‘অবশেষে সফল হলো আমার ৮১তম চেষ্টা’
২৫ ফেব্রুয়ারি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে অতিথি হয়ে এসেছিলেন শারমিন ওবায়েদ–চিনয়। জন্ম পাকিস্তানে, তবে থিতু হয়েছেন কানাডায়। তিনি একজন অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সাংবাদিক। পড়ুন তাঁর লিখিত বক্তব্যের নির্বাচিত অংশ।
অভিনন্দন, আজ শুধু তোমাদের শিক্ষাজীবনের বিশেষ দিনটিরই উদ্যাপন হচ্ছে না, আজ শুরু হতে যাচ্ছে তোমাদের জীবনের নতুন এক অধ্যায়। চেনা এই প্রাঙ্গণ থেকে বেরিয়ে যে অপার সম্ভাবনার জগতে তুমি পা রাখতে যাচ্ছ, মনে রেখো এটাই হবে তোমার জীবনের সব অধ্যায়ের মধ্য থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এই সফরের শক্তি হবে তোমার বলিষ্ঠ কণ্ঠ। যখন আওয়াজ তুলবে, সেটা যেন এমন এক ভবিষ্যৎ তৈরির জন্য হয়, যেখান সত্য ও সততা তোমাকে পথ দেখাবে। ভয়কে কখনো কণ্ঠরোধের সুযোগ দেবে না। সামনের পথ যত কঠিন আর অনিশ্চিতই হোক না কেন, নিজের প্রত্যয়কে দৃঢ় রেখো। তোমার কণ্ঠই তোমাকে ও অন্যদের অন্ধকার পেরিয়ে আলোর পথ দেখাবে।
একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে আমি সব সময় গল্প বলতে চেয়েছি। প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে নারী, পুরুষ, শিশুর গল্প তুলে এনেছি। এই গল্পগুলো তুলে আনতে গিয়ে আমি তাদের জীবনকে কাছ থেকে দেখেছি। পেয়েছি কিছু সহজ-সরল শিক্ষা, আজ সেগুলোই তোমাদের বলব।
নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকো
মাত্র ১৪ বছর বয়সে পত্রিকায় লেখালেখি শুরু করি। ১৭ বছর বয়সে একটি সাহসী সিদ্ধান্ত নিই। ঠিক করি এমন এক বিষয় নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করব, যে বিষয়টা কেউ ঘাঁটতে চায় না। স্পষ্ট মনে আছে, এক ঈদের দিনে আবিষ্কার করলাম বাড়ির আশপাশে স্প্রে পেইন্ট দিয়ে কেউ আমার বিরুদ্ধে গ্রাফিতি এঁকেছে। আমাকে সামাজিকভাবে হেয় করা, আমাকে চুপ করানো আর ভয় দেখানোই ছিল এই গ্রাফিতির উদ্দেশ্য। কারণ, আমি শহরের কিছু প্রভাবশালীর বিপক্ষে আওয়াজ তুলেছিলাম। আমার অনুসন্ধান তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়েছিল। আমার বাবা, যাঁর প্রভাব আমার জীবনে অসামান্য, আমাকে সেদিন একটি কথাই শুধু বলেছিলেন, ‘তোমার কথাগুলো যদি সত্য হয়, আমি তোমার সঙ্গে আছি।’ এরপর নিজ হাতে সেদিন প্রতিটা দেয়াল পরিষ্কার করেছিলেন। সেদিন সেই মুহূর্তে শিখেছিলাম, পৃথিবী যতই তোমাকে ভয় দেখাক, ন্যায়ের জন্য সাহস করে দাঁড়িয়ে গেলে সেটাই হবে সবচেয়ে শক্ত হাতিয়ার। আজ যখন তুমি ভবিষ্যতের দোরগোড়ায়, মনে রেখো তোমার একেকটা সিদ্ধান্ত, একেকটা সৎ ও সাহসী পদক্ষেপ তোমাকে ভবিষ্যতের জন্য গড়ে তুলবে। এবার তুমি তোমার স্বপ্নকে অনুসরণ করো, অথবা গতানুগতিক ধারাকে প্রশ্নবিদ্ধ করো। যে পথই বেছে নাও না কেন, মাথায় রেখো—তোমার সিদ্ধান্ত শুধু তোমার একার নয়, পুরো বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকেও বদলে দিতে পারে।
অদম্য আর জেদি স্বপ্নগুলো আগলে রাখো
‘প্যাশন’ হলো সেই চালিকা শক্তি, যা তোমাকে জীবনের চড়াই–উতরাইগুলো পার হতে সাহায্য করবে। আমার জীবনে বরাবরই গল্প বলা আর সত্যকে তুলে ধরার অদম্য আকাঙ্ক্ষা ছিল। অনেক প্রত্যাখ্যানের পরও আমি সম্ভবের সীমানা পেরিয়ে অসম্ভবকে অর্জনের স্বপ্ন দেখতাম।
অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেও ২০০২ সালে সিদ্ধান্ত নিই—তথ্যচিত্র নির্মাতা হব। প্রথম চলচ্চিত্র বানানোর জন্য প্রস্তাবপত্র লিখে বিশ্বের নানা দেশের ৮০টি টেলিভিশন চ্যানেল ও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানকে পাঠাই। এরপর তাদের জবাবের অপেক্ষা করতে থাকি। আসতে থাকে একের পর এক প্রত্যাখ্যান। আমি লড়তে থাকি নিজের সঙ্গে। নিজের অশ্রু, আক্ষেপ আর মানসিক যন্ত্রণার সঙ্গে।
বুঝতে পারছিলাম না, কেন কেউ ২১ বছর বয়সী একজন নবীন নারী নির্মাতা, যে ঠিকমতো ক্যামেরা ধরতে পারে না, যার সিনেমা নিয়ে পড়াশোনা নেই, ডিগ্রি নেই, তাকে কাজ দিতে চাইছে না! স্পষ্টত, মানুষ আমার ধারণার চেয়েও বেশি বাস্তববাদী ছিল তখন, যার জন্য এত এত প্রত্যাখ্যান! কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। লেগেই থাকলাম। এরপর একদিন কোনো কারণ ছাড়াই নিউইয়র্ক টাইমস টেলিভিশনের প্রেসিডেন্ট বরাবর একটা অযাচিত ই–মেইল লিখে বসলাম। সঙ্গে দিলাম আমার প্রস্তাবপত্রটিও। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এল ফিরতি ই–মেইল। তাতে লেখা ছিল, আমার তথ্যচিত্রের প্রস্তাব সশরীর শোনানোর জন্য আমাকে নিউইয়র্কে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
নিউইয়র্কের ট্রেন ধরলাম, আর একদল অভিজ্ঞ সাংবাদিকের সামনে নিজেকে আবিষ্কার করলাম। খুব জলদিই আমার তথ্যচিত্রের প্রস্তাব পাস হয়ে গেল। আমাকে চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রশিক্ষণও দেওয়া হলো। অবশেষে সফল হলো আমার ৮১তম চেষ্টা। সামনে খুব সহজ দুটি পথ ছিল—হাল ছেড়ে দাও, অথবা নিজের স্বপ্নের পেছনে লেগে থাকো। জীবনে এমন মুহূর্ত অনেক আসবে, যেখানে হতাশ হয়ে মনে হবে হাল ছেড়ে দিই। আমি অনুরোধ করব, তোমরা বড় স্বপ্ন দেখো। প্রতিদিন যেন ঘুম ভেঙে সেই স্বপ্নের পেছনে ছোটার তাড়না তোমাদের সাফল্যের দিকে নিয়ে যায়।
সাহসীদের জীবন দেখে শেখো
নানা জায়গা ভ্রমণ ও নানা ধরনের মানুষের সঙ্গে মেশার কারণে আমি দারুণ সব অনুপ্রেরণা ও দৃঢ়তার গল্পের সাক্ষী হয়েছি। বাংলাদেশের নারী পুলিশদের নিয়ে আ জার্নি অব আ থাউজেন্ড মাইলস নামের একটি চলচ্চিত্রের কাজ করতে ২০১৪ সালে আমি এ দেশে এসেছিলাম। শান্তি মিশনে যোগ দেওয়া প্রথম মুসলিম নারী ইউনিট, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কঠোর প্রশিক্ষণের ধাপ পেরিয়ে যাঁরা এসেছিলেন, তাঁদের অসম্ভব সব অনুপ্রেরণার গল্প নিয়ে ছবি। আমি তাঁদের আত্মত্যাগের সাক্ষী হয়েছিলাম। আমি দেখেছি নিজ হাতে গড়া সংসার, আরামের নিশ্চিন্ত জীবন ছেড়ে কীভাবে ভিনদেশে গিয়ে অস্থিতিশীল একটা ভূখণ্ডে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করছে তারা। হাইতির মতো দেশে মোতায়েনের পর থেকে তাদের সামনে প্রতিকূলতার কোনো অভাব ছিল না। দারিদ্র্য, অস্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে মোকাবিলা করে তাঁরা হাইতির নারীদের নিরাপত্তা দিতে সচেষ্ট ছিলেন। আমাদের সমাজে নারীদের নিয়ে যে গৎবাঁধা ধারণা চালু আছে, তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে নিজেদের এক উচ্চ মর্যাদায় তুলে ধরেছে বাংলাদেশের নারী পুলিশ। তাঁদের দৃষ্টান্তের মধ্য দিয়ে এটা প্রমাণিত হয় যে একেকজনের চেষ্টার মধ্য দিয়েই শুরু হয় পরিবর্তন। আমাদের সম্মিলিত চেষ্টা বদলে দিতে পারে অনেকের জীবন।
বাস্তবতা থেকে শেখো, ব্যর্থতা মেনে নাও
ব্যর্থতাকে গ্রহণ করার মধ্যে কোনো পরাজয় নেই, বরং সাফল্যের পথে আরও একটি চেষ্টা হিসেবে একে মেনে নাও। মনে আছে, আমি একটা অ্যানিমেশন প্রতিষ্ঠান করেছিলাম। আমার দেশে সেটা ছিল কোনো নারী উদ্যোক্তার করা প্রথম অ্যানিমেশন প্রতিষ্ঠান। নেটফ্লিক্সের জন্য সিতারা নামে একটি সিনেমাও বানিয়েছিলাম আমরা। ৮০ জন মেধাবী অ্যানিমেটর সেখানে কাজ করত। কিন্তু আমাদের কাজে বাঁধ সাধল কোভিড। ওই সময় কাজ আসা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, কাউকে বেতন দিতে পারছিলাম না। দায়গুলো কী করে মেটাব—এই চিন্তায় রাতের পর রাত ঘুমাতে পারতাম না। কিন্তু এক রাতে ঠিক করলাম সাহস করে সবার সঙ্গে কথা বলব। টিমকে ফোন কল করলাম। বুকে পাথর চাপা দিয়ে বলে ফেললাম স্টুডিও বন্ধ করে দেওয়ার কথা। জীবনের সেই কঠিনতম সিদ্ধান্ত থেকে শিখেছিলাম, মাঝেমধ্যে ব্যর্থতা স্বীকার করার প্রয়োজন আছে। কারণ এর পরপরই মার্ভেল স্টুডিওজের মিজ মার্ভেল-এ কাজ করার সুযোগ হয়। সেখানে আমার অ্যানিমেশন টিমের কয়েকজন মেধাবী কর্মীকেও যুক্ত করি।
মনে রেখো একটা দরজা বন্ধ হলে আরেকটা খুলবেই। তাই ব্যর্থতাকে তোমার বেড়ে ওঠার অনুঘটক হিসেবে ধরে নাও। দেখো, এটাই তোমাকে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাবে। ভুল করতে ভয় পেয়ো না। জীবনে হাজারবার হোঁচট খেয়েছি। সাফল্যের চেয়ে এই হোঁচট থেকেই বেশি শিখেছি।
নিজের অবস্থান নিজেই তৈরি করো
জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আছে, যেখানে চারপাশে চোখ বুলিয়ে হয়তো নিজেকে তোমার বহিরাগত মনে হবে। দ্বিধায় পড়ে যাবে, নিজেকে প্রশ্ন করবে—আমি কি এখানে মানানসই? বহিরাগত হওয়ার অনুভূতিটা আমি জানি। ২০১২ সালে যখন অস্কার জিতলাম, অনেকেই আমার অর্জন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। সেই দ্বিধা, সংশয় আর বেমানান হয়ে পড়ার ভয়ের সঙ্গে আমাকে লড়াই করতে হয়েছে অনেক লম্বা সময়। এরপর ২০১৬ সালে যখন আবারও অস্কার জিতি, খুব অপরিহার্য একটা বিষয় উপলব্ধি করি সেবার। তা হলো—তুমি কোথা থেকে এসেছ, কোনটা তোমার গণ্ডি, তা মুখ্য নয়। তোমার মেধা, তোমার পরিশ্রম, তোমার প্যাশন নির্ধারণ করবে তোমার অবস্থান, তোমার গণ্ডি। সব সময় মনে রাখবে, সেটাই হবে তোমার অবস্থান যেখানে তুমি দাঁড়ানোর সাহস রাখবে। তোমার অর্জন, অধ্যবসায় এবং নিজের স্বপ্নকে অনুসরণ করার ইচ্ছাশক্তি তোমাকে উঁচু থেকেও উঁচু অবস্থানে নিয়ে যাবে, সে যত লোকই তোমার অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলুক না কেন। যোগ্যতাই হবে তোমার জবাব।
ভরসা রাখো তোমার দেশে, শক্ত করো দেশের ভিত
দ্রুত পরিবর্তনশীল এই সময়ে তোমরা তরুণেরা খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছ। সততা, সহানুভূতিশীলতা এবং ন্যায়ের প্রতি দায়বদ্ধ থাকার যে মূল্যবোধ এত দিন তোমরা লালন করেছ—সেগুলোর যথাযথ প্রয়োগের মধ্য দিয়ে এবার তোমাদের ভবিষ্যৎ পুনর্নির্মাণ করতে হবে।
গণতন্ত্রকে প্রাধান্য দিয়ে তোমাকে ভবিষ্যৎকে সম্ভাবনাময় করে তুলতে হবে। সমাজব্যবস্থায় ন্যায্যতা ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিতের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যৎ গঠনে এগিয়ে যাও। উদার মন নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করো, বৈষম্য দেখলে প্রশ্ন তোলো, আর এমন সমাজ গড়ে তোলো যেখানে সবার কথাই সমানভাবে সবাই শোনে, মূল্য দিতে শেখে।
যারা শুধু স্থিতাবস্থা রাখার চর্চা করে, একটি দেশের ভবিষ্যৎ তারা লিখতে পারে না। বরং তাঁরাই লেখে যাঁরা বড় স্বপ্ন দেখার সাহস করে। যাঁরা কোনো ঝুঁকি নিতে ভয় পায় না। যাঁরা সব প্রতিকূলতায়ও সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যয়ে অবিচল থাকে। তোমরাই হলে সেই ভবিষ্যতের স্থপতি। তোমাদের সাহস, সহিষ্ণুতা এবং সত্যের প্রতি নিঃসংকোচ দায়বদ্ধ থাকার চেষ্টা দিয়ে গণতন্ত্র রক্ষা করে যাও, সমাজের মেরুদণ্ডকে আরও দৃঢ় করে যাও।
ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়ানোর এই মুহূর্তে কিছু কথা মনে রেখো—
• যা সত্য, যা সঠিক নির্ভয়ে তা বলে যাও।
• পথ যত অমসৃণই হোক, নিজের স্বপ্ন পূরণে অদম্য থাকো।
• ব্যর্থতাকে গ্রহণ করো।
• গণতন্ত্রের শক্তিতে আস্থা রাখো।
• সততা ও সহানুভূতির সঙ্গে দেশের সংস্কার করো, পুনর্নির্মাণ করো, দেশকে এগিয়ে নাও।
ধন্যবাদ।
ইংরেজি থেকে অনূদিত