প্রকৃত বিরোধী দল হওয়ার মানসিকতা কেন নেই

আওয়ামী লীগের টানা ১৫ বছরের শাসনামলে দেশে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তার মূলে কী? উত্তর হতে পারে—দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দলীয় দস্যুতা ইত্যাদি। একটু তলিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, এগুলো মূল রোগ নয়, রোগের উপসর্গমাত্র।

একটি বহুদলীয় গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কাঠামোয় তখনই ক্ষমতাসীন কোনো দল বা জোট লাগামছাড়া অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে যেতে পারে, যখন তার প্রকৃত পাহারাদার না থাকে।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রকৃত পাহারাদার হলো বিরোধী দল; অবশ্যই তা হতে হবে শক্তিশালী বিরোধী দল, গৃহপালিত বিরোধী দল নয়।

গত ১৫ বছরে (২০০৯ থেকে ২০২৪) আওয়ামী লীগ সরকার গণতন্ত্রের যে ময়নাতদন্ত করে ছেড়েছে, তার মূলে রয়েছে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল বা বিরোধী জোটের অনুপস্থিতি। আওয়ামী লীগ ছলেবলে ও কূটকৌশলে চারটি জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করে এসেছিল। এর মধ্য দিয়ে আসলে তারা নিজের পায়ে কুড়াল মেরেছিল। তা না হলে আজ আওয়ামী লীগের মতো এমন পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী একটি দলকে মানুষ এভাবে আস্তাকুঁড়ে ফেলে দেওয়ার সুযোগ পেত না।

শক্তিশালী বিরোধী দলের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের আসনপ্রাপ্তির পার্থক্য বেশি থাকাটা ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, আসনসংখ্যায় আকাশ–পাতাল ব্যবধান থাকলে সেটি অনেকটা বিশাল হাতির সামনে ছোট্ট একটা আয়না ধরার মতো ব্যাপার হয়ে ওঠে, সেখানে হাতির পুরো অবয়ব ফুটে ওঠে না।

বিরোধী দল হলো একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সত্যিকারের আয়না। এটি ক্ষমতাসীনদের ময়লামুক্ত হতে সাহায্য করে, সংসদে প্রশ্ন উত্থাপনের মাধ্যমে অথবা অনানুষ্ঠানিক অন্যান্য উপায়ে। সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধীরা জনমত গড়ে তুলতে পারে—এমন শঙ্কায় ক্ষমতাসীনেরা প্রতিটি পদক্ষেপ বুঝেশুনে দৃঢ়তার সঙ্গে ফেলে। এতে দেশের উন্নয়ন টেকসই হয়, বাংলাদেশের মতো ফাঁপা উন্নয়ন হওয়ার সুযোগ থাকে না।

২০০৮ সালের নির্বাচনে ২৩০টি, ২০১৪ সালে ২৩৪টি, ২০১৮ সালে ২৫৭টি ও ২০২৪ সালে ২২৪টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল আওয়ামী লীগ। এসব নির্বাচনে ৩০০ আসনের বাকিগুলোতেও যে সত্যিকারের বিরোধীরা আসতে পেরেছে, তা-ও বলার জো নেই। কারণ, বাকি আসনগুলো ছিল আওয়ামী লীগের দয়াদাক্ষিণ্যে ‘গৃহপালিত’ বিরোধী দল ও নিজ দলের বিরোধী প্রার্থীতে একাকার। ফলে আওয়ামী লীগ লাগামহীনভাবে উন্নয়নের নামে দু-তিন গুণ বেশি বরাদ্দে কাজ করতে পেরেছে, অর্থ আত্মসাৎ করতে পেরেছে, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাধা দেওয়ার কেউ ছিল না।

অর্থনীতি নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের তৈরি শ্বেতপত্র কমিটির প্রতিবেদনমতে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ২৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। প্রতি ডলারের দাম ১২০ টাকায় এর পরিমাণ দাঁড়ায় ২৮ লাখ কোটি টাকা, বছরে গড়ে পাচার হয়েছে ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা!

সামনের নির্বাচনে যা দরকার

চলতি বছর না হলেও ২০২৬ সালে বাংলাদেশ আরেকটি জাতীয় নির্বাচন দেখতে যাচ্ছে বলে আশা করা যায়। এখন প্রশ্ন, একটি অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচনই কি বাংলাদেশকে আগামীর পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে? অর্থনৈতিক যে ভঙ্গুরতা ও সামাজিক অব্যবস্থাপনা শিকড় গেড়েছে, তা ঠিক হয়ে যাবে? উত্তর—না। বাংলাদেশের মানুষের (দুর্বৃত্তপরায়ণ) মানসিকতার বাস্তবতায় এটা ‘সম্ভব’ নয়। কোনো দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে শাসনে বসলে বাংলাদেশ আবার পথ হারাতে পারে।

বাংলাদেশকে আগামীর টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে হলে প্রয়োজন ক্ষমতার ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা। বিদ্যমান ব্যবস্থায় ১৫১ আসন পেলে কোনো দল বা জোট বাংলাদেশে সরকার গঠন করতে পারে। আগামীর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সবচেয়ে ভালো হবে কোনো দল বা জোট ১৫১ আসনের আশপাশে পেয়ে ক্ষমতায় গেলে। তাহলে বিরোধীরা দেড় শর কাছাকাছি আসন পেয়ে সংসদের ভেতরে ও বাইরে সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখতে পারবে। বিরোধীরা জনগণের দ্বারে দ্বারে উন্নয়ন নিয়ে যাবে চতুর্দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতার আসনে যাওয়ার জন্য। অন্যদিকে ক্ষমতাসীনেরা সুশাসনের মাধ্যমে চেষ্টা করবে জনগণের মন ধরে রাখতে।

বাংলাদেশে এ মুহূর্তে রাজনীতির যে সমীকরণ দৃশ্যমান, তাতে বিএনপি একদিকে; আর অন্যদিকে জামায়াতসহ অন্য ইসলামি দলগুলোর একটি মেরুকরণের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তাদের সঙ্গে তরুণদের কোনো নতুন দলও গঠিত হয়ে সম্পৃক্ত হতে পারে বা যুগপতে থাকতে পারে। আওয়ামী লীগের আগামীর নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে এখনো কিছু বলা যাচ্ছে না। এমন অবস্থায় দেশের স্বার্থে মাঠে সক্রিয় রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধী দল হওয়ার মানসিকতা খুবই প্রয়োজন।

দেড় দশক ধরে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে সত্যিকারের বিরোধী দলের যে অনুপস্থিতি ছিল, তার পুরো দায়ভার আওয়ামী লীগের। কৌশল ও কূটকৌশল শব্দ দুটির অন্তর্নিহিত অর্থে বিস্তর তফাত রয়েছে। আওয়ামী লীগ বিশেষ করে বিএনপি-জামায়াতকে কার্যত নির্বাচন থেকে বাইরে রাখার যেসব পন্থা অবলম্বন করেছিল, তার বেশির ভাগই ছিল কূটকৌশল। যতটুকু ছাড় দেওয়া দৃশ্যমান ছিল, সেসব করা হয়েছে গলাবাজি ও নথিগত প্রদর্শনীর জন্য। আগামীর বাংলাদেশে এমন কূটকৌশলের নির্বাচন হবে না—আমরা এমনটা আশা করতে পারি। আগামীর সংসদ সত্যিকারের শক্তিশালী বিরোধী দলে ভরে উঠবে—এ কামনা করি।

  • মো. ছানাউল্লাহ প্রথম আলোর সহসম্পাদক

    ই–মেইল: sanaullah@prothomalo.com