জাকির হোসেন ৮ শতাংশ জমিতে লাউ চাষ করেছেন একতারা বানাবেন বলে
কম্পিউটারবিজ্ঞানে পড়াশোনা ছেড়ে বাদ্যযন্ত্রে তালিম নিতে গিয়েছিলেন মোহাম্মদ জাকির হোসেন। এখন আমাদের জনপদের বাদ্যযন্ত্রই তাঁর ধ্যানজ্ঞান, গবেষণার বিষয়। গত দেড় বছর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কম চেনা অনেক বাদ্যযন্ত্র নিজেই বানিয়ে ফেলেছেন। সেসব নিয়ে গত ২৫ থেকে ২৯ নভেম্বর রাজধানীর ধানমন্ডির আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলেন। তখন শিল্পী জাকিরের জীবনের আরও গল্প শুনে এসেছেন সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম
‘সামান্য লাউয়ের খোলের ভেতরে একটা তার; একতারার সুর কীভাবে এত গভীরভাবে বাজে মানুষের মনে? বাদকের মনের আকুতি মিশে না গেলে কি এমন কৌশল আসে আঙুলে!’ শিল্পী মোহাম্মদ জাকির হোসেন একতারা নিয়ে নিজের অনুভবের কথা এভাবেই বলছিলেন।
অথচ ২০১০ সালে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ থেকে রাজধানীতে পড়তে আসা তরুণটির প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোনো বাদ্যযন্ত্র বাজানোর প্রশিক্ষণ ছিল না। ২০১৩ সালের শেষ দিকে তিনি উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে বাংলাদেশ আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়ছেন। একদিন ঢাকা শহর তন্নতন্ন করে খুঁজে কিনেছিলেন মনের মতো একটি একতারা। ঘর আটকে বসে তাতে টুংটাং শব্দ করতে করতে ঠিক উঠে এল এক সুর। বললেন, ‘কীভাবে বাজাতে শিখেছি নিজেও জানি না। মনে হচ্ছিল গাছের তলায় কেউ একজন বসে আছেন। মানুষটার চুল-দাড়ি সবই সাদা। কিন্তু তাঁর চোখ-মুখের আদল কার মতো জানি না। কী যে বাজালাম, কী গাইলাম, তা আর বলতে পারব না। শুধু অনুভব করলাম মনের সুর ধরা দিচ্ছে আমার কাছে, যা এত দিন ধরে খুঁজছিলাম।’
শুরু হলো সুরের সন্ধানে জাকিরের পথচলা। সেই পথ চলতে গিয়ে ২০১৬ সালে স্নাতক পড়া ছেড়ে দিলেন। চলে গেলেন ভারতে পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীর কর্মশালায়। সেই কর্মশালা শেষে যেন নতুন পথের সন্ধান পেলেন। পণ্ডিতের বিভিন্ন শিক্ষার্থী-শিল্পীর কাছে শুরু করলেন গুরুমুখী বিদ্যা। কেটে গেল দুই বছরের বেশি সময়। এরপর ২০১৯ সালে রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী ও রবীন্দ্রসাধক রাজেশ্বর ভট্টাচার্যর কাছে গেলেন। আড়াই বছর তাঁর কাছে নিলেন বাংলা ভাষা, রবীন্দ্রসাহিত্য ও রবীন্দ্রসংগীতের তালিম।
শৈশব থেকেই সুর খুঁজছেন
কৃষিপ্রধান পরিবারের সন্তান জাকির হোসেন। স্বাভাবিকভাবেই সুরের কাছে তাঁর এই সমর্পণ সহজভাবে নেননি স্বজনেরা। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাদ্যযন্ত্র নিয়ে কাজ করার কথা শুনে ধর্মের কথা বলেছিল গ্রামের মানুষ। সে ভয় শিল্পীর বাবা শাহ আলম প্রামাণিক আর মা জোছনা বেগমকেও কম তাড়িত করেনি। কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়া ছাড়ার পর তাঁরা তো বাড়ি থেকেই বের করে দিয়েছিলেন জাকিরকে। কিন্তু তাতে কি, শিল্পী যে বুকের ভেতর বয়ে বেড়ান ফসলের মাঠে বয়ে যাওয়া বাতাসের সুর, ধরতে চান সেখানকার গাছের পাতার হাওয়া অথবা খুঁজে বেড়ান এক অলীক মানুষের স্পর্শ! সেই আকাঙ্ক্ষা আসলে জন্মেছিল শৈশবেই। শিল্পী বললেন, ‘ফুলপুকুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়তাম। বৃহস্পতিবারের সবশেষ ক্লাস ছিল সংস্কৃতিচর্চার। সারা সপ্তাহের ওই ক্লাস আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগত। হয়তো তখন থেকেই সুর খুঁজেছি আমি।’
এখন শিল্পী জাকির চোখ বন্ধ করে বাজাতে পারেন একতারা, সেতারা, হাতবায়া, বাউলা ডুগি আর খমক। বলে দিতে পারেন কোন কাঠের কতটুকু মাপে বাজনার সুর–তালের কমবেশি হয়। কোন চামড়া ফেটে যায় দ্রুত বা সুরটা ছড়ে বেসুরো হয়ে। সম্প্রতি শেষ হওয়া প্রদর্শনীতে থাকা মিরাত, গোপী, কৃষ্ণকাচি, ঘটক বা ভৈরবীর মতো কম চেনা বাদ্যযন্ত্রগুলো বানানো হয়েছে জাকিরের নির্দেশনা ও তত্ত্বাবধানে। অর্জুন, তেঁতুল, বেল, নিম, কদম, ছাতিম, ডুমুর বা পাউয়া চন্দনগাছের কাঠ ব্যবহার করে বানানো হয়েছে এসব যন্ত্র। তবে জাকির হোসেন বলছিলেন, কিছুই সম্ভব হতো না তাঁর জীবনে আসা অসাধারণ কয়েকজন মাটির মানুষের দেখা না পেলে।
যাঁদের একজন গোবিন্দগঞ্জের ফুলপুকুরিয়ার দুর্যোধন বর্মণ ওরফে সুরকুটু। ৭০ বছরের কৃষিকাজ করা দুর্যোধন বর্মণ জাকিরের দাদুর বন্ধু। ২০২০ সালে তিনি জাকিরের হাতে তুলে দেন তাঁর পূর্বপুরুষের শতবর্ষী স্মৃতিময় এক বাদ্যযন্ত্র, যার নাম ‘সেতারা’। দুর্যোধন বর্মণ নিজেও গানবাজনা করেন, কীর্তনের আসরে, নবান্নের উৎসবে গান। কিন্তু তাঁর মনে হয়েছিল, পূর্বপুরুষের এই স্মৃতির মূল্য জাকিরই বুঝবেন ভালো।
বাদ্যযন্ত্রে ইতিহাস খোঁজেন জাকির
জাকির হোসেন সুর খুঁজেছিলেন বলেই তাঁর হাত ধরে উঠে এসেছে অনেক প্রাচীন বাদ্যযন্ত্র। রাজধানীর ধানমন্ডির আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে তাঁর প্রদর্শনীতে দর্শক দেখতে পেলেন এ ভূখণ্ডের সুরের ইতিহাসের একটা অংশ। তবে ‘সুরের ঐকতান’ নামে হয়ে যাওয়া প্রদর্শনীতে রাখা প্রায় ১০০ রকমের বাদ্যযন্ত্র বানাতে এই শিল্পীকে কম মূল্য দিতে হয়নি। আছে বাদ্যযন্ত্রের কৌলীন্য বজায় রাখতে গিয়ে নিজের পেশা ছেড়ে আসার ঝুঁকির গল্পও।
কেমন সেই গল্প? ২০২২ সালে ভারত থেকে দেশে ফিরে জাকির যোগ দিয়েছিলেন ‘ইনটু পজিটিভ’ নামে কক্সবাজারে অবস্থিত একটি কনসালট্যান্সি ফার্মে। ২০২৩ সালের মাঝামাঝিতে চাকরি ছেড়ে দিলেন শুধু বাদ্যযন্ত্র বানাবেন বলে। তখন নিজের বানানো বাদ্যযন্ত্র ছিল মাত্র ৬টি। এখন সে সংখ্যা ৩০ থেকে ৪০। তবে তাঁর সংগ্রহে আছে প্রায় ১০০টি বাদ্যযন্ত্র। বাকিগুলো তাঁরই নির্দেশনা ও তত্ত্বাবধানে বানানো হয়েছে দলগতভাবে।
জাকির হোসেন এখন গবেষণা করছেন বাদ্যযন্ত্র তৈরির উপকরণ নিয়ে। নিজের বাদ্যযন্ত্রগুলোর নাম–পরিচয় বলতে গিয়ে জাকির বললেন, ‘দেখবেন, বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে দর্শন থাকে। আমার একটি বাদ্যযন্ত্রের নাম “স্বয়ংবর”। অর্জুন কাঠ দিয়ে বাদ্যযন্ত্র হয় না। কিন্তু আমি অর্জুন কাঠ দিয়েই বানিয়েছি। মহাভারতে দ্রৌপদীর স্বয়ংবর সভার গল্প পাবেন। এই স্বয়ংবর সাত তারের যন্ত্র। আবার ধরুন “পদ্মরাগ” বানিয়েছি। এই যন্ত্র নিজেই সহজিয়া ঘরানাকে উপস্থাপন করে, যেখানে রয়েছে অহিংসার বাণী। এসবের সঙ্গে গ্রামীণ সংস্কৃতিরও সম্পর্ক রয়েছে।’
গোবিন্দগঞ্জে ৮ শতাংশ জমিতে লাউ চাষ শুরু করেছেন জাকির। এসব লাউয়ের একটিও সবজি হিসেবে বিক্রি করবেন না। প্রতিটি লাউয়ের খোল দিয়ে বানাবেন একতারার কাঠামো।
বাদ্যযন্ত্র নিয়ে শিল্পীর স্বপ্ন
মোহাম্মদ জাকির হোসেন আরও কিছু প্রদর্শনীর আয়োজন করতে চান। তিনি বলেন, ‘সব জায়গায় বাংলা লোকগান উপস্থাপন করা হয় একটি মাত্রায়, যেন এর আর কোনো বৈচিত্র্য নেই।’ কিন্তু বাংলা লোকগানের সুরেও যে অনন্য ব্যঞ্জনা আর বহুমাত্রা রয়েছে, তা-ই তুলে ধরতে চান এই শিল্পী।
জাকির হোসেনের ‘অবকল্প’ নামে আছে একটি সাংস্কৃতিক গবেষণা চর্চা কেন্দ্র। ২০১৫ সালে এটি ‘যোগী’ নামে শুরু হয়, ২০১৮ সালে নাম বদলে হয়েছে ‘অবকল্প’। মূলত তথ্যচিত্র তৈরির আগ্রহ নিয়ে এটি শুরু হলেও এখন কাজ করছে শিশু ও বৃদ্ধদের বিকল্প শিক্ষা নিয়ে। শিশুদের চারু ও কারুশিল্পের প্রতি আগ্রহী করতে চান তিনি।
শিল্পী জাকিরের জীবনের বিভিন্ন পর্বে এসেছে নানা রকম সুর। কখনো ইংলিশ কান্ট্রি মিউজিক, কখনো আধুনিক বাংলা গান। ধর্মীয় জ্ঞান পেয়েছেন পরিবার-সমাজ থেকে। মাটির মানুষেরা দিয়েছে গ্রামীণ জীবনের টান। এর সবকিছুতেই নাকি সুর আছে বলে অনুভব করেন তিনি। জাকির বললেন, ‘লালন আমার কাছে এসেছেন অনেক পরে। যখন এলেন, তখন যেন ডুবিয়ে দিলেন। শুনলাম, আমার ভেতর কেউ বলছে, সুরের গুরু থাকেন আড়ালে। এই অনুভবটুকু আমি কোনো কিছুর বিনিময়ে হারাতে চাই না।’