২০২৩ সালে ব্রাজিল, বলিভিয়া, আর্জেন্টিনা, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, বাংলাদেশসহ প্রায় ১৩০টি দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ হয়েছিল। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ছাড়া বাকি সব কটি দেশে ডেঙ্গুর লাগাম টানা সম্ভব হলেও আমরা পারিনি। উল্টো গোদের ওপর বিষফোড়ার মতো জেঁকে বসেছে চিকুনগুনিয়া আর জিকা-আতঙ্ক। ৬ ডিসেম্বর ২০২৪ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জানান, দেশে জিকা ভাইরাসে ১১ জন ও চিকুনগুনিয়ায় ৬৭ জন আক্রান্ত হয়েছেন।
এখন কেউ মারা যায়নি বলে উৎকণ্ঠিত হওয়ার কিছু নেই—এটা ভাবা ঠিক হবে না। সারা পৃথিবীতেই জিকা ও চিকুনগুনিয়ায় মৃত্যুহার কম। তবে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে এর প্রতিক্রিয়া সুদূরপ্রসারী। জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তি রোগমুক্ত হওয়ার কয়েক মাস পরও তৈরি হওয়া তাঁর শুক্রাণুতে ভাইরাস থেকে যেতে পারে। তবে ঠিক কীভাবে তা শুক্রাশয়, শুক্রাণু উৎপাদনকারী টেস্টোস্টেরন হরমোনের কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলে, সে বিষয়ে এখনো গবেষণা চলছে। অন্যদিকে জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত গর্ভবতী মায়েদের সন্তানেরা মাইক্রোসেফালিতে আক্রান্ত হয়ে জন্মগত ত্রুটি নিয়ে জন্মাতে পারে। ব্রাজিলের যেকোনো জনপদে জিকাজনিত জন্মগত ত্রুটি নিয়ে জন্মানো শিশুর দেখা মেলে। সে দেশে এ বিষয়ে গবেষণা চলছে।
সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হচ্ছে, জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ৯০ শতাংশর ক্ষেত্রে কোনো লক্ষণই দেখা দেয় না। ফলে কিছু বুঝে ওঠার আগেই ক্ষতির বোঝা বাড়তে থাকে। এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, জিকা ও চিকুনগুনিয়া ভাইরাসে আক্রান্তের অধিকাংশ ‘ঢাকার বাসিন্দা’। গত বর্ষা মৌসুম শেষে এসে জিকা ও চিকুনগুনিয়া রোগী পাওয়া গেছে। চিকুনগুনিয়া ২০২৫ সালে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
দেশে যদি জিকা ভাইরাস ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তা হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। পাশাপাশি দেশে নতুন মহামারির উদ্ভব হবে। তাই নিজেদের সচেতনতা জরুরি।
দায় কে নেবে
বাংলাদেশে প্রতিবছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর হার বেড়েই চলেছে। মৃত্যুর এই উচ্চ হার বিশ্বের আর কোথাও নেই। যাঁরা মশা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে আছেন, তাঁরা দায় আর দরদ দিয়ে কাজ করেন না বলে অনেকের ধারণা। তাঁরা এটাকে চাকরি হিসেবেই দেখেন। আন্তরিকতাপূর্ণ সহাবস্থানের অভাবে ডেঙ্গু পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হচ্ছেন তাঁরা। একই সঙ্গে রোগীর অসচেতনতা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, রোগীকে উপজেলা পর্যায়ে প্রাথমিক চিকিৎসা না দিয়ে জেলা কিংবা বিভাগীয় হাসপাতালে রেফার করা হয়, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা প্রতিবছরই ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ায় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
সরকারের মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে জাতীয় নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও বিভাগীয় পর্যায় থেকে প্রতি মাসে এডিস মশার ঘনত্ব ও ঝুঁকির তথ্য এবং চাহিদাপত্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হবে। এ ক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধিদেরই মূল ভূমিকা পালনের কথা। কিন্তু গত ৫ আগস্ট গণ–অভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তনের পর থেকে দেশের প্রায় সব মেয়র ও কাউন্সিলরকে অপসারণ করা হয়।
জনপ্রতিনিধি না থাকায় কোনো তথ্যই মন্ত্রণালয়ে যায়নি এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। এসব সংস্থায় প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় সরকারি কর্মকর্তাদের। তদারকির অভাবে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম ভেঙে পড়ায় ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে বলে মনে করেন ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব কর্মকর্তার ব্যর্থতা ও নিষ্ক্রিয়তার কারণেই মূলত রাজধানীতে ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রম থমকে আছে। আর দিন দিন ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠছে।
এডিস মশা বিস্তার রোধে কী করা যায়
২০২৩ সালের ৫ অক্টোবর এ বিষয়ে ইউনিসেফ এবং স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় এক বৈঠকের আয়োজন করে। বৈঠকে বলা হয়, ডেঙ্গুর প্রকোপ কমাতে প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে নিয়ে বিভিন্ন খাতের সমন্বয়ে একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা। এর মধ্য দিয়ে শুধু উদ্ভাবনী সমাধান আসার পথই খুলবে তা নয়, বরং সব কমিউনিটি যেন প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার মাধ্যমে ডেঙ্গু মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়, তা-ও নিশ্চিত হবে। এ প্রস্তাবগুলো নিয়ে আর কোনো বৈঠকের কথা শোনা যায়নি। অনেকেই মনে করেন, অতীতে ম্যালেরিয়া দূর করার জন্য যেমন আলাদা কর্তৃপক্ষ গড়ে তোলা হয়েছিল, সেই আদলে একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান গড়ে না তুললে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ‘সবার দায়িত্ব, কিন্তু কেউ দায়ী নয়’ চাকার মধ্যে ঘুরপাক খাবে।
নাগরিকদের সবার আগে পুরো অভিযানের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে। এই সম্পৃক্ততা থাকবে নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে বাস্তবায়ন, নজরদারি, পর্যবেক্ষণ, মূল্যায়নসহ সব স্তরে। এরপরের কাজ সর্বসম্মত পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা। এ ব্যবস্থাপনার মূল লক্ষ্য হবে এডিস মশা জন্মানোর সব উৎসের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি প্রতিষ্ঠা এবং উৎসগুলো ধ্বংস করা। কীটনাশক যেটাই হোক, সেটা সঠিক মাত্রায়, সঠিক সময়ে, সঠিক জায়গায় প্রয়োগ করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন সঠিক নজরদারি।
প্রতিবেশীদের কাছ থেকে শেখা
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা মডেল ইতিমধ্যেই ডেঙ্গু সামাল দিতে সাফল্য অর্জন করেছে। মালয়েশিয়ায় কোনো ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সিটি করপোরেশনকে তথ্য প্রদান করে, রোগী ঠিক কোন এলাকা থেকে এসেছে, তা জানায়। সিটি করপোরেশন রোগীর ওই বাড়িকে নির্দিষ্ট করে তার এক থেকে দুই কিলোমিটার পরিধির মধ্যে যত ধরনের মশা বিস্তার করার মতো নর্দমা, নালা ও বাসা আছে, তা ফগার মেশিনের মাধ্যমে ওষুধ দিয়ে লার্ভা সমূলে ধ্বংস করে দেয়। ফলে ওই এলাকায় ডেঙ্গুর বিস্তার বন্ধ হয়ে যায়। মালয়েশিয়া ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ৬০ শতাংশের বেশি হ্রাস করতে পেরেছে।
ডেঙ্গু নিরাময় ও প্রতিরোধে ধারাবাহিক গবেষণা অপরিহার্য এবং সেই গবেষণার ফলাফলকে গুরুত্ব দিয়ে কাজে লাগানোর সংস্কৃতি তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।
● গওহার নঈম ওয়ারা লেখক ও গবেষক
wahragawher@gmail.com