তারা সুতারিয়ার রোগ ‘ডিসক্যালকুলিয়া’ সম্পর্কে কতটা জানেন? আপনার শিশুরও এ রোগ নেই তো?

‘টক্সিক’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য প্রশংসায় ভাসছেন বলিউড অভিনেত্রী তারা সুতারিয়া। সম্প্রতি গণমাধ্যমের সঙ্গে নিজের এক অক্ষমতা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন এই তারকা। সমস্যাটির নাম ডিসক্যালকুলিয়া। এ সমস্যার কারণেই হিসাব–নিকাশ নিয়ে সমস্যায় পড়েন তিনি।

গণমাধ্যমে নিজের অর্থনৈতিক বিষয়–আশয় সম্পর্কে কথা বলার সময় তারা সুতারিয়া জানান, তাঁর ডিসক্যালকুলিয়া আছে
ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে

গণমাধ্যমে নিজের অর্থনৈতিক বিষয়–আশয় সম্পর্কে কথা বলার সময় তারা সুতারিয়া জানান, তাঁর ডিসক্যালকুলিয়া আছে। এটি একটি লার্নিং ডিসঅ্যাবিলিটি (শেখার অক্ষমতা)। এই অক্ষমতা গাণিতিক বিষয় শেখা, বোঝা ও ব্যবহারিক প্রয়োগের সঙ্গে সম্পর্কিত।

সুতারিয়া বলেন, ‘আমি ভাগ্যবান যে আমার বাবা আমাকে আমার আর্থিক বিষয়গুলো সামলাতে সাহায্য করেন।’

আর্থিক বিষয়গুলো যতটা সম্ভব সুতারিয়া নিজেই সামলানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু ডিসক্যালকুলিয়ার কারণে প্রায়ই কোনো না কোনো ভুলও করে ফেলেন। তাঁর বাবা ও অ্যাকাউন্টস টিম তাঁকে এসব বিষয় পরিচালনা করতে সাহায্য করেন।

ডিসক্যালকুলিয়া আদতে কী

একজন সুস্থ-স্বাভাবিক ব্যক্তি মাঝেমধ্যে হিসাব-নিকাশে ভুল করতে পারেন। শিশু–কিশোরেরাও মাঝেমধ্যে গণিতের হোমওয়ার্কে বা পরীক্ষার খাতায় হিসাব মেলাতে সমস্যায় পড়তে পারে। এসবই স্বাভাবিক বিষয়।

তবে কেউ যদি অন্যান্য বিষয়ে দক্ষ হন, কেবল গাণিতিক বিষয়গুলোই বারবার গড়বড় করে ফেলেন, তাহলে এর একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে ডিসক্যালকুলিয়া। সাধারণত শৈশবেই এর লক্ষণ দেখা দেয়। তবে এ সম্পর্কে মানুষের ধারণা কম।

শিশু–কিশোরেরাও মাঝেমধ্যে গণিতের হোমওয়ার্কে বা পরীক্ষার খাতায় হিসাব মেলাতে সমস্যায় পড়তে পারে, যা স্বাভাবিক
ছবি: পেক্সেলস

প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও দৈনন্দিন জীবনের কোনো ক্ষেত্রে (যেমন বাজার করা, টাকার হিসাব, সময়ের মধ্যে পৌঁছানো) এর প্রভাব থেকে যায়।

ডিসক্যালকুলিয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা এখনো সম্পূর্ণ নিশ্চিত নন। মস্তিষ্কের বিকাশ, জিনগত বিষয়, গর্ভে থাকাকালীন মায়ের অ্যালকোহল গ্রহণ, অপরিণত বয়সে বা কম ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণ কিংবা মস্তিষ্কে আঘাতের সঙ্গে ডিসক্যালকুলিয়ার সম্পর্ক থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়।

আরও পড়ুন

ডিসক্যালকুলিয়ার উপসর্গ

স্কুলে যাওয়ার বয়স হওয়ারও আগে থেকে এর কিছু উপসর্গ দেখা দিতে পারে। বয়সভেদে উপসর্গগুলো হতে পারে ভিন্ন।

  • গণনায় ক্রম হারিয়ে ফেলা।

  • সমবয়সীরা আঙুল গুনে হিসাব করা ছেড়ে দিলেও অনেক দিন পর্যন্ত আঙুলে গুনে হিসাব করা।

  • না গুনে অল্পসংখ্যক বস্তু দেখে কতটি আছে, তা বুঝতে না পারা (বয়সের সঙ্গে সঙ্গে শেখানোর পরও)।

  • শেখানোর পরও সংখ্যার মৌলিক ধারণা তৈরি না হওয়া (যেমন ৮ যে ৬-এর চেয়ে বড়, তা সহজে বুঝতে না পারা)।

  • যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগের মতো মৌলিক বিষয় শিখতে সমস্যা হওয়া।

  • উল্টো দিক থেকে গণনা করতে অতিরিক্ত কষ্ট হওয়া।

  • কোনো কিছুর পরিমাণ বের করতে অতিরিক্ত ঝক্কিতে পড়া।

  • সংখ্যা (১) এবং তার শব্দ (এক) বুঝতে সমস্যা হওয়া।

  • গণিতের লিখিত প্রশ্ন বুঝতে সমস্যা হওয়া।

  • শেখানোর পরও ভগ্নাংশ ও দশমিকের মানের পরিবর্তন বুঝতে অতিরিক্ত সমস্যা হওয়া।

  • শেখানোর পরও গ্রাফ, চার্ট, সময় বা ঘড়ি বুঝতে অতিরিক্ত সমস্যা হওয়া।

  • বয়স অনুযায়ী টাকাপয়সার সাধারণ হিসাব রাখতে বা খুচরা আদান–প্রদানে সমস্যা হওয়া কিংবা প্রয়োজনীয় ফোন নম্বর মনে রাখতে অসুবিধায় পড়া।

  • গণিত বা সংখ্যা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তা বা আতঙ্ক অনুভব করা। এমনকি বমি বমি ভাব, বমি করা, ঘাম হওয়া বা পেটব্যথার মতো শারীরিক লক্ষণও দেখা দিতে পারে।

ডিসক্যালকুলিয়া থাকলে বয়স অনুযায়ী টাকাপয়সার সাধারণ হিসাব রাখতে বা খুচরা আদান–প্রদানে সমস্যা হতে পারে
ছবি: প্রথম আলো

সঙ্গে আরও যা থাকতে পারে

  • মনোযোগের অভাব

  • ডিসলেক্সিয়া (পড়ালেখার স্বাভাবিক ক্ষমতা না থাকা)

  • অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার

  • নন-ভার্বাল লার্নিং (কথা ছাড়াও শেখার অন্যান্য পদ্ধতি–সংক্রান্ত) ডিজঅর্ডার

  • ডিসগ্রাফিয়া (হাতের লেখার অস্বাভাবিকতা)

  • দুশ্চিন্তা বা বিষণ্নতা

আরও পড়ুন

করণীয়

ডিসক্যালকুলিয়ার উপসর্গ দেখা দিলে দৃষ্টি বা শ্রবণশক্তির কোনো সমস্যা আছে কি না, সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। শিশুদের ক্ষেত্রে পুরো বিষয়টা বুঝতে শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলাও জরুরি। দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি ও শেখার পরিবেশ অনুকূলে থাকা সত্ত্বেও সমস্যা থাকলে মনোরোগ–বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন যত দ্রুত সম্ভব।

ডিসক্যালকুলিয়ার নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নেই। তবে এটি শনাক্ত করে গণিত শেখানোর বিশেষ কৌশল ব্যবহার করা যায়, তাতে জীবন অনেকটা সহজ হয়।

ডিসক্যালকুলিয়ার মতো সমস্যা নিয়েও জীবনের পথে এগিয়ে চলেছেন তারা সুতারিয়া
ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে

শেষ কথা

রোজকার সাদামাটা গাণিতিক হিসাব–নিকাশে কেউ দুর্বল হলে তাকে কটাক্ষ করবেন না। গণনার সময় আঙুল বা কাগজ ব্যবহারের প্রয়োজন হতেই পারে। প্রতিটি ব্যক্তিরই নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য, গুণ বা প্রতিভা আছে। ডিসক্যালকুলিয়ার মতো সমস্যা নিয়েও যেমন জীবনের পথে এগিয়ে চলেছেন তারা সুতারিয়া।

সূত্র: ওয়েবএমডি ও টাইমস অব ইন্ডিয়া

আরও পড়ুন