
সদ্য সমাপ্ত চারটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচনী ফলাফল এবং দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার প্রভাব নিয়ে আলাপ-আলোচনার ঝড় বইছে দেশজুড়ে। সেই ঝড় ধূলিঝড়, ঘূর্ণিঝড় বা মৌসুমি কালবৈশাখী—বিভিন্ন রকম হতে পারে। ঝড়ের কবলে পড়ে মাথা ঠান্ডা রাখা দুরূহ। রাজনৈতিক ঝড়-ঝাপটায়ও তেমনিভাবে যৌক্তিক ও সুস্থির থাকা কষ্টকর, কিন্তু থাকতে হয় এবং থাকতে পারলে ভালো। এই চারটি মহানগরের প্রার্থী এবং নাগরিকেরা সুস্থিরতার পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন। সেখানে সুস্থিরতা, যুক্তি, আবেগ, রাগ, ক্ষোভ, অভিমান, বেদনা, ভালো লাগা, মন্দ লাগা প্রভৃতিকে মিলিয়ে-মিশিয়ে একটি ব্যালটে সিল মেরে তার একটি প্রকাশ তাঁরা ঘটিয়েছেন। গড়পড়তা ৭০-৭২ শতাংশ মানুষের মিলিত ইচ্ছা-অনিচ্ছার প্রতিফলন এই নির্বাচনী ফলাফল। এখানে প্রতিজন ব্যক্তি ভোটারের একেকটি পৃথক বিশ্লেষণ ছিল। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ের বিশ্লেষকদের বিশ্লেষণে ব্যক্তি ভোটার হারিয়ে যান, সামগ্রিকতা প্রাধান্য পায়। সামগ্রিকভাবে জাতীয় নিরিখের বিশ্লেষণে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যের কারণে বিশ্লেষণেও ভিন্ন ভিন্ন মাত্রা, বর্ণ ও ব্যাপ্তি যুক্ত হয়। ক্ষমতাসীন দলের মূল্যায়নের সঙ্গে বিরোধী দল বা জোট; নিরপেক্ষ বিশ্লেষকের সঙ্গে সরাসরি ভোটে কোনো প্রার্থীর হয়ে কাজ করা একজন সমর্থকের বিশ্লেষণ, একটি শহরের সাধারণ ভোটারের সঙ্গে আরেকটি শহরের সমপর্যায়ের ভোটার—এভাবে তারতম্য থাকবেই। তবে মোটা দাগে বলতে গেলে নিম্নে উল্লেখিত কিছু বিষয় সাধারণভাবে সবার চোখে ধরা পড়বে।
এক.
নির্বাচন ছিল শান্তিপূর্ণ। সাধারণ মানুষ নির্ভয়ে তাদের ভোটদান কর্মটি সারতে পেরেছে। এখন প্রশ্ন এ কৃতিত্ব কার? দাবিদার অনেক। সরকার দাবি করছে তারা ‘হস্তক্ষেপ’ না করায় এটি সম্ভব হয়েছে। কেউ কেউ কৃতিত্বটি ‘শক্তিশালী’ নির্বাচন কমিশনের দক্ষ ও নিরপেক্ষ ভূমিকার কথা বলছেন। এ ক্ষেত্রে আমার ব্যক্তিগত মূল্যায়নটি একটু ভিন্ন। সরকার ও নির্বাচন কমিশন অবশ্যই কৃতিত্বের দাবিদার, তবে যতটা দাবি ততটা নয়। এখানে মূল কৃতিত্ব এলাকার নাগরিক, ভোটার, প্রার্থী এবং সর্বোপরি বিগত ২০ বছরে গড়ে ওঠা নবতর নির্বাচনী ব্যবস্থা ও নির্বাচন সংস্কৃতির। সাধারণ মানুষের আন্তরিক আকুতি সুস্থ ও সুষ্ঠু রাজনীতি, দলে নতুন ব্যক্তি-নেতার সমাবেশ এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সহাবস্থান। সাধারণের এ আন্তরিক আকুতিই এই শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মূল শক্তি। স্থানীয় প্রার্থী ও প্রশাসন সাধারণের এই দৃঢ় ইচ্ছার প্রতি অসম্মান করার দুঃসাহস দেখাতে পারেনি। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে জাতীয় নেতাদের কথায় উত্তাপ-উত্তেজনা থাকলেও স্থানীয়ভাবে বিজয়ী ও বিজিতদের কোলাকুলি ও মিষ্টিমুখ করা মানুষের সেই ইচ্ছার প্রতি সম্মান দেখানোর অন্তর্গত। নির্বাচনের আগেও তাঁরা একই মঞ্চে পাশাপাশি বসেছেন, কথা বলেছেন এবং সমালোচনাও করেছেন। এসবই স্থানীয়ভাবে সুস্থ রাজনৈতিক ধারার বিকাশ ও গ্রহণযোগ্যতার নমুনা। এটিই নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ রাখার প্রধান চাবিকাঠি।
দুই.
বিগত দিনে জাতীয় রাজনৈতিক আন্দোলনের সহিংসতার উলঙ্গ প্রকাশ ওই চারটি শহরেও ছিল। এমন কী জাদুর কাঠি ছোঁয়ানো হলো যে দু-একবার বিচ্ছিন্নভাবে দুই পক্ষের প্রার্থীর পাশে সন্ত্রাসী দেখা গেলেও কোনো সন্ত্রাস হলো না! এখানেই শুভশক্তির কাছে অশুভ শক্তির পরাভব। প্রার্থীরা বুঝে গেছেন, এখানে সন্ত্রাস করে কেন্দ্র বা বুথ দখল, ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন কাজে আসবে না। ভালো, ভদ্র আচরণ, সভ্য-সংস্কৃত ব্যবহার দিয়ে মন জয় করতে হবে। প্রার্থীর নিজস্ব অবস্থা ও অবস্থান মূল্যায়ন এবং সামগ্রিক জনমনস্তত্ত্ব ছিল ‘শান্তি ও শুভ’-এর অনুকূল। দুই প্রধান দলীয় প্রার্থীরা ছিলেন জয়ের ব্যাপারে আত্মপ্রত্যয়ী। ফলে অন্য কোনো পন্থার চিন্তাকে তাঁরা স্থান দেননি।
তিন.
এই নির্বাচনের চারটি পর্যায় ছিল। তফসিল ঘোষণার পূর্বকালীন জল্পনা-কল্পনা, তফসিল ঘোষণার পর প্রার্থিতা ও বিরোধী দলের একক প্রার্থী মনোনয়ন, জাতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও ব্যক্তিত্বের প্রচারণায় ঝাঁপিয়ে পড়া এবং নির্বাচনের আগের ৪৮ ঘণ্টা এবং নির্বাচনী দিবস। স্থানীয়ভাবে দলীয় ‘ভোটব্যাংক’-এর ভোট দলের বা জোটের দিকে স্বাভাবিকভাবেই গেছে। দলবিহীন সাধারণ মানুষ কোনো সময়ই বাড়াবাড়ি, ঔদ্ধত্য, অতি-দলবাজি পছন্দ করে না। জাতীয় নেতাদের আগ্রাসী উপস্থিতি স্থানীয় ভোটারদের উদ্দীপিত-উজ্জীবিত করার চেয়ে বেশি মাত্রায় বিরক্ত করেছে। ফলে ধূমায়িত ক্ষোভ অসন্তোষ ঘৃণায় রূপ পেয়েছে। শেষের ৪৮ ঘণ্টায় মানুষ মনস্থির করেছে। এ ক্ষেত্রে দলের বাইরের ভোটাররা জাতীয় রাজনীতির বিবেচনাকে প্রধান নিয়ামক হিসেবে বিবেচনা করেছে। জাতীয় নির্বাচন কাছাকাছি হওয়ায় এবং দেশে রাজনীতির মেরুকরণ বিশেষ গতি ও মাত্রা পাওয়ায় তা আরও বেশি করে বিবেচিত হয়েছে।
চার.
এ দেশের নিকট অতীতের যেকোনো সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত স্থানীয় নির্বাচন বরাবরই স্টাবলিশমেন্ট-বিরোধী ছিল। বিএনপির আমলে অনুষ্ঠিত ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটির নির্বাচন এবং বর্তমান সরকারের আমলে চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লাসহ সাম্প্রতিক চার সিটি নির্বাচন তারই ধারাবাহিকতা। পশ্চিমা বিশ্বের ভোটাচরণ এবং আমাদের এই বিশ্বের ভোটাচরণে দৃশ্যমান কিছু পার্থক্য থাকে। ব্রিটেনে দেখা গেছে, স্থানীয় কাউন্সিল ও জাতীয় সরকার গঠন—এই দুই নির্বাচনে নাগরিক অগ্রাধিকার অনেক সময় পৃথক থাকে। স্থানীয় কাউন্সিল নির্বাচনে যে ভোটার লিবারেলকে ভোট দেয়, জাতীয় নির্বাচনে তারা রক্ষণশীলকে ভোট দিচ্ছে। আমাদের দেশের বিগত ২০ বছর বিশেষত ১৯৯১ সালের পর থেকে নির্বাচনী ব্যবস্থা এবং ভোটার মনস্তত্ত্বে গুণগত পরিবর্তন হয়েছে। এখন মানুষ ভোটের ফলাফলে আস্থাভাজন হতে পারছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় রাজনীতি সহজ-সরল সুষ্ঠু ও সুস্থ না হওয়ায় মানুষের সেই আস্থা সুদৃঢ় হচ্ছে না। তাই যৌক্তিকতার ওপরে মাঝেমধ্যে রাগ, ক্ষোভ এবং আবেগের মতো কিছু ‘নেগেটিভ’ উপাদান ফলাফলে সব সময় প্রতিবাদের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে উঠে আসছে।
পাঁচ.
রাজনীতি এবং নির্বাচন যদি নীতি-আদর্শের, উন্নয়নের, নেতা-নেত্রীর চারিত্রিক সদ্গুণ ইত্যাদি বাছাইয়ের প্রতিযোগিতা, তাহলে সমাজের অভ্যন্তরে ঘটে যাওয়া গুণগত পরিবর্তনগুলো সঠিকভাবে বিকশিত হয়ে রাজনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলত। কিন্তু রাজনীতিতে একদেশদর্শিতা, একগুঁয়েমি, ক্ষমতান্ধতা, দলান্ধতায় মানুষ হতাশ ও বিক্ষুব্ধ। তাই সুযোগ পেলেই ভোট ক্ষোভ প্রকাশের বাহন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। রাজনীতির নেতিবাচকতার কারণেই ভোটাচরণে নেতিবাচকতা প্রধান নিয়ামক হয়ে উঠেছে।
কৌশল রাজনীতির অপরিহার্য অনুষঙ্গ। কিন্তু সুষ্ঠু রাজনীতির চর্চা শিকেয় তুলে শুধুই কৌশল রাজনীতি নয়। তারপর কৌশলগুলো যদি হয়ে যায় কূটকৌশল, তাহলে তারও ভয়াবহ। কূটকৌশলের ধারাবাহিকতা অপরাজনীতির প্রসার। এই চার সিটির মেয়াদোত্তীর্ণের বেশ আগে নির্বাচন করাটা একটা রাজনৈতিক কৌশল ছিল। একইভাবে ঢাকা, গাজীপুর, রংপুরের নির্বাচনে বিলম্বও অন্য ধরনের কৌশল। নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ রাখাও ভিন্ন কৌশলের অন্তর্ভুক্ত। বিরোধী দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দিয়ে নির্বাচনমুখী করাটাও একটা কৌশল। বিরোধী দল আবার স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণকে তাদের মূল আন্দোলন, যা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে করছে, তার অংশ হিসেবে নিতে পারে পাল্টা কৌশল হিসেবে। এখন এই মুহূর্তে নির্বাচনের ফলাফল ৪-০ হওয়ায় উভয়ের কৌশলে নতুন মাত্রা যুক্ত হবে নিঃসন্দেহে।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন এখনো বহুদূর! আগামী চার-পাঁচ মাসের রাজনীতির গতি-প্রকৃতি নির্ধারণে এ নির্বাচনের ফলাফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করবে। তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়বে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন এবং ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হবে কি না, তার ওপর। তা ছাড়া ১৮-দলীয় জোটের নতুনভাবে আন্দোলনে নামার সম্ভাবনা উজ্জ্বল এবং সরকারি দল এই ফলাফলের কারণে সামগ্রিক রাজনীতিকে নিশ্চয়ই সিরিয়াসলি মূল্যায়ন করবে। এ মূল্যায়ন (গাজীপুরসহ) তাদের বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতার সফট লাইনেও নিতে পারে, আবার আরও কঠোর অবস্থান গ্রহণেও প্রলুব্ধ করতে পারে। সব মিলিয়ে আগামী চার-পাঁচ মাস আমাদের রাজনীতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। কিন্তু এ সময়টায় কৌশল ও পাল্টা কৌশলে কালক্ষেপণ এবং উত্তেজনা বৃদ্ধি জাতির জন্য সামগ্রিকভাবে কল্যাণবহ হবে না, তাই সব পক্ষে কৌশল, কূটকৌশলের বদলে সমস্যা সমাধানের সদিচ্ছা জাতি অনেক বেশি আশা করে।
ড. তোফায়েল আহমেদ: স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সদস্য, স্থানীয় সরকার কমিশন।