নিজেকে সুখী রাখার পাঁচটি সহজ অভ্যাস

ছোট ছোট অভ্যাসের চর্চা করেই আমরা সুখে থাকতে পারিমডেল: সূচনা, ছবি: কবির হোসেন

আমাদের সুস্থতার বেশির ভাগ আমাদের নিজেদের সহজ কিছু অভ্যাসের ওপর নির্ভর করে। নানা কারণে আজকাল চারপাশে অনেকেই অসুখী হয়ে ঘুরে বেড়ান। অথচ ছোট ছোট অভ্যাসের চর্চা করেই আমরা সুখে থাকতে পারি। আমাদের মানসিকভাবে প্রশান্তিতে থাকতে সহযোগিতা করবে, এমন পাঁচটি অভ্যাস নিয়ে আজকের আলোচনা।

মনোযোগিতা

মনোযোগিতা হলো ‘এখন, এখানে’ কী ঘটছে, সে ব্যাপারে সজাগ থাকা। অর্থাৎ এ মুহূর্তে কেমন লাগছে, কী করছি, কী চাইছি ও চিন্তা করছি, সে ব্যাপারে সচেতনতা। পুরোনো নানা স্মৃতি মাথায় নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে ছুটতে গিয়ে আমরা যেন বর্তমানের মুহূর্তগুলোকে হারিয়ে না ফেলি, সে ব্যাপারে সচেতন থাকা প্রয়োজন। মনোযোগিতার চর্চা আমরা বিভিন্নভাবে করতে পারি। যেমন খাওয়ার সময় অন্য কোনো কিছুতে নিজেকে ব্যস্ত না রেখে পঞ্চেন্দ্রিয় দিয়ে খাওয়া। মানে খাবার উপভোগ করার জন্য খাবারের বর্ণ, গন্ধ, চিবানোর শব্দ, হাত ও জিহ্বার সঙ্গে খাবারের সংস্পর্শ মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করা। তেমনি অন্যান্য কাজ যেমন গোসল, শরীরচর্চা, ধ্যান, ঘর ও বাইরের বিভিন্ন কাজও পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে করার মাধ্যমে মনোযোগিতার চর্চা করা যেতে পারে। এই চর্চা আমাদের শরীর ও মনকে শান্ত রাখে, মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং জীবনকে পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করতে সাহায্য করে। আজকাল স্মার্টফোনে আসক্তি আমাদের মনোযোগী জীবনযাপনে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্মার্টফোন ব্যবহারে তাই সংযম ও বিবেচনা থাকা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।

কাজ ও বিশ্রামের ভারসাম্য

কাজ আমাদের সুস্থ রাখে। হোক তা ঘর বা বাইরের কাজ। নিজের পরিচয় তৈরিতে এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর হতেও কাজ বা কর্মসংস্থান প্রয়োজন। পছন্দের কাজে যুক্ত থাকলে নিজের জীবনে যেমন স্বস্তি ও সচ্ছলতা থাকে, তেমনি পরিবার ও সমাজে অবদান রাখা যায়। কিন্তু কাজের নেশায় অবিরাম ছুটে চলা আমাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যকে ভীষণভাবে ব্যাহত করে। তাই কখন কোথায় থামতে হবে, জানাটা জরুরি। সারা দিনের কাজের ফাঁকে ফাঁকে অল্প সময়ের জন্য হলেও বিরতি নেওয়া, সপ্তাহে অন্তত একদিন ছুটি কাটানো এবং রাতে পর্যাপ্ত ঘুম আমাদের সুস্থ থাকতে সহযোগিতা করে।

পছন্দের বই পড়েও নিজেকে খুশি করা যায়
ছবি: কবির হোসেন

ছোট ছোট অর্জন উদ্‌যাপন

পরিবার, সমাজ বা চারপাশের মানুষগুলো আমার কাছে কী প্রত্যাশা করছে, অন্যদের থেকে আমি কতটা এগিয়ে বা পিছিয়ে আছি—এসব চিন্তা বাদ দিন। এর থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হলো আমি নিজে কী চাই, কী পছন্দ করি, কিসে আমি আনন্দ পাই, সেটা ভাবা। অন্যের চাপিয়ে দেওয়া জীবনে বাহবা থাকতে পারে, কিন্তু প্রকৃত প্রশান্তি থাকে না। তাই ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে আমাদের কাজের ধরন ও গতি নিজস্ব পছন্দের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হচ্ছে কি না, খেয়াল রাখতে পারি। কাজের সামান্য অগ্রগতিকেও উদ্‌যাপন করতে হবে। ভাবতে শিখুন, অফিসের গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ সফলভাবে শেষ করাটা যেমন আমি উদ্‌যাপন করতে পারি, যত্নে গড়া শখের বাগানে লাল টুকটুকে একটা গোলাপ ফোটাটাও তেমনি উদ্‌যাপন করতে পারি।

আরও পড়ুন

কৃতজ্ঞতার চর্চা

আমাদের কী নেই, সব সময় শুধু তা নিয়ে আক্ষেপ না করে, যা আছে সেদিকে খেয়াল করেও কৃতজ্ঞ থাকতে পারি। কারণ, যা আছে তার জন্য কৃতজ্ঞ না থাকলে নতুন কিছু পাওয়ার মানসিক শক্তি কোথা থেকে পাব! হ্যাঁ, কৃতজ্ঞতার চর্চা আমাদের মানসিক শক্তিজাগানিয়া হরমোনগুলো উৎপন্ন করে। ফলে আমরা সন্তুষ্ট ও কর্মদীপ্ত থাকতে পারি এবং যা নেই, তা পাওয়ার জন্য এগিয়ে যেতে পারি। দিন শেষে ফেরার জন্য ঘর আছে, ঘরে খাবার আছে, পরিষ্কার কাপড় আছে, একজন হলেও কাছের মানুষ আছে, কিছু বই ও গাছপালা আছে, এমন ছোট ছোট প্রাপ্তির জন্যও আমরা জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে পারি। দৈনন্দিন জীবনে চলার পথে আমরা যে কাজগুলো করছি, সেগুলোর জন্য নিজেকে ধন্যবাদ দিতে পারি। সেই সঙ্গে অন্যদের সহযোগিতার জন্যও কৃতজ্ঞতা জানাতে পারি।

কথা বলায় পরিমিতি

আমাদের মুখের কোনো কথা যেন অন্যের ক্ষতি বা বিরক্তির কারণ না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সুফি দার্শনিক জালালউদ্দিন রুমির একটি কথা আমরা মনে রাখতে পারি, ‘কোনো কিছু বলার আগে আপনার কথাগুলোকে তিনটি দরজা দিয়ে যেতে দিন—১. সত্য, ২. প্রয়োজনীয়তা ৩. সহৃদয়তা। অর্থাৎ বলার আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন আপনি যা বলছেন, তা কি সত্য? তা কি প্রয়োজনীয়? তা কি সদয় বা আন্তরিক? উত্তর ‘হ্যাঁ’ হলে নির্দ্বিধায় বলুন, আর ‘না’ হলে আবারও ভেবে দেখুন।

আরও পড়ুন