যতটা ফুটবল, ততটাই আনন্দ

ড্যাফোডিলের খেলোয়াড়দের শিরোপা জয় উদ্‌যাপনছবি: তানভীর আহাম্মেদ

ফাইনালের শেষ বাঁশি বাজতেই অবিশ্বাস্য এক দৃশ্যের অবতারণা। বানের জলের মতো মাঠে ঢুকতে শুরু করেছেন দর্শক। দেখতে না দেখতেই ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মাঠ রীতিমতো জনসমুদ্র। মাঠের বাইরে পুরস্কার বিতরণীর মঞ্চে দাঁড়িয়ে সামনে তাকিয়ে যে দৃশ্যটা দেখলাম, তা রীতিমতো বিস্ময় জাগায়। সামনের কয়েক সারিতে পুরো অবয়বসহ মানুষ দেখা যাচ্ছে। এরপর শুধু গিজগিজ করছে মানুষের কালো মাথা।

মাঠে মানুষ, মাঠের পাশে মানুষ, আশপাশের ভবনগুলোর বারান্দাতেও তিল ধারণের জায়গা নেই। এই জনসমুদ্র, এই উন্মাদনা ফুটবলকে ঘিরে। আরও নির্দিষ্ট করে বললে ইস্পাহানি-প্রথম আলো আন্তবিশ্ববিদ্যালয় ফুটবল। দ্বিতীয়বারের মতো যে টুর্নামেন্ট আয়োজিত হলো এবং সব দিক থেকেই ছাড়িয়ে গেল প্রথমটিকে।

জনসমুদ্রের এই উন্মাদনা ফুটবলকে ঘিরে
ছবি: তানভীর আহাম্মেদ

কীভাবে ছাড়িয়ে গেল, অংশগ্রহণকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তা সবচেয়ে ভালো বলতে পারবে। আপনাকে যদি প্রমাণ দিতে হয়, তাহলে কিছু তথ্যই যথেষ্ট। দ্বিতীয় আসরের প্রথমটিকে ছাড়িয়ে যাওয়ার যে দাবি করা হচ্ছে, সেটি আসলে গত বছর এই টুর্নামেন্টের সফল সমাপ্তির পর দেওয়া প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন। সেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ীই এবার বেড়েছে দলের সংখ্যা, টুর্নামেন্ট ছড়িয়ে গেছে দেশের আরও একটি অঞ্চলে। গতবার ঢাকার বাইরে খেলা হয়েছিল চট্টগ্রাম ও কুমিল্লায়। অংশ নিয়েছিল ৩২টি বিশ্ববিদ্যালয়। এবার চট্টগ্রামে বর্ণাঢ্য উদ্বোধনের পর রাজশাহী ও খুলনা ঘুরে টুর্নামেন্ট এসেছে ঢাকায়। রাজধানীতেই যেহেতু দেশের সবচেয়ে বেশি বিশ্ববিদ্যালয়, স্বাভাবিকভাবেই এখানে দলের সংখ্যা ছিল বেশি। নির্দিষ্ট করে বললে ২৪টি। এর সঙ্গে বাকি তিন অঞ্চলের ১৮টি দল মিলিয়ে এবারের টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৪২।

যা অনায়াসেই আরও বাড়তে পারত। খেলতে তো আগ্রহী ছিল আরও অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই। খেলতে চেয়েও খেলতে না পারায় ওই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যেমন মন খারাপ হয়েছে, তাদেরকে ফিরিয়ে দেওয়ায় তেমনি মন খারাপ হয়েছে আমাদেরও। তারপরও কোনো উপায় যে ছিল না। সংবাদমাধ্যমের মূল যে কাজ, এর বাইরেও আরও অনেক কিছু করে প্রথম আলো। তা করে সামাজিক দায়িত্ব থেকে। কিন্তু সেসবই তো করতে হয় আসল কাজটাকে ঠিক রেখে। যে কারণে নির্দিষ্ট একটা সময়ের মধ্যে এই টুর্নামেন্ট শেষ করার তাড়া ছিল। ৪২টির বেশি দল নিয়ে তা করাটা একটু কঠিনই হতো।

জাতীয় দলের জার্সি গায়ে উঠেছে, ছিলেন এমন ফুটবলারও। এই টুর্নামেন্ট থেকে হয়তো তৈরি হবে আগামী দিনের এমন অনেক ফুটবলার। এই টুর্নামেন্ট আয়োজনের একটা উদ্দেশ্য তো অবশ্যই এটা। সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে খেলাধুলার চর্চা যাতে আরও বাড়ে, সেই উদ্দেশ্যও প্রচ্ছন্ন হয়ে আছে।

ছিল আরেকটি বিবেচনাও। প্রথম আলো তো শুধু নামকাওয়াস্তে আয়োজনে বিশ্বাস করে না। আয়োজন হতে হবে নিখুঁত। যাতে শেষ হয়ে যাওয়ার পরও এটির রেশ থেকে যায় অনেক দিন। এ কারণেই একটা সময় বাধ্য হয়েই ‌‘এবার আর নয়’ বলতে হয়েছে। সঙ্গে থেকেছে আগামী দিনের জন্য প্রতিশ্রুতি। দিন দিন আরও বড় হবে এই টুর্নামেন্ট। বাড়বে দলের সংখ্যা, খেলা ছড়িয়ে যাবে পুরো দেশে। স্বপ্ন দেখতে দোষ কী, একসময় ইস্পাহানি-প্রথম আলো আন্তবিশ্ববিদ্যালয় ফুটবল হবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় টুর্নামেন্ট।

তখন হয়তো আরও অনেক কিছুই যোগ হবে, কিছু জিনিস বদলাবেও। আদর্শ নয় জেনেও দুবারই এই টুর্নামেন্ট হয়েছে নকআউট পদ্ধতিতে। একটা ম্যাচ হারলেই বিদায়, এটা অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যই শুরু হতে না হতেই শেষ করে দিয়েছে টুর্নামেন্ট। ভবিষ্যতে টুর্নামেন্টের পরিসর আরও বাড়লে হয়তো এটি বদলানো যাবে। তাতে অন্তত ‘সেকেন্ড চান্স’ বলে কিছু পাবে দলগুলো। হতে পারে আরও অনেক কিছুই। গত বছর এই টুর্নামেন্ট শুরুর সময় কি আমরা ভাবতে পেরেছিলাম, এটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন আলোড়ন তুলবে!

ভবনগুলোর বারান্দা থেকেও অনেকে খেলা দেখেছেন
ছবি: তানভীর আহাম্মেদ

শুরুতে ফাইনাল শেষের যে দৃশ্যের কথা বলা হলো, তার একটা কারণ তো অবশ্যই সেই ফাইনাল জিতে ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যাম্পিয়ন হওয়া। নিজেদের মাঠে খেলা বলে স্বাভাবিকভাবেই দর্শকের মধ্যে সংখ্যাধিক্য ছিল ড্যাফোডিলের শিক্ষার্থীদের। তার মানে এই নয় যে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর খেলায় উত্তেজনা বা উদ্‌যাপনে উপাদান খুব কম ছিল। এই টুর্নামেন্টকে মাথায় রেখে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই দীর্ঘ প্রস্তুতি নিয়েছে। খেলার সুযোগ-সুবিধায় পিছিয়ে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেদের ঘাটতিগুলো পূরণ করার প্রতিজ্ঞায় শাণিত করেছে নিজেদের। দেশের শীর্ষ লিগে খেলেন, এমন অনেক ফুটবলারই মাঠে নেমেছেন নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে। জাতীয় দলের জার্সি গায়ে উঠেছে, ছিলেন এমন ফুটবলারও। এই টুর্নামেন্ট থেকে হয়তো তৈরি হবে আগামী দিনের এমন অনেক ফুটবলার। এই টুর্নামেন্ট আয়োজনের একটা উদ্দেশ্য তো অবশ্যই এটা। সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে খেলাধুলার চর্চা যাতে আরও বাড়ে, সেই উদ্দেশ্যও প্রচ্ছন্ন হয়ে আছে।

সবার সহযোগিতা না পেলে শুধু প্রথম আলোর পক্ষে এত বড় একটা আয়োজন সফলভাবে সম্পন্ন করা যেত না। পৃষ্ঠপোষক হিসেবে ইস্পাহানি এককথায় অসাধারণ। তা শুধু আর্থিক ব্যাপারেই সীমাবদ্ধ ছিল না, টুর্নামেন্টের পুরোটা সময় সক্রিয় সহযোগিতা করেছেন ইস্পাহানির কর্মকর্তারা। ঢাকার বাইরের তিনটি অঞ্চলের খেলার জন্য মাঠ বরাদ্দ দিয়ে সহায়তা করেছে ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। ঢাকা অঞ্চল ও চূড়ান্ত পর্বের খেলার স্বাগতিক হতে রাজি হয়ে কৃতজ্ঞতাভাজন হয়েছে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিও।

খুলনা জেলা স্টেডিয়ামেও জমজমাট খেলা হয়েছে
ছবি: সাদ্দাম হোসেন

কৃতজ্ঞতা বা ধন্যবাদ তো আরও কতই জানাতে হয়। বাংলাদেশ রেফারিজ অ্যাসোসিয়েশনকে ধন্যবাদ। পুরো টুর্নামেন্টে রেফারিং নিয়ে বলতে গেলে কোনো বিতর্কই হয়নি। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের এই টুর্নামেন্টে বাঁশি বাজিয়েছেন দেশের শীর্ষ রেফারিরা। কৃতজ্ঞতা টুর্নামেন্ট কমিটির সদস্যদের প্রতিও। বাংলাদেশের ফুটবলের অনেক কিংবদন্তিতুল্য খেলোয়াড় আছেন এই কমিটিতে। টুর্নামেন্ট  সফল করে তুলতে শুধু পরামর্শ দিয়েই যাঁরা দায়িত্ব শেষ করেননি, অনেকেই নিয়মিত মাঠে উপস্থিত থেকেছেন।

সমাপনী দিনে কনফেত্তি-টেত্তি উড়িয়ে এবারের সব আয়োজন যখন শেষ, তখন থেকেই যেন শুরু হয়ে গেছে কাউন্টডাউন। আগামী বছর আবার এই ফুটবল-উৎসবের জন্য অপেক্ষা!‍