ডিভোর্সের পরও সন্তানের কথা ভেবে এক ছাদের নিচে থাকা কি ঠিক

বিবাহবিচ্ছেদের পরও অনেক মা–বাবাকে সন্তানের জন্য আবার একসঙ্গে দেখা যায়
ছবি: কবির হোসেন

জনপ্রিয় বলিউড অভিনেতা হৃতিক রোশনের বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে বেশ অনেক দিন হলো। তবে তাঁর সাবেক স্ত্রী সুজান খানের সঙ্গে তাঁকে প্রায়ই দেখা যায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। যেহেতু এই দম্পতির দুটি সন্তান রয়েছে, তাই তাঁরা যোগাযোগও অব্যাহত রেখেছেন।

কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যখনই হৃতিক-সুজানার কোনো ছবি বা ভিডিও পোস্ট হয়, সঙ্গে সঙ্গে খেপে যান নেটিজেনরা। কেন বিচ্ছেদের পরও তাঁরা একসঙ্গে ঘুরে বেড়ান, কেন তাঁদের এক ছাদের নিচে দেখা যায়—এসব নিয়ে প্রশ্নের শেষ থাকে না তাঁদের।

যেন বিবাহবিচ্ছেদ হওয়া মানে একে অন্যের মুখদর্শন না করার অলিখিত কোনো নিয়ম আছে!

শিশুকে নিশ্চিত করতে হবে যে তার পাশে মা–বাবা সব সময়ই আছেন
ছবি: সুমন ইউসুফ

একই ধরনের অভিজ্ঞতার মুখে পড়েন স্মৃতি-মনসুর দম্পতি। বিয়ের পর থেকেই তাঁদের ভেতর টুকটাক সমস্যা ছিল। তবে দ্বিতীয় সন্তান জন্মের পর দুজনের মধ্যে দূরত্ব বেড়ে যায়। ফলে একসময় যৌথভাবেই বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা, স্মৃতির কাছে থাকেন তাঁর ছেলেরা। সপ্তাহে দুদিন মনসুর ছেলেদের সঙ্গে দেখা করেন।

মুশকিল হলো, দেখা হলে ছেলেরা বাবাকে ছাড়তে চাইত না। তারা বাবার সঙ্গে বেশি সময় কাটাতে চায়, রাতে বাবার বুকে মাথা রেখে গল্প শুনতে শুনতে ঘুমাতে চায়। ওদিকে মনসুর যে মেসে থাকেন, সেখানে ছেলেদের নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

তাই অনেকটা বাধ্য হয়েই দুই ছেলেকে নিয়ে স্মৃতির বাবার বাড়িতেই রাত কাটান মনসুর। আর এ ঘটনা দেখে ভীষণ প্রতিক্রিয়া দেখান স্মৃতিদের আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা। কেন বিচ্ছেদের পরও একই বাড়িতে সাবেক স্বামী-স্ত্রী রাত কাটাবেন, সে প্রশ্ন রাখেন তাঁরা। রীতিমতো অপদস্থ করা হয় স্মৃতি ও তাঁর পরিবারকে।

বিচ্ছেদের পর সন্তানদের কারণে বাধ্য হয়ে একসঙ্গে থাকার ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলাম জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক অধ্যাপক মেখলা সরকারের কাছে।

আরও পড়ুন
মা–বাবার বিচ্ছেদের বিষয়টি ইতিবাচকভাবে সন্তানকে বোঝাতে হবে
ছবি: সুমন ইউসুফ

মেখলা সরকার বলেন, সাধারণ বিচ্ছেদ তখনই হয়, যখন দুপক্ষের মধ্যে আর কোনো আবেগীয় সম্পর্ক থাকে না। অনেক সময় দেখা যায়, দুজনের মধ্যে একজন মানসিকভাবে পুরোপুরি আবেগের সংযোগটা ছাড়তে পারেন না, পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেন না। ফলে যদি সন্তানের কারণে এক ছাদের নিচে থাকার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন এটা ওই পক্ষের জন্য মানসিক পীড়ার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। বিচ্ছেদ মানে সম্পূর্ণরূপে আলাদা হওয়া। বিচ্ছেদের পর দুজনেরই সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার কথা। প্রয়োজনে নতুন সঙ্গী খুঁজে নেওয়ার কথা। সেখানে পুরোনো সম্পর্ক থেকেই যদি কেউ বের হতে না পারেন, তাহলে তা সন্তানসহ কারও জন্যই মঙ্গলজনক নয়।

মানসিক স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করলে সন্তানের জন্য যোগাযোগ থাকলেও সাবেক স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দূরত্ব থাকাই শ্রেয় বলে মনে করেন এই চিকিৎসক। এ ক্ষেত্রে কোনো পক্ষেরই অপর পক্ষের বাসায় গিয়ে থাকাটা বুদ্ধিমানের কাজ নয় বলেই মত তাঁর।

ডা. মেখলা বলেন, ‘কাউকে বাসায় থাকতে দেওয়া মানে একদম ব্যক্তিগত পরিসরে জায়গা দেওয়া। অথচ একে অন্যের ব্যক্তিগত পরিসরে থাকবে না বলেই বিচ্ছেদ হয়েছিল। আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে যদি বলি, মনটা ঠিক অতখানি যান্ত্রিক নয় যে বিচ্ছেদের পর সঙ্গে সঙ্গে সব ভুলে যাবে। ফলে দেখা যায়, সন্তানের জন্য বিচ্ছেদের পর কখনো এক বাসায় থাকতে হলে একধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়। কোনো না কোনো পক্ষের জন্য তা মানসিক সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই সন্তানের জন্য হলেও একসঙ্গে একই বাসায় না থাকাই ভালো।’

আরও পড়ুন

সন্তান যদি মা–বাবাকে নিয়ে একসঙ্গে থাকবে বলে জেদ করে, তখন সেই পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দিতে হবে, তা–ও জানতে চেয়েছিলাম ডা. মেখলার কাছে।

মা–বাবার বিচ্ছেদ সন্তানের জন্য খুবই স্ট্রেসফুল বিষয় উল্লেখ করে মেখলা বলেন, প্রথম দিন থেকেই শিশুকে সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করাতে হবে। স্বাভাবিকভাবে সে দুজনকেই চাইবে। কিন্তু তাকে বোঝাতে হবে যে এটা আর সম্ভব নয়। মা–বাবা দুজনই তার জন্য আগের মতোই আছেন, কেবল একসঙ্গে নেই। ভালোবাসা বদলায়নি, কেবল মা–বাবার একসঙ্গে থাকা সম্ভব নয়। এটা শিশুকে বোঝাতে হবে।

অনেক মা–বাবা বিচ্ছেদের পরও সন্তানের সামনে একসঙ্গে থাকার অভিনয় করেন, এটা ঠিক নয় বলে মনে করেন ডা. মেখলা। তাঁর মতে, শিশুরা সামান্য পরিবর্তনও ধরতে পারে। এভাবে তার সামনে অভিনয় করলে তার ভেতর হীনম্মন্যতা তৈরি হয়, মিথ্যা বলার অভ্যাস তৈরি হয়। তাই শিশুকে সত্য বলতে হবে। সত্যের একটা শক্তি আছে। শুরুতে কষ্ট হলেও শিশু ঠিকই বিষয়টা বুঝতে পারবে।

মা–বাবা বিচ্ছেদের পর সন্তানের সামনে একসঙ্গে থাকার মিথ্যে অভিনয় করা ঠিক নয়
ছবি: সুমন ইউসুফ

আবার মা–বাবা কেউ যেন শিশুর সামনে একে অন্যের বদনাম না করেন, সে বিষয়েও দৃষ্টি রাখতে বলেন এই মনোরোগ চিকিৎসক।

ডা. মেখলা বলেন, শিশুকে নিশ্চিত করতে হবে যে তার পাশে মা–বাবা সব সময়ই আছেন। একসঙ্গে না থাকলেও তাঁরা শিশুর পাশে আছেন। প্রয়োজন অনুযায়ী শিশুকে নিয়ে তাঁদের কোথাও বসতে হতে পারে, বেড়াতে যেতে হতে পারে, কিন্তু সেটা যেন এমন পর্যায়ে না যায় যে শিশুর মনে এমন আশার সঞ্চার হয় যে মা–বাবা আবার একসঙ্গে থাকবেন।

আরও পড়ুন