাড়াও যুদ্ধবিরতির সমঝোতা–প্রক্রিয়ায় যাঁরা যুক্ত ছিলেন, তাঁদের প্রত্যেককেই ধন্যবাদ দিতে হয়। এই যুদ্ধ ছিল ইসরায়েলের ইতিহাসের কঠিনতম।

গাজা উপত্যকায় ৮৮ জন ইসরায়েলি ও ১০ জন বিদেশি আটক ছিলেন। এখন তাঁদের অর্ধেক জীবিত। শিগগিরই তাঁরা মুক্ত হবেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর তাঁদের  জিম্মি করা হয়েছিল।

ট্রাম্প না হলে সমঝোতার চূড়ান্ত ধাপ অর্জিত হতো না। নভেম্বরে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর তিনি তাঁর সুস্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন—পুরোপুরি যুদ্ধবিরতি এবং পর্যায়ক্রমে জিম্মিদের ফেরত আনা।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর অন্ধ সমর্থকদের কেউ কেউ অবশ্য এখন একটু ধাতস্থ হতে শুরু করেছেন। ট্রাম্প ইসরায়েল বা নেতানিয়াহুর কোনো ভক্ত নন। তিনি যা করেছেন, তা তাঁর বিভিন্ন স্বার্থের দিক খেয়াল রেখে করেছেন, যেখানে গুরুত্ব পেয়েছে দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক কৌশলগত চিত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান সংহত করা। পাশাপাশি নিজেরে মর্যাদা ও অবস্থান খেয়াল করা।

অনেক দিন ধরে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই সমঝোতা করতে চাননি। তাঁর অনুসারীরাও দাবি করেছেন যে নেতানিয়াহুর বিবেচনাগুলো সঠিক। মিসরের সঙ্গে গাজা উপত্যকার সীমান্তে কথিত ফিলাডেলফি করিডর নিয়ন্ত্রণে রাখা ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য জরুরি বলে দাবি করা হয়েছিল।

তব ট্রাম্পের চাপে নেতানিয়াহু যেভাবে এই দাবি থেকে সরে এলেন, তাতে এই দাবির যৌক্তিকতা আসলে কতটুকু, তা বুঝিয়ে দিয়েছে। রাজনৈতিকভাবে নিজেকে টিকিয়ে রাখার বিষয়টিই নেতানিয়াহুর কাছে অনেক দিন ধরে মুখ্য বিবেচনা ছিল। নিজের আইনি বিপর্যয় এড়ানোর দিকেই তাঁর সর্বাত্মক মনোযোগ ও ঔদ্ধত্য ৭ অক্টোবরের ভয়াবহ বিস্ময় সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছে। যুদ্ধের সময়েও নেতানিয়াহুর কর্মকাণ্ডের তেমন কোনো উন্নতি ঘটেনি। তিনি যদি হামাস-পরবর্তী সময়ের জন্য কূটনৈতিক সমাধান নিয়ে আলোচনা করতে সম্মত হতেন, তাহলে হয়তো সেনাবাহিনীকে গত কয়েক মাস অপ্রয়োজনীয়ভাবে গাজার পাকচক্রে আটকে থাকতে হতো না।

অবশ্য বিকল্প কোনো কূটনীতিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। গাজার বেসামরিক বিষয়ের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের জন্য হামাসই এখন সুবিধাজনক অবস্থানে আছে, আছে পর্যায়ক্রমে সামরিক শক্তি পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও।

ইসরায়েলের জনগণ বরং বিস্মিত হবেন, এটা জেনে যে ইসরায়েলের রক্ষাকারী হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকার জন্য যিনি খুব উদ্‌গ্রীব ছিলেন, তিনি কীভাবে সমঝোতা মেনে নিয়েছেন। শুধু ফিলাডেলফি করিডর নয়; বরং নেৎজারিম করিডরের নিয়ন্ত্রণও ছাড়তে হবে ইসরায়েলি বাহিনীকে আর ১০ লাখ ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিককে উত্তর গাজায় ফিরে যাওয়ার ওপরও কঠোর নজরদারি থাকবে না। নেতানিয়াহু প্রতিদিন ৬০০ ট্রাক মানবিক সাহায্য গাজায় প্রবেশ করতে দিতেও সম্মত হয়েছেন; যা যুদ্ধের আগে দৈনিক যা প্রবেশ করত, তার চেয়ে ১০০ বেশি।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর অন্ধ সমর্থকদের কেউ কেউ অবশ্য এখন একটু ধাতস্থ হতে শুরু করেছেন। ট্রাম্প ইসরায়েল বা নেতানিয়াহুর কোনো ভক্ত নন। তিনি যা করেছেন, তা তাঁর বিভিন্ন স্বার্থের দিক খেয়াল রেখে করেছেন, যেখানে গুরুত্ব পেয়েছে দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক কৌশলগত চিত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান সংহত করা। পাশাপাশি নিজেরে মর্যাদা ও অবস্থান খেয়াল করা।

নেতানিয়াহু বুধবারও ফিলাডেলফি করিডরে ইসরায়েলি সেনাদের অবস্থানের বিষয়ে সমঝোতার ব্যাখ্যা নিয়ে হামাসের সঙ্গে সংকট হতে পারে বলে উল্লেখ করেছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে তিনি তাঁর দাবি থেকে সরেননি। তাতে মূল চুক্তিতে কোনো হেরফের হবে না; কিন্তু জিম্মিদের পরিবারের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা যে আদৌ তাঁর বিবেচনায় নেই, সেটা আবার পরিষ্কার হয়ে গেল।

আগামী সপ্তাহ থেকেই জিম্মি মুক্তির কাজ শুরু হবে বলে আশা করা যায়। ছয় সপ্তাহের জন্য দুই পক্ষই যুদ্ধবিরতি বজায় রাখবে। এই সময়কালে ১ হাজার ২০০ ফিলিস্তিনি বন্দীকে মুক্তির বিনিময়ে ৩৩ জন ইসরায়েলি জিম্মি ছাড়া পাবেন। তবে সমঝোতার প্রকৃত পরীক্ষা হবে, দ্বিতীয় পর্যায়ে যখন জীবিত ও মৃত জিম্মিদের দ্বিতীয় দল ফেরত আসবে এবং গাজা উপত্যকা থেকে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহার করা হবে। ট্রাম্প নিশ্চিত যে এটা সম্পন্ন হবে যদিও এটা এমন এক দুরূহ মিশন, যার প্রতি পদেই অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা জড়িত।

পাশাপাশি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যও স্পষ্টতর হতে থাকবে, যেখানে গাজা পুনর্গঠন ও তার অর্থায়নে কোন কোন দেশ যুক্ত থাকছে, তা জানা যাবে। আর এটাও জানা যাবে যে গাজা উপত্যকায় হামাসকে সরিয়ে বিকল্প কোনো সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার মতো কোনো সুযোগ তৈরি হবে কি না।

  • অ্যামোস হারেল ইসরায়েলি সাংবাদিক। ইসরায়েলের দৈনিক হারেৎজ (ইংরেজি সংস্করণ) থেকে নেওয়া। বাংলায় সংক্ষেপিত অনুবাদ তানিম আসজাদ