ফিরে দেখা ২০২৪
কেন রাজনৈতিক বইয়ের বিক্রি বাড়ল এ বছর
এ বছর দুনিয়াজুড়েই রাজনৈতিক বইয়ের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। বাংলাদেশেও এর অন্যথা ঘটেনি। বিভিন্ন সূত্র ঘেঁটে সারা বিশ্বে রাজনৈতিক বইয়ের প্রতি পাঠকের আগ্রহের কারণ সন্ধান করেছেন মারুফ ইসলাম
আন্দোলন, বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক পটপরির্তনের সঙ্গে কি বইয়ের কোনো সম্পর্ক আছে? এ প্রশ্নে দুনিয়াজুড়েই গবেষকদের উত্তর হলো, হ্যাঁ। বিশেষত ২০২৪ সালের দিকে তাকালে দেখা যাবে, এ বছর রাজনৈতিক বইয়ের বিকিনিনি ক্রমাগতই বেড়েছে। কিন্তু কেন এ ধারার বইপত্রে পাঠকের এত আগ্রহ?
২০২৪ সাল এক উথাল-পাতাল বছর। বিশ্বের অনেক দেশে রাজনৈতিক পালাবদল ঘটে গেছে এই ১২ মাসের মধ্যে। দেশে দেশে হয়েছে বিক্ষোভ, আন্দোলন। পাশের দেশ ভারত বছরজুড়ে উত্তাল ছিল কৃষকদের দিল্লি চল আন্দোলন, মণিপুরে জাতিগত সংঘাত ও কলকাতায় আর জি কর কাণ্ডে। পাকিস্তানে বন্দী নেতা ইমরান খানকে মুক্ত করতে প্রায়ই সহিংস বিক্ষোভ হয়েছে। এ বছরের শেষের দিকে মিয়ানমারে জান্তাবিরোধী বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো বেশির ভাগ এলাকা দখল করে ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইসরায়েলবিরোধী ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। যুক্তরাজ্যে তিন শিশু হত্যাকে কেন্দ্র করে হয়েছে দাঙ্গা। এ ছাড়া স্পেন, পোল্যান্ড, জার্মানি ও গ্রিসে হয়েছে কৃষক বিদ্রোহ। ইরানকে বহু বছর পর নাড়িয়ে দিয়েছে হিজাববিরোধী আন্দোলন। সিরিয়ায় বিদ্রোহের মুখে পালিয়ে গেছেন ২৪ বছরের স্বৈরশাসক বাশার আল–আসাদ।
এ ছাড়া বিশ্বের অন্তত ১৬০টি দেশে সরকারবিরোধী আন্দোলন হয়েছে বলে জানিয়েছে কার্নেগি এনডাউমেন্টের গ্লোবাল প্রোটেস্ট ট্র্যাকার। এর মধ্যে বাংলাদেশেরও নাম আছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, গত জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশজুড়ে যে গণ–আন্দোলন হয়েছে এবং যার জেরে দীর্ঘ ১৫ বছরের স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন, ছাত্র–জনতার সেই অভ্যুত্থান সারা বিশ্বকেই নাড়িয়ে দিয়েছে।
তো এসব বাস্তবতা হেতু গবেষকদের মত হলো, রাজনৈতিক ঘটনাবলি একজন লেখককে যেমন পুস্তক রচনায় উৎসাহিত করে এবং পাঠককে সেসব পুস্তকের চৌহদ্দিতে নিয়ে আসে, তেমনি এই বইপুস্তক পড়ে পাঠক আবার রাজনীতিতে উৎসাহী হয়ে ওঠেন।
আসলে তিন-চার বছর ধরেই সারা বিশ্বে রাজনৈতিক ঘরানার বই বেশি জনপ্রিয় হয়েছে এবং বিক্রিও হয়েছে বেশি, অন্তত পরিসংখ্যান তা–ই বলে।
ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এক্সপ্লোডিং টপিকস বলেছে, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার বই আ প্রমিজ ল্যান্ড প্রকাশিত হওয়ার প্রথম মাসেই বিক্রি হয়েছে ৩৩ লাখ কপি। রাজনীতিনির্ভর আত্মজীবনীমূলক এ বই প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২০ সালের ১৭ নভেম্বর।
মুদ্রণ ব্যবসায়ীরা বলছেন, রাজনৈতিক বইয়ের বিক্রি যেভাবে হু হু করে বাড়ছে, তাতে অচিরেই বিল ক্লিনটনের মাই লাইফ ও জর্জ ডব্লিউ বুশের ডিসিশন পয়েন্টস-এর মতো রাজনৈতিক স্মৃতিকথামূলক বইগুলোর বিক্রি রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। বই দুটির প্রতিটির বিক্রি এরই মধ্যে ৪০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁকে নিয়ে লেখা বইগুলোর বিক্রিও বেড়ে গেছে। উদাহরণ হিসেবে ফায়ার অ্যান্ড ফিউরি: ইনসাইড দ্য ট্রাম্প হোয়াইট হাউস বইটির কথা বলা যায়। এই বই প্রকাশিত হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে ১৭ লাখ কপি বিক্রি হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে নিয়ে গত তিন বছরে অনেকগুলো বই বের হয়েছে। বাইডেনের নিজের লেখা বইয়ের পাঠকও বেড়েছে। যেমন বাইডেনের লেখা প্রমিজ মি, ড্যাড বেস্ট সেলার তালিকায় উঠেছে নিউইয়র্ক টাইমস-এর; এবং বইটি ৩ লাখ কপি বিক্রি হয়েছে।
বই বিক্রির তদারকি প্রতিষ্ঠান এনপিডি বুকস্ক্যানের বরাত দিয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ছাপা ও ই-বুক মিলিয়ে দেড় কোটি রাজনৈতিক বই বিক্রি হয়েছে। এর আগের বছর ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক বই বিক্রি হয়েছিল ৬১ লাখ। অর্থাৎ রাজনৈতিক বই বিক্রির প্রবণতা ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী। ২০২৪ সালে এসে তা আরও বেড়েছে, তা হলফ করে বলাই যায়।
রাজনৈতিক বইয়ের জনপ্রিয়তা বেড়েছে ভারতেও। চলতি বছরে ভারতে আলোচিত বইগুলোর মধ্যে অন্তত পাঁচটি বই ছিল রাজনৈতিক। যেমন ক্রিস্টোফ জাফরেলের গুজরাট আনডার মোদি, আলপা শাহের দ্য ইনকার্সারেশনস, বাশারাত পিরের কারফিউড নাইট, কে এস কোমেরেদ্দির মালেভোলেন্ট রিপাবলিক এবং আমান শেঠির আ ফ্রি ম্যান।
ইউরোপের দিকে তাকালেও দেখা যাবে, সেখানেও রাজনৈতিক বইয়ের বিক্রি বেড়েছে। দ্য গার্ডিয়ান বলছে, ২০১৮ সাল থেকেই ইউরোপের দেশগুলোতে রাজনৈতিক বইয়ের বিক্রি ঊর্ধ্বমুখী। যুক্তরাজ্যে ২০১৫-১৬ সালের চেয়ে ২০১৮ সালে রাজনৈতিক বই বিক্রি বেড়েছে ৫০ শতাংশের বেশি। এর পর থেকে প্রতিবছরই রাজনৈতিক বইয়ের বিক্রি বেড়েছে।
বাংলাদেশে বেড়েছে রাজনৈতিক বইয়ের বিকিকিনি
বাংলাদেশে রাজনৈতিক বইয়ের বিক্রির হার কেমন? এ প্রশ্ন এলে বলতে হবে, আমাদের এখানেও কয়েক বছর ধরে রাজনীতিবিষয়ক নন-ফিকশন বইয়ের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। দেশে বই বেচাকেনার অনলাইন সাইটগুলো বইমেলার আগে–পরে যেসব বই বেশি বিক্রি হয়, তার তালিকা প্রকাশ করে। সতর্কভাবে এসব তালিকা আমলে নিলে রাজনৈতিক ও ইতিহাসনির্ভর বইয়ের প্রতি পাঠকদের যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে, তা বোঝা যায়। এ ক্ষেত্রে মহিউদ্দিন আহমদ একটি ভালো দৃষ্টান্ত হতে পারেন। তিনি শুধু বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসমূলক বই লিখেই লেখক হিসেবে পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। তাঁর লেখা জাসদের উত্থান-পতন: অস্থির সময়ের রাজনীতি, লাল সন্ত্রাস, প্রতিনায়ক: সিরাজুল আলম খান, বেলা-অবেলা: বাংলাদেশ ১৯৭২–১৯৭৫, বিএনপি: সময় অসময় ইত্যাদি বই সারা বছরই বিক্রির শীর্ষ তালিকায় থাকে। এ ছাড়া আলতাফ পারভেজের জুলফিকার আলী ভুট্টো, যোগেন মণ্ডলের বহুজনবাদ ও দেশভাগ, মুজিব বাহিনী থেকে গণবাহিনী: ইতিহাসের পুনর্পাঠ—এ বইগুলোর প্রতিও মানুষের আগ্রহ আছে। এর বাইরে আবুল মনসুর আহমদ, বদরুদ্দীন উমর, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, যতীন সরকার, আলী রীয়াজ, জিয়া হাসান, ফাহাম আব্দুস সালাম, ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব, পারভেজ আলম প্রমুখের রাজনৈতিক এবং ইতিহাসবিষয়ক বইও জনপ্রিয়। তবে শুধু নন–ফিকশন নয়, এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত আসিফ নজরুলের রাজনৈতিক উপন্যাস আমি আবু বকর বিক্রিবাট্টায় অন্য অনেক উপন্যাসকে ছাড়িয়ে গেছে। ফলে বিশ্বের অন্য দেশের পাঠকের মতো বাংলাদেশের পাঠকেরাও যে আগের তুলনায় অনেক বেশি রাজনৈতিক বইপত্রের দিকে ঝুঁকছেন, তা স্পষ্ট।
প্রশ্ন উঠতে পারে, দুনিয়াজুড়ে হঠাৎ কেন রাজনৈতিক বইয়ের প্রতি ঝুঁকে পড়লেন পাঠক? এর উত্তর সম্ভবত বহু আগে মহামতি অ্যারিস্টটল দিয়ে গেছেন, ‘মানুষ মূলত রাজনৈতিক প্রাণী।’ রাজনীতির প্রতি মানুষের কৌতূহল প্রকৃতিগত। সে সব সময় রাজনীতির গলিঘুপচির অপার রহস্য উদ্ঘাটন করতে চায়। আর এই সময়ে সারা বিশ্বই যেহেতু রাজনৈতিভাবে উত্তাল, তাই এই রাজনীতির গতিপথ বুঝতে মানুষ ঝুঁকে পড়েছে রাজনৈতিক বইয়ের দিকে।
সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস,দ্য হিন্দু, কার্নেগি এনডাউমেন্ট, এক্সপ্লোডিং টপিকস ও দ্য গার্ডিয়ান