পাবনার এই তরুণ ম্যাটসে পড়েছেন, যেভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হলেন
স্কুল পেরিয়ে কলেজ, তারপর বিশ্ববিদ্যালয়—এমন সোজাসাপটা স্বপ্নই তো দেখেন অধিকাংশ শিক্ষার্থী। ইমদাদুল হকের যাত্রাটা আলাদা। ২০১৩ সালে এসএসসি পাসের পর পারিবারিক কারণেই দ্রুত একটা কোনো চাকরিতে ঢোকার তাড়া ছিল তাঁর। তাই ভর্তি হন পাবনা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের পুরকৌশল বিভাগে। এক দুলাভাইয়ের পরামর্শে সিরাজগঞ্জের মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুলেও (ম্যাটস) ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছিলেন। সেখানে টিকে যাওয়ার পর পলিটেকনিক ছেড়ে ভর্তি হন ম্যাটসে। কিন্তু উচ্চশিক্ষার স্বপ্নটা তখনো মনে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছিল। এক বছর পর তাই সিরাজগঞ্জের রাজাপুর কলেজেও ভর্তি হয়ে যান ইমদাদুল। ম্যাটস আর উচ্চমাধ্যমিক—দুটার পড়াই চলে সমানতালে।
২০১৬ সালে এইচএসসি পাস করেন পাবনার এই তরুণ। ফল একেবারে খারাপ ছিল না। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেবেন, সেই সাহস হচ্ছিল না। ইমদাদুলের একাগ্রতা ও পরিশ্রম দেখে আশপাশের সবাই বলছিলেন, ‘চেষ্টা করো। তুমি পারবে।’ সেই ভরসাতেই ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করে দেন ইমদাদুল। হাতে সময় ছিল না একদম। তাই দিন-রাত পড়তে হয়েছে। ঈদের দিনেও বইয়ে মুখ ডুবিয়ে থেকেছেন। শেষ পর্যন্ত ভর্তির সুযোগ পেয়ে গেছেন স্বপ্নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
তত দিনে ম্যাটসের পড়াশোনাও শেষ হয়েছে। কিন্তু মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে ক্যারিয়ার না গড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বেছে নিলেন কেন? ইমদাদুল বলেন, ‘ম্যাটস থেকে পড়াশোনা শেষে বুঝতে পারলাম, স্বাস্থ্যসেবা খাতে ক্যারিয়ার গড়ার প্রতি আমার খুব একটা টান নেই। পেশাটি নিশ্চয়ই সম্মানজনক, কিন্তু আমি সেই পরিবেশে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতাম না। ভাষা, সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চার প্রতি আমার আগ্রহ ছিল আরও গভীর। এ ছাড়া ম্যাটস থেকে উচ্চশিক্ষার সুযোগও সীমিত। তাই ভবিষ্যতের কথা ভেবে এই সেক্টর থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিই। ফরাসি ভাষা শেখা তো শুধু নতুন দক্ষতা অর্জন নয়। বরং নতুন সংস্কৃতি, চিন্তাধারা ও ইতিহাস জানার একটা সুযোগ।’
সুযোগটা কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন ইমদাদুল। প্রথম বছরে আর্থিক টানাপোড়েনের কারণে বেশ ভুগতে হয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় বর্ষে সেন্টার ফর জাকাত ম্যানেজমেন্ট এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন থেকে বৃত্তি পাওয়ার পর মনোযোগের পুরোটাই পড়াশোনায় ঢেলে দেন। সঙ্গে ফরাসি ভাষার শিক্ষক হিসেবেও কাজ শুরু করেন বিভিন্ন জায়গায়, যা ধীরে ধীরে বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়ে। কাজটি দারুণ উপভোগ করছিলেন ইমদাদুল। ফলে ভাষাটি আয়ত্ত করা তাঁর জন্য আরও সহজ হয়ে যায়, একাডেমিক ফলাফলেও যার ছাপ পড়ে।
ভালো ফল নিয়ে পাস করার কারণে আর বসে থাকতে হয়নি ইমদাদুল হককে। একটি স্কুল ও কলেজে ফরাসি ভাষার শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। এরই মধ্যে সুযোগ আসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকতার। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও পান একই সুযোগ। কিন্তু ইমদাদুল একটা পূর্ণকালীন সুযোগ খুঁজছিলেন। অবশেষে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসে (বিইউপি) প্রভাষক পদে যোগ দিয়ে তাঁর সেই স্বপ্ন পূরণ হয়। এখন বিইউপিতে সেন্টার ফর মডার্ন ল্যাঙ্গুয়েজের অধীনে ফরাসি ভাষার প্রভাষক হিসেবে যুক্ত আছেন তিনি।
ইমদাদুল বলেন, ‘লক্ষ্য বদল হওয়া কখনো কখনো স্বাভাবিক। প্রয়োজনীয়ও। সময়ের সঙ্গে অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি ও পছন্দ বদলায়। বাস্তবতা ও পরিস্থিতিই আপনাকে লক্ষ্য পরিবর্তনে বাধ্য করবে। আমার পারিবারিক অবস্থা তখন দুর্বল ছিল, দ্রুততম সময়ের মধ্যে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্ব ছিল। সে কারণেই মাঝেমধ্যে লক্ষ্য পরিবর্তন করতে হয়েছে। সুনির্দিষ্টভাবে কোনো পেশাগত লক্ষ্য আগে থেকে ঠিক করিনি। আমার মূল ইচ্ছা ছিল, উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া ও জ্ঞানের পরিধি বাড়ানো। তবে যখন ফরাসি ভাষায় দক্ষ হতে লাগলাম, তখন অনুভব করলাম এই ভাষা শেখানোতে আমার আগ্রহ ও সক্ষমতা দুটোই আছে। তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম—শিক্ষক হব।’
এখন শিক্ষকতা বেশ উপভোগ করছেন এই তরুণ। বললেন, ‘শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমি অনেক কিছু শিখেছি, প্রতিনিয়ত শিখছি। ফরাসি ভাষা পড়ানোর সময় তাদের মধ্যে নতুন বিষয়গুলোর প্রতি আগ্রহ তৈরি করা চ্যালেঞ্জিং হলেও আনন্দদায়ক।’
ভবিষ্যতে ভাষা শিক্ষাক্ষেত্রে নিজের কিছু পরিকল্পনার কথাও জানালেন ইমদাদুল, ‘আমি চাই ভাষা শিক্ষাকে আরও কার্যকর, সহজ ও আনন্দদায়ক করতে। শিক্ষার্থীরা যেন শুধু পরীক্ষার জন্য নয়, বাস্তব জীবনে ভাষা ব্যবহার করতে শেখে, সে লক্ষ্যে কাজ করতে চাই। এ ছাড়া ফরাসি ভাষা শেখার সুযোগ বাংলাদেশে এখনো সীমিত। তাই আমি এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে চাই, যেখানে শিক্ষার্থীরা অনলাইন-অফলাইন দুই মাধ্যমেই মানসম্মত ভাষাশিক্ষা নিতে পারবে। বিশেষ করে যারা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল কিন্তু ভাষা শিখতে আগ্রহী, তাদের জন্য বিনা মূল্যে বা স্বল্প খরচে শেখার সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা আছে।’