কে এই রিচার, কেন তাঁকে নিয়ে এত আলোচনা

‘রিচার’ সিরিজে অ্যালান রিটসন। আইএমডিবি

আপাদমস্তক বোহেমিয়ান। তবে তিনি ঠিক হিমু নন। আগে ছিলেন মিলিটারি পুলিশের মেজর। অবসর নিয়ে বেছে নিয়েছেন ভবঘুরে জীবন। নিজের গাড়ি–বাড়ি নেই, ফোনও সেভাবে ব্যবহার করেন না। এ শহর, ও শহর ঘুরে বেড়ান। মন না টিকলে চড়ে বসেন বাসে, গন্তব্য নতুন শহর। কখনো হিচহাইকিং করেন। তবে তাঁর জীবন নির্বিবাদ নয়, মাঝেমধ্যেই জড়িয়ে পড়েন বড়সড় ঝামেলায়।

একনজরে
সিরিজ: ‘রিচার ৩’
ধরন: অ্যাকশন থ্রিলার
স্ট্রিমিং: অ্যামাজন প্রাইম ভিডিও
পর্ব সংখ্যা:
রানটাইম: ৪২-৫৬ মিনিট
ক্রিয়েটর: নিক স্যান্তোরা
অভিনয়ে: অ্যালান রিটসন, মারিয়া স্টেন, অলিভার রিচটার ও  ব্রায়ান টি

এসব ঝামেলার পেছনে কখনো থাকে তাঁর ‘অতীত জীবন’। তিনি রিচার, মেজর জ্যাক রিচার। তাঁকে নিয়ে নির্মিত সিরিজ ‘রিচার’-এর তৃতীয় মৌসুমের প্রথম পর্ব মুক্তি পেয়েছিল গত ২০ ফেব্রুয়ারি। মুক্তির পরই অ্যামাজন প্রাইম ভিডিওর সিরিজের তালিকায় শীর্ষে উঠে এসেছে সিরিজটি। ২৭ মার্চ এসেছে সিরিজটির শেষ পর্ব। কেমন হলো ‘রিচার’-এর তৃতীয় মৌসুম?

ব্রিটিশ লেখক লি চাইল্ডের উপন্যাসের চরিত্র জ্যাক রিচার। জনপ্রিয় এ চরিত্র নিয়ে এ পর্যন্ত ৩০টির মতো উপন্যাস লিখেছেন চাইল্ড। এ সিরিজ উপন্যাস অবলম্বনেই নির্মিত হয়েছে অ্যামাজনের সিরিজটি। এই রিচার নামটি সিনেমাপ্রেমীদের চেনা মনে হতে পারে। কারণ, একই উপন্যাস থেকে রিচারকে নিয়ে দুটি সিনেমা তৈরি হয়েছিল। যে দুই সিনেমায় রিচার হয়েছিলেন টম ক্রুজ এবং পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছিলেন।

‘রিচার’ সিরিজের দৃশ্য। আইএমডিবি

টম ক্রুজের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অন্যতম বড় ব্যর্থতা চরিত্রটি ফুটিয়ে তুলতে না পারা। লেখক লি চাইল্ড অবশ্য মনে করেন, এ চরিত্রে তাঁকে নির্বাচনই ছিল বড় ভুল। কারণ, প্রায় সাড়ে ছয় ফুটের দীর্ঘদেহী রিচারের সঙ্গে টমের কোনো মিলই নেই। তাই টম ক্রুজ অভিনীত ‘জ্যাক রিচার’ ও ‘রিচার নেভার গো ব্যাক’ যখন ডাহা ফ্লপ হয়, তখন এ চরিত্র অবলম্বনে সিনেমা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তখনই এগিয়ে আসে অ্যামাজন। ২০২২ সালে রিচার-এর প্রথম মৌসুম মুক্তির পরই সুপারহিট হয়, সেটা এতটাই যে একই সঙ্গে পরের তিন মৌসুম নিশ্চিত করে প্ল্যাটফর্মটি।

এবারের গল্প শুরু হয় এক ধনকুবেরের কলেজপড়ুয়া সন্তানকে অপহরণের চেষ্টা দিয়ে। রিচার অকুস্থলেই ছিলেন, ধনকুবেরের সন্তানকে বাঁচান। এরপর হাজির হন সেই ধনকুবেরের বাড়িতে। আস্থা অর্জন করে সেই ধনকুবেরের সন্তানের দেহরক্ষী হিসেবে নিয়োগ পান। পরে জানা যায়, এটা আসলে এফবিআইয়ের পরিকল্পনার অংশ। বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে রিচারকে ধনকুবেরের বাড়িতে পাঠিয়েছে সংস্থাটি।

‘রিচার ৩’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

তবে রিচার সংস্থার উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে নয় গেছে নিজের উদ্দেশ্য হাসিলকে। সেই ধনকুবেরের গডফাদার কুখ্যাত অস্ত্র চোরাকারবারি জেভিয়ার কুইন আবার রিচারের পুরোনো শত্রু। কুইনও একসময় সেনাবাহিনীতে ছিল। তাঁর কুখ্যাতি ধরে ফেলায় রিচারের এক অধীনস্থ কর্মকর্তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে সে। রিচারও গুলি চালায়। কিন্তু এত দিন রিচার জানতে পারে, তাঁর গুলিতে কুইন মরেনি। ভোল পাল্টে ভিন্ন শহরে নিজের চোরাকারবার চালিয়ে যাচ্ছে সে। ধনকুবেরের বাড়িতে রিচার আসলে গেছে কুইনের হদিস পেতেই। কিন্তু এবার কি রিচার পারবেন কুইনকে মারতে? এমন রহস্য নিয়ে এগিয়ে যায় গল্প।

গল্প, নির্মাণ মিলিয়ে প্রথম মৌসুমে অনেকে প্রশংসিত সিরিজ ‘ট্রু ডিটেকটিভ’-এর ছায়া খুঁজে পেয়েছিলেন ‘রিচার’-এ। সিরিজটি হিট হওয়ার বড় কারণ ছিল রিচার চরিত্রে অ্যালান রিটসনের অভিনয়। আগে বেশ কিছু কাজ করলেও সিরিজটি দিয়েই তারকা বনে গেছেন তিনি। প্রথম মৌসুমের মতো, দ্বিতীয় প্রশংসিত হলেও ‘রিচার ২’ যেন পুরোপুরি জমেনি। তবে তৃতীয় মৌসুমে এসে নির্মাতারা যেন কক্ষপথে ফিরেছেন।
প্রতি সপ্তাহে ওটিটিতে মুক্তি পাওয়া নানা ঘরানার থ্রিলার সিরিজের মধ্যে ‘রিচার’ খুব বিশেষ কিছু নয় তবে এই সিরিজের একটা আলাদা আকর্ষণ আছে, সেটা রিচারের ব্যক্তিত্বের কারণেই।

‘রিচার’ সিরিজের দৃশ্য। আইএমডিবি

রিচার অ্যাকশন দক্ষতা আর বুদ্ধির মিশেলে তৈরি এক ব্যক্তিত্ব; তিনি সব বড় চ্যালেঞ্জ উতরে যাবেন, সেটাও জানা কথা। তবে নির্মাতারা পর্দায় সেটা কীভাবে দেখাচ্ছেন, সেটাই আসল। এবারের মৌসুমে নির্মাতা সেটা ভালোভাবেই পেরেছেন। আগের মৌসুমে রহস্য বেশি ছিল, এবার রহস্য কম থাকলেও চিত্রনাট্য ছিল জমাটি। কুইন ছাড়াও রিচারকে চ্যালেঞ্জ জানাতে ছিলেন বিশালদেহী এক দেহরক্ষী। তাঁর সঙ্গে রিচারের দ্বৈরথও ছিল দেখার মতো। শেষ পর্বে দুজনের দীর্ঘ অ্যাকশন দৃশ্য আছে, বাগান, ঘর, সমুদ্র, রাস্তা হয়ে সেটা শেষ হয় ঘরে। হ্যান্ড টু হ্যান্ড ফাইট, বুদ্ধির প্রয়োগ মিলিয়ে দারুণভাবে কোরিওগ্রাফ করা হয়েছে দৃশ্যটি।

রিচার প্রতি পর্বেই মাসুদ রানার মতো একজনের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই প্রেমিকা হন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার কেউ। এবারও ডিইএ এজেন্ট সুজান ডাফির সঙ্গে প্রণয়ে জড়ান। প্রতি পর্বে তাদের রসায়নও ভালো জমেছে।
‘রিচার’-এর আগের দুই পর্বে মনে রাখার মতো কয়েকটি সংলাপ ছিল, তবে এবারের মৌসুমের কোনো সংলাপই সেভাবে দাগ কাটেনা। এক ডিইএ এজেন্টকে মেরে অপরাধী পালানোর দৃশ্যটিও ক্লিশে।

‘রিচার’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

অভিনয়ে অবশ্যই কেউই খামতি রাখেননি। রিচার চরিত্রে বরাবরের মতোই দুর্দান্ত রিটসন, নিষ্ঠুর খুনি জেভিয়ার কুইন চরিত্রে ব্রায়ান টিও বেশ ভালো। আর রিচারের বড় প্রতিদ্বন্দ্বী বিশালদেহী দেহরক্ষী চরিত্রের অলিভার রিচটার ভয় পাওয়ানোর মতোই অভিনয় করেছেন।

আরও পড়ুন

‘রিচার’ সিরিজে নিগলির হাজির হওয়ার মানেই স্বস্তি। খাবার প্রীতি, রসিকতা আর দুর্দান্ত অ্যাকশন মিলিয়ে রিচারের সাবেক এই সহকর্মীটির আলাদা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে। তিন মৌসুমেই নিগলি চরিত্রটি করছেন মারিয়া স্টেন। বরাবরের মতোই দুর্দান্ত তিনি। দর্শকদের এর মধ্যেই জেনে যাওয়ার কথা নিগলি চরিত্রটিকে নিয়ে আলাদা স্পিন-অফ সিরিজ নিয়ে আসছে অ্যামাজন।
রহস্য, রোমাঞ্চ আর অ্যাকশন মিলিয়ে ‘রিচার ৩’ তাই একবার দেখার মতো সিরিজ অবশ্যই, পরের মৌসুমের অপেক্ষা করাই যায়।