রিকশাচালকের ১০০ টাকা উপহার, অভিনেতার বিস্ময়

ঢাকার উত্তরায় অভিনয়শিল্পী জামিল হোসেনকে ১০০ টাকা দেওয়ার সময় রিকশাচালকছবি : ভিডিও থেকে

ঢাকার উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টরে নতুন একটি নাটকের শুটিং করছিলেন জামিল হোসেন। এমন সময় পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন এক রিকশাচালক। জামিলকে দেখে তিনি রিকশা থামান। ইউনিটের একজনকে অনুরোধ করেন জামিলকে ডেকে দেওয়ার জন্য। রিকশাচালক জানান, জামিলের সঙ্গে কথা বলতে চান। কারণ, তাঁর অভিনয় ভালো লাগে। এরপর জামিল কাছে এলে কথা বলেন। একপর্যায়ে জামিলের হাতে ১০০ টাকা গুঁজে দিয়ে বলেন, অভিনয় ভালো লাগে, তাই টাকাটা দিয়েছেন তিনি। এই টাকা দিয়ে যেন জামিল যেন চা-নাশতা করেন! আজ বৃহস্পতিবার সকালে শুটিংয়ে ঘটে যাওয়া এমন ঘটনায় হতবাক হয়ে যান জামিল হোসেন।

ভারতের জি বাংলার জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো ‘মীরাক্কেল আক্কেল চ্যালেঞ্জার্স’ দিয়ে পরিচিতি পান বাংলাদেশের জামিল হোসেন। এরপর একটা সময় অভিনয়ে মনোযোগী হন তিনি। কয়েক বছরের অভিনয়জীবনে রিকশাচালকের কাছ থেকে পাওয়া ১০০ টাকা এখন পর্যন্ত শ্রেষ্ঠ উপহার হিসেবেই দেখছেন জামিল হোসেন।

অভিনেতা জামিল হোসেন
ছবি : ফেসবুক থেকে

জামিল জানান, অঞ্জন আইচের ‘অভাবী বাড়িওয়ালা’ নাটকের দ্বিতীয় দিনের শুটিং করছিলেন তাঁরা। এক ঘণ্টার এই নাটকে আরও অভিনয় করছেন জারা নুর, মিলি বাসার, মাসুম বাসার প্রমুখ। প্রথম আলোকে জামিল বলেন, ‘উত্তরার আনন্দবাড়ি শুটিং হাউসের সামনের রাস্তায় আমরা শুটিং করছিলাম। রিকশাচালক সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় ঘুরে আসেন। শুটিং ইউনিটের একজনকে আমাকে দেখিয়ে বলেন, “ওকে ডাকো। আমি কথা বলব। কথা বলার সুযোগ করে দাও।” “শট শেষ হোক, পরে ডাকছি” বলার পর রিকশাচালক বলেন, “এখনই ডাকো।” হঠাৎ করে রিকশা টান দিয়ে তিনি শুটিং জোনের মধ্যে ঢুকে পড়েন। এরপর তিনিই আমাকে ডাকেন, “এদিকে আসো।” আমি বলি, আরে আল্লাহ, এদিকে আসো মানে? কাছে গিয়ে বললাম, জি ভাই, বলেন। এরপর দেখি তাঁর পকেট থেকে সব টাকা বের করেছেন। খুচরা যত টাকা আছে, সবসহ। ওখান থেকে আমাকে ১০০ টাকার একটা নোট বের করে দিলেন। বললেন, “ধরো এটা। চা খাইয়ো। তোমার অভিনয় আমার ভালো লাগে। এই টাকা রাখো।” আমি তো হতবাক।’

জামিল হোসেন
ছবি: ফেসবুক থেকে

জামিল বলেন, ‘আজ দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঘটনাটি ঘটেছে। টাকা দিয়েই রিকশাচালক আর থাকেননি বেশিক্ষণ। চলে গেছেন। নামও বলেননি। এত দ্রুত সবকিছু ঘটছিল, আমি নিজেই অবাক হয়ে পড়ি। আমার ইউনিটের একজন আবার পুরো ঘটনার ভিডিও করে রেখেছিলেন। আমি তো টাকা নিতে থতমত খাচ্ছিলাম। আসলে টাকা নেব কি নেব না, বুঝতে পারছিলাম না। পরিচালক আমাকে ইশারা করলেন। এরপর নিলাম। পরে তিনি বললেন, এসব ভালোবাসা।’

পুরো ঘটনায় জামিল কী বলবেন, বুঝে উঠতে পারছিলেন না। তারপরও বলেন, ‘একজন রিকশাচালকের ঘাম-শ্রমের টাকা থেকে ১০ টাকা–২০ টাকা হলে কথা ছিল; ১০০ টাকা দিয়ে চলে গেলেন! এই ভালোবাসা আসলে কীভাবে প্রকাশ করব, জানি না। এটাকে কি শুধুই ভালোবাসা বলব, নাকি আবেগ বলব, কিছুই বুঝতে পারছি না! এটা আমার জীবনের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সেরা মুহূর্ত। দেশে-বিদেশে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গেছি। নানা মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। অনেক ধরনের উপহারও পেয়েছি। যত উপহার পেয়েছি, যত সুন্দর মুহূর্ত জীবনে এসেছে, এটাই সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত। একজন শ্রমজীবী মানুষ, এত কষ্টের পরিশ্রমের টাকা তাঁর, সেখান থেকে ১০০ টাকা আমাকে দিয়ে দিলেন, এটাতে হতবাক হওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। আমি এই টাকা যত্ন করে রেখ দেব আজীবন।’

অভাবী বাড়িওয়ালা নাটকের শুটিংয়ে অভিনয়শিল্পী জারা নুরের সেলফিতে পরিচালক অঞ্জন আইচ (মাঝে) ও জামিল হোসেন

কথা প্রসঙ্গে জামিল বলেন, ‘ইদানীং কেউ কেউ বলে থাকেন, নাটক–সিনেমা মানুষ দেখে না। আমি তাঁদের বলতে চাই, এসব ফালতু কথা। মানুষ নাটক–সিনেমা দেখে বলেই এমন অসাধারণ সব মুহূর্ত তৈরি হয়। আমাদের নাটক যে মানুষ দেখে, এটা তার একটা জ্বলন্ত উদাহরণ।’ জামিল বলেন, ‘কদিন আগে আমি একটি নাটকে একজন রিকশাচালকের চরিত্রে অভিনয় করেছি। হয়তো সেই চরিত্র ওই রিকশাচালককে স্পর্শ করেছে। এর আগেও এমন একটা চরিত্রে অভিনয় করেছি। হয়তো এই ভদ্রলোক চা–দোকানে বসে সেই নাটক দেখেছেন, তাঁর ভালো লেগেছে। চরিত্র আর গল্প যখন দর্শকের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারে, তখন নাটক মানুষের মনকে স্পর্শ করে। আর এমন মুহূর্ত হয়তো তৈরি হয়।’