জেন-জিরা এখন মা–বাবা, অভিভাবক হিসেবে তাঁরা কেমন
মা-বাবার সঙ্গে সবার খুনসুটি, অভিমান হয়েই থাকে। কখনো খানিকটা কঠোর হয়েই তাঁরা শাসন করেন। তখন মুখ ভার করে বসে থাকে সন্তান। ভেবে দেখুন তো, এ রকম সময় আনমনে ঠিক কতবার বলেছেন, ‘আমি তাঁদের মতো হব না। অনেক ভালো প্যারেন্টিং করব।’ মজার ব্যাপার হলো আপনার সন্তানও আপনাকে নিয়ে এমনটাই ভাববে এবং এর সম্ভাবনাই বেশি।
প্রতিটি প্রজন্মের মা–বাবাই আগের প্রজন্ম থেকে ভালো মা–বাবা হয়ে উঠতে চায়। ভুল শুধরে হাঁটতে চায় আদর্শ প্যারেন্টিংয়ের রাস্তায়। তবে অধিকাংশই সেই অদৃশ্য ‘পরিপূর্ণতা’ খুঁজতে গিয়ে হিমশিম খায়। কীভাবে তাদের প্যারেন্টিং নিজের প্রজন্মের কাছে মৌলিক ও আলাদা হবে, সেটা নিয়েই যত চিন্তা।
কানাডার ইয়র্কভিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, থেরাপিস্ট ও লেখক অ্যামেলিয়া কেলি বলেন, ‘প্রত্যেক প্রজন্মের কিছু সেরা দিক থাকে। সেসব গ্রহণ করে নিজের পছন্দের স্টাইলের সঙ্গে মানিয়ে নিলে তা অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে।’ তাঁর মতে, নিজের প্রজন্মের সব বৈশিষ্ট্য অনুসরণ করতে হবে, বিষয়টা এমন নয়। এটা বোঝা জরুরি।
তবে এ কথা সত্য, সবার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ অনেক ঘটনা ঘটে। এসব তাদের অভিভাবকত্বের ধরনে প্রভাব ফেলে। ফলে দশকে দশকে সন্তান পালনের ধরনে পরিবর্তন ঘটে।
জেনজি মা-বাবারা ঠিক কেমন
জেন–জিরা আদর্শ অভিভাবক হতে চান, মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানী হলি শিফ। একই সঙ্গে মিলেনিয়াল প্রজন্মের মায়েদের তুলনায় প্যারেন্টিং নিয়ে তারা কম আত্মবিশ্বাসী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে বড় হওয়ার কারণে এটি ঘটেছে।
আমাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভেসে বেড়ায় তথাকথিত আদর্শ মা-বাবার নানা কর্মকাণ্ড। অনেকেই এখানে সন্তান লালনের নিজেদের ভালো অভিজ্ঞতাগুলো তুলে ধরেন, দেন নানা মতামত। সেটার সঙ্গে তুলনা সব সময় চলতেই থাকে। ফলে নিজেদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেন জেন–জিরা।
শিফ বলেন, জেন-জি মা-বাবারা অনেকটাই ‘জেন্টল প্যারেন্টিং’কেন্দ্রিক। ব্যক্তিগত অভিব্যক্তিকে তারা মূল্যায়ন করে। তবে প্রথাগত নিয়মকানুন প্রত্যাখ্যান করার দিকেই আগ্রহী। ফলে নতুন প্যারেন্টিংয়ের ধরনকে পরখ করে দেখার সুযোগ পায় এই তরুণেরা।
তবে শিফ বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, মনস্তাত্ত্বিকভাবে, জেন-জিদের সন্তানেরা স্বাস্থ্যবান হতে পারে। কারণ, এই মা-বাবাদের মধ্যে সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্য এবং সুস্থতার বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতা আছে।
এ ছাড়া সন্তানদের পড়ালেখার ক্ষেত্রে এ প্রজন্মের মা-বাবারা প্রচলিত স্কুলের চেয়ে আধুনিক স্কুলগুলোকেই প্রাধান্য দেন বেশি। এর মধ্যে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল ও মানসম্মত কিন্ডারগার্টেন স্কুল অন্যতম। সন্তান যেন শৈশব থেকেই ইংরেজিতে ভালো করে, সেদিকেও থাকে বাড়তি নজর।
দেশের জেন–জি মা কী বলছেন
ঋতুকা সাহা জেন–জি প্রজন্মের। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণস্বাস্থ্য বিভাগে স্নাতকোত্তরে পড়ছেন এই তরুণী। প্রায় তিন বছর হলো তিনি মা হয়েছেন। বাংলাদেশের জেন–জি অভিভাবকদের ভাবনা নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শিশুকে যথেষ্ট সময় দেওয়ার বিষয়টা আমরা আলাদা করে বুঝতে পারি। আমি বড় হয়েছি যৌথ পরিবারে। শাসনও করা হয়েছে ভিন্নভাবে। মা–বাবাকে তেমন বকাঝকা করতে হয়নি বা প্রয়োজন পড়েনি। আমাদের সময়ে এসে সবাই নিউক্লিয়ার প্যারেন্ট। তাই শাসন বা আদরের ধরন বদলেছে।’
এখনকার মা-বাবারা কম রক্ষণশীল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আগে অনেক পরিবার নাচ–গান শেখানোর ব্যাপারে রক্ষণশীল থাকত। আমি এমন হব না।’
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিশুর বিনোদন। শহুরে শিশুদের জন্য খোলা উদ্যান বা মাঠ তেমন একটা নেই। বৈদ্যুতিক যন্ত্র ছাড়া শিশুকে আনন্দ দিতে নিয়ে যেতে হয় কিছুটা ব্যয়বহুল শিশুবান্ধব জায়গাগুলোতে। অন্যদিকে জেন–জি মা-বাবারা সন্তানদের ইংরেজি মাধ্যম বা নামীদামি স্কুলে পড়াতে চান। সেখানেও খরচ হয় মোটা অঙ্কের টাকা। দুটি দিক মিলিয়ে ঋতুকা বলেন, ‘এখনকার শিক্ষিত প্রজন্মের প্রায় সবাই পড়াশোনা শেষ করে কর্মজীবী হতে চান। স্বামী–স্ত্রী দুজনই আয় করলে সন্তানের চাহিদা মেটানো যায় সহজে। তবে নিজে দেখাশোনা না করলে সন্তানের বিপথে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।’
ক্যারিয়ার নাকি সন্তানের দেখাশোনা, এই বিষয়ও জেন–জি অভিভাবকদের বেশ চিন্তায় ফেলেছে।
সূত্র: প্যারেন্টস ডটকম