সন্দ্বীপে যেকোনো জিনিসের দাম কেন আকাশছোঁয়া

মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এক উপজেলা সন্দ্বীপ। যেতে হয় উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে। সন্দ্বীপ চ্যানেলে জোয়ার-ভাটার হিসাব কষে জাহাজ, ট্রলার বা স্পিডবোটে যাতায়াত করে সেখানকার মানুষ। সেই পথেই ২৪ মার্চ সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া ফেরিঘাট থেকে সন্দ্বীপের গুপ্তছড়া ফেরিঘাট পর্যন্ত চালু হলো ফেরি। উদ্বোধনী ফেরিতে ছিলেন কৃষ্ণ চন্দ্র দাস

ফেরিঘাটছবি: প্রথম আলো

সন্দ্বীপ থেকে সীতাকুণ্ডে থিতু হয়েছি প্রায় দুই যুগ। তা হলে কী হবে, আত্মীয়-পাড়াপ্রতিবেশী সবাই তো গ্রামেই আছেন। তাই মাসে কয়েকবার নানা কারণে সন্দ্বীপে যেতে হয়। কিছুদিন আগেও জোয়ার-ভাটার হিসাব কষে স্পিডবোটে উঠতে গিয়েও কাদা মাড়ানোর কষ্ট থেকে নিস্তার পাইনি। আসলে এটাই এই দ্বীপবাসীর নিয়তি। এই নৌপথে কত মৃত্যুর ঘটনাই না ঘটেছে। ২০১৭ সালের সন্দ্বীপ ট্র্যাজেডির কথা আজও ভুলিনি। তখন সি-ট্রাক চলত। এই জলযান পাড়ে ভিড়তে পারত না। সীতাকুণ্ড থেকে যাত্রী নিয়ে সন্দ্বীপ উপকূলে পৌঁছানোর পর যাত্রীদের পাড়ে যেতে হতো লাল বোটে (উপকূলে যাত্রী নামানোর ছোট নৌকা) করে। সেবার এই বোটে উঠে যাওয়ার সময়ই ডুবে মারা যান ১৮ জন। এরপর সি-ট্রাকের পরিবর্তে যাত্রীবাহী জাহাজ দিলেও এখনো উপকূলে যাত্রী ওঠানামা লাল বোটেই হচ্ছে। বন্ধ হয়নি অনিরাপদ স্পিডবোট ও কাঠের ট্রলারে যাত্রী পারাপার। এতে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা।

এই পটভূমিকায় ২৪ মার্চ ফেরি সার্ভিস শুরু হচ্ছে, জানার পর সন্দ্বীপের মানুষ হিসেবে অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় ছিলাম।

উদ্বোধনী ফেরিতে লেখক

সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া ফেরিঘাটের কাছেই আমার বাসা। সেদিন সংবাদ সংগ্রহের জন্য সকাল সকাল ঘাটে হাজির হই। আজ আর কাদা মাড়ানোর ভয় নেই। অন্যদের মতো আমিও কাঁধে ব্যাগ আর প্রথমবারের মতো পায়ে জুতা-মোজা পরে ফেরিতে চেপে বসলাম। ফেরিতে উঠে মনে ছেলেমানুষি ভর করল। ফেরির ভেতরে বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে দেখলাম। মানুষের অনুভূতি জানতে চাইলাম। তাঁদেরই একজন জোছনা বেগম। ষাটোর্ধ্ব এই নারী ঢাকায় মেয়ের বাসা থেকে বাড়িতে ফিরছিলেন। ভোরে গাড়ি তাঁকে কুমিরা ঘাটে নামিয়ে দিয়েছে। এরপর ঘাটে গিয়ে শুনতে পান বাঁশবাড়িয়া ঘাটে ফেরি উদ্বোধন করা হবে। বিনা খরচে যাওয়া যাবে। সে জন্য তিনি কুমিরা থেকে আবার বাঁশবাড়িয়া ঘাটে এসে ফেরিতে উঠেছেন। আবেগপ্রবণ হয়ে বললেন, ‘আগে হরে-লোদে ডুবিচুবি সন্দ্বীপ যাইতাম। একবার তো নৌকাতুন জাজে উডনের সময় হানিত হরি গেছিলাম। মরি যাইতাম গই, মাইনষে টানি তুলছিল। অন জোতা হাদ দি যাইতাম হারির (আগে কাদাপানি মাড়িয়ে সন্দ্বীপ যেতাম। একবার নৌকা থেকে জাহাজে ওঠার সময় পানিতে পড়ে গিয়েছিলাম। মারা যেতাম, মানুষ টেনে তুলেছিল। এখন জুতা পায়ে দিয়ে যেতে পারছি)।’

অন্য যাত্রীদের অনুভূতিও জোছনা বেগমের মতোই। কেউ কেউ বললেন, এই ফেরি পাওয়ায় ঈদের আগেই তাঁদের ঈদের আনন্দ হচ্ছে। উপকূলবাসীর যেন খুশির সীমা নেই।

ফেরি ছুটছে সন্দ্বীপের উদ্দেশ্যে
ছবি: প্রথম আলো

এ তো গেল মানুষের যাতায়াতের কষ্টের কথা। পণ্য পরিবহনেও কি কম ঝক্কি? চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ, চাক্তাই কিংবা অন্যান্য স্থান থেকে ব্যবসায়ীরা মালামাল কিনে ট্রাকে করে প্রথমে ঘাটে আনেন। এরপর ট্রাক থেকে নামিয়ে শ্রমিকেরা আবার মালবাহী ট্রলারে তোলেন। সীতাকুণ্ড উপকূল থেকে মালামাল নিয়ে সন্দ্বীপ উপকূলে আসার পর আবারও শ্রমিক দিয়ে সেটি ট্রলার থেকে আনলোড করা হয়। তারপর ছোট ছোট যানবাহনে করে ব্যবসায়ীরা মালামাল তাঁদের গন্তব্যে নেন। কয়েকবার মালামাল ওঠানামা করার কারণে পণ্যের পরিবহন খরচ বেড়ে যায়। ফলে সন্দ্বীপের যেকোনো জিনিসের দাম আকাশছোঁয়া।

এই তো গত শীতে সন্দ্বীপের শিবেরহাট থেকে দেড় বছরের শিশুর জন্য একটি সোয়েটার কিনেছিলাম। যে সোয়েটার সীতাকুণ্ডের কুমিরা বাজারে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা, শিবেরহাটে সেটি ১ হাজার ২০০ টাকা চেয়েছিলেন দোকানি। অনেক দর-কষাকষি করে ৯০০ টাকায় কিনেছিলাম। তখন দোকানি বলেছিলেন, ‘কেরিং (মালামাল পরিবহন) খরচ বেশি পড়ায় দাম একটু বেশি।’

এখন ফেরি সার্ভিস চালু হওয়ায় পণ্যের দাম চট্টগ্রাম কিংবা সীতাকুণ্ডের সঙ্গে অনেকটা সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে যাবে বলে বিশ্বাস করেন আবদুল হালিম। এখন সরাসরি পণ্যবাহী গাড়ি সন্দ্বীপে যাতায়াত করতে পারবে। ফলে সবকিছুর দাম কমে যাবে। ফেরিতে যেতে যেতে এই ব্যবসায়ী বললেন, তিনি খাতুনগঞ্জ থেকে সরাসরি ট্রাকে মালামাল তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে নিয়ে এলে আগের চেয়ে অন্তত দশ হাজার টাকা খরচ কমে যাবে। ফলে তিনি কম দামে পণ্য বিক্রি করতে পারবেন।

ঘণ্টাখানেক কীভাবে কেটে গেল বুঝতেই পারলাম না। সন্দ্বীপের গুপ্তছড়া ঘাটের কাছে ফেরি আসতে দেখে আনন্দে চিৎকার করে উঠল অপেক্ষমাণ মানুষ। তাঁদের চোখে-মুখে আনন্দ ও বিস্ময়। দিনটি যেন তাঁদের কাছে আসছে ঈদের আগেই ঈদ।

সন্দ্বীপ ৭৫০ বর্গকিলোমিটারের এক টুকরা ভূখণ্ড

সন্দ্বীপ চ্যানেলে জোয়ার-ভাটা

সন্দ্বীপ ৭৫০ বর্গকিলোমিটারের এক টুকরা ভূখণ্ড। প্রবাসী-অধ্যুষিত এ অঞ্চলের প্রায় চার লাখ বাসিন্দা কুমিরা-গুপ্তছড়াসহ ছয়টি নৌপথে মূল ভূখণ্ডে যাতায়াত করে। এবার চালু হলো বাঁশবাড়িয়া-গুপ্তছড়া ফেরি। এই পথে ফেরি চলাচলে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। মার্চের পর থেকেই ধীরে ধীরে অশান্ত হয়ে ওঠে সন্দ্বীপ চ্যানেল। জোয়ার-ভাটায় পানির স্তরের হ্রাস-বৃদ্ধির পার্থক্যও এখানে অত্যধিক। বিআইডব্লিউটিএর উপপরিচালক মো. কামরুজ্জামান বলেন, জোয়ার-ভাটায় বিশাল তারতম্যের কারণে এ চ্যানেলে ফেরি চালানো অনেক কঠিন হবে। বর্তমান ফেরিটি এ পথে চলাচলের উপযোগী নয়, তাই এপ্রিল মাস থেকে ফেরি চলাচল হয়তো বন্ধ রাখতে হবে। কিন্তু বিআইডব্লিউটিসি কর্তৃপক্ষ উপকূলীয় এলাকায় চলাচল উপযোগী ফেরি নির্মাণ করছে। আগামী বছর থেকে এই সমস্যা আর থাকবে না বলে আশা করা যায়।

আপাতত ৩১ মার্চ পর্যন্ত ফেরির সময়সূচি দেওয়া হয়েছে। সময়সূচি অনুযায়ী, উদ্বোধনের প্রথম তিন দিন উভয় দিকে দুবার করে ফেরি চলাচল করবে। এর পর থেকে দিনে একবার করে ফেরি চলাচল করবে। জোয়ার-ভাটার সময় অনুযায়ী ফেরি ছাড়ার সময়ও পরিবর্তিত হবে।