কলকাতার দাঙ্গাই যেন বদলে দেয় নায়ক রাজ্জাকের জীবন
বেঁচে থাকলে আজ ৮৩ বছর পূর্ণ করতেন নায়করাজ রাজ্জাক। সন্তান ও নাতি–নাতনিদের উদ্যোগে মহাধুমধামে উদ্যাপন করা হতো তাঁর জন্মদিন। দিনটিতে হয়তো সন্ধ্যার পর গুলশানের লক্ষ্মীকুঞ্জে বসত তারার মেলা। শুভেচ্ছা ও শুভকামনা জানাতে ছুটে আসতেন সমসমায়িক ও অনুজ সব তারকা। রাজ্জাকও হাসিমুখে সবার অভিনন্দন গ্রহণ করতেন। নিতেন সবার খোঁজখবর। কাটা হতো কেক। ফুলের তোড়ায় ঘিরে থাকত তাঁর চারপাশ। হাসি–আনন্দে উদ্যাপন করা হতো বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের সব সময়ের সেরা নায়কদের অন্যতম নায়করাজ রাজ্জাকের জন্মদিন।
অথচ ষাটের দশকে তাঁর অভিনয়ের শুরুটা হয়েছিল, ছোট্ট একটা চরিত্র দিয়ে। কেউ ভাবতে পারেননি, সময়ের পরিক্রমায় অভিনয়ের আকাশের উজ্জ্বল তারা হয়ে জ্বলজ্বল করবেন তিনি। মৃত্যুর আট বছর পরও চলচ্চিত্রের মানুষটা চলচ্চিত্র–সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আড্ডায় নানাভাবে ঘুরেফিরে আসেন।
রাজ্জাকের অভিনয়জীবনের শুরুটা একেবারে ছোট চরিত্র দিয়ে, সিনেমার ভাষায় যাকে বলে ‘এক্সট্রা’। ১৯৫৮ সালে কলেজে পড়ার সময় তিনি প্রথম চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান। অজিত ব্যানার্জির ‘রতন লাল বাঙালি’ নামের সেই ছবির মূল চরিত্রে অভিনয় করেন আশিস কুমার ও নায়িকা সন্ধ্যা রায়। রাজ্জাক অভিনীত ছোট্ট চরিত্রটি ছিল পকেটমার। তৃতীয় ছবি ‘শিলালিপি’। এখানেও তাঁর চরিত্রটি ছিল সেই অর্থে নগণ্য। একটি গানের দৃশ্যে অতিরিক্ত শিল্পী হিসেবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। অবশ্য সেবার সম্মানী পেয়েছিলেন ২০ টাকা।
তৃতীয় ছবি ‘শিলালিপি’র ২০ টাকার সম্মানী রাজ্জাকের আস্থা আর উৎসাহ আরও বাড়িয়ে দেয়। অবশ্য তিনি বুঝেছিলেন, টালিগঞ্জে (পশ্চিম বাংলার চলচ্চিত্রশিল্পের মূল কেন্দ্র) সুবিধা করতে পারবেন না। ‘এক্সট্রা’ হয়েই থাকতে হবে। নিলেন নতুন চ্যালেঞ্জ। চলে গেলেন মুম্বাই (তখনকার বোম্বে)।
১৯৫৯ সালে কলকাতার রাজ্জাক অভিনয় শিখতে মুম্বাই যান। নায়ক হতে গিয়ে ভর্তি হন অভিনয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ফিল্মালয়ে। তখন ওখানে ক্লাস নিতেন দিলীপ কুমার, শশধর মুখার্জিরা। শুধু চঞ্চলতা আর অস্থিরতার কারণে এক বছরের সেই কোর্সের তাত্ত্বিক, পদ্ধতিগত শিক্ষায় রাজ্জাকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। মুম্বাইয়ের চিত্রজগতে ঢোকার সুযোগ খুঁজতে থাকেন, কিন্তু বিষয়টি শুধু কঠিন নয়, অসম্ভবই ছিল।
প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া তেমন একটা করেননি রাজ্জাক। ব্যবসা, চাকরি—কোথাও থিতু হননি। কারণ একটাই, নায়ক হতে চেয়েছিলেন রাজ্জাক। ঢাকায় এসে সেই ল্যাম্পপোস্টের পাশে আশ্রয় নেওয়া রাজ্জাক একসময় উত্তরায় বাণিজ্যিক ভবন, গুলশানে বাড়ি করেছেন। এ অর্জন সহজে ধরা দেয়নি। নিজের মেধা, প্রতিভার সবটুকু ঢেলে দিয়ে পরিশ্রম করে তিলে তিলে তৈরি করেছেন। এক্সট্রা থেকে হয়েছেন নায়ক, ঢাকাই চলচ্চিত্রশিল্পের রাজা। হয়েছিলেন নায়করাজ। শুধু অভিনয়ের জন্য জীবনে যত ঝড়ঝাপটা আসুক, নিজের স্বপ্নটাকে হারিয়ে যেতে দেননি।
কলকাতার নাকতলা এলাকার জমিদার বংশের সন্তান রাজ্জাক। তিন ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। সচ্ছল-সুখী পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। খামখেয়ালিতে পড়াশোনায় মন বসেনি। স্কুলজীবনে শুরু মঞ্চে অভিনয়। পাড়ি জমান তৎকালীন বম্বেতেও, কিন্তু ভাগ্য সহায় হয়নি। ১৯৬২ সালের কোনো একদিন কলকাতার বাঁশদ্রোণী এলাকায় দেখা খায়রুন্নেসার সঙ্গে, যিনি রাজ্জাকের জীবনে ‘লক্ষ্মী’ হয়ে এসেছিলেন। একদিন তাঁকে করলেন বিয়ে, তখন সবে ২০-এর যুবক রাজ্জাক। বছর পার না হতেই জন্ম হয় পুত্রসন্তানের। এর এক বছর পর কলকাতায় বাধে দাঙ্গা। সে ঘটনা কালো অধ্যায় হলেও রাজ্জাকের জীবনে এই দাঙ্গাই যেন নতুন রাস্তা খুলে দিয়েছিল।
দাঙ্গার কারণে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, আসাম, ত্রিপুরা থেকে দলে দলে মুসলমানেরা পাড়ি দেয় তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে। রাজ্জাকও স্ত্রী লক্ষ্মী ও শিশুপুত্র বাপ্পাকে নিয়ে দাঙ্গার সময়ে ঢাকায় আসেন। ১৯৬৪ সালের ২৬ এপ্রিল রাজ্জাক ঢাকায় পৌঁছান। স্ত্রী ও পুত্রকে নিয়ে ওঠেন ৮০ টাকা মাসিক ভাড়ায় কমলাপুরের একটি বাসায়।
রাজ্জাকের জীবনটাই ছিল সিনেমার গল্পের মতো। তিনিও বলতেন, ‘আমার জীবনটাই একটা সিনেমা...।’ নানা সময়ের সাক্ষাৎকারে রাজ্জাক জানিয়েছিলেন, একটা সময় ফার্মগেট এলাকায় থিতু হয়েছিলেন দুই সন্তান আর স্ত্রী লক্ষ্মীকে নিয়ে। তখন জীবিকা নির্বাহের জন্য টিভি নাটকে অভিনয় করতেন। অভিনয় করে সপ্তাহে পেতেন ৬০ থেকে ৬৫ টাকা। মাসের খরচ ৬০০ টাকা। রাজ্জাক বলেছিলেন, ‘অল্প আয়ে সংসারের খরচ চলে না। বাচ্চাদের দুধ জোগাড় করতেই সব টাকা ব্যয় হয়ে যেত। ওই সময় স্বামী-স্ত্রী দুজন মাঝেমধ্যে উপোসও করতাম। পয়সার অভাবে ফার্মগেট থেকে ডিআইটি টিভি কেন্দ্রে হেঁটে যাতায়াত করতাম।’
একদিন চলচ্চিত্রের অভিনয়ের একটা সুযোগ এল রাজ্জাকের। ১৯৬৫ সালে, ‘আখেরি স্টেশন’ ছবিতে সহকারী স্টেশনমাস্টারের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। ঢাকার ছবিতে ওটিই রাজ্জাকের প্রথম অভিনয়। এরপর আরও বেশ কয়েকটি ছবিতে ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয় করেন। যেমন ‘কার বউ’ ছবিতে অটোরিকশাচালক (বেবিট্যাক্সি ড্রাইভার), ‘১৩ নম্বর ফেকু ওস্তাগার লেন’-এ পাড়ার ছেলে মিন্টু, ‘ডাকবাবু’–তে আদালতের কর্মচারী, ‘কাগজের নৌকা’য় বাইজিবাড়ির মাতাল। একসময় পরিচয় হয় জহির রায়হানের সঙ্গে। তিনি রাজ্জাককে ‘বেহুলা’ ছবিতে নেন। ওই ছবি সাইনিং মানি হিসেবে ৫০০ টাকা নগদ পেয়েছিলেন। সেই টাকার কিছু অংশ সংসারের কাজে খরচ হয়। বাকি টাকা বন্ধুবান্ধবকে মিষ্টি খাইয়ে শেষ করেন রাজ্জাক।
১৯৬৬ সালে জহির রায়হানের ‘বেহুলা’ চলচ্চিত্রে লখিন্দরের চরিত্রে অভিনয় করে এককালের ‘এক্সট্রা’ রাজ্জাক রাতারাতিই পেয়ে যান তুমুল জনপ্রিয়তা। মুক্তির পর ছবিটি দারুণ ব্যবসায়িক সফলতা পায়। সেই সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের দর্শক গ্রহণ করে নেয় রাজ্জাককে। এই ছবি মুক্তির পর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি রাজ্জাককে। ঢাকা পেল নতুন এক তারকা। ষাটের দশকের প্রবল রাজনৈতিক উত্তেজনা, লোকছবির উত্থান, পাকিস্তানি ও অন্যান্য ছবির ভিড়েও কখনো লোকগাথাভিত্তিক ছবিতে, কখনো সামাজিক, আবার কখনো গণ-আন্দোলনভিত্তিক ছবিতে সমান স্বাচ্ছন্দ্যে নায়ক চরিত্র করে গেছেন রাজ্জাক। রাজ্জাক হয়ে ওঠেন ঢাকার ছবির ‘নতুন উত্তমকুমার’। তাঁর রোমান্টিকতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে দর্শককুল।
১৯৬৯ সালে কাজী জহিরের ‘মধু মিলন’ ছবি দিয়ে রাজ্জাক-শাবানা জুটির শুরু। ১৯৭২ সালে নির্মিত এ জুটির ‘অবুঝ মন’ ছবিটি দারুণ দর্শকপ্রিয়তা পায়। ‘অবুঝ মন’, ‘সাধু শয়তান’, ‘মাটির ঘর’, ‘দুই পয়সার আলতা’, ‘চাঁপা ডাঙ্গার বউ’, ‘সখী তুমি কার’, ‘অমর প্রেম’, ‘রজনীগন্ধা’এ জুটির উল্লেখযোগ্য ছবি।
বেঁচে থাকতে ২০১৬ সালে একবার রাজ্জাক তাঁর জীবনের গল্পটা শুনিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘সবার ভালোবাসা পেয়ে আজ আমি পরিপূর্ণ। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে অনেক সময় অর্ধাহারে দিন কেটেছে আমার। সপ্তাহে ৬৫ টাকা পেতাম টেলিভিশনে একটি অনুষ্ঠান করে, সেই ৬৫ টাকা দিয়ে আমার সংসার চলেছে। একটা সময় পর আমি “বেহুলা”র নায়ক হলাম। ৫০০ টাকা সাইনিং মানি নিয়ে খুশিতে বাড়ি এলাম। তারপরের কাহিনিটা অনেকেই জানেন।’
২০১৪ সালে প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাজ্জাক বলেছিলেন, ‘স্বাধীনতার আগে ৭ কোটি মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি, এখন ১৭ কোটির ভালোবাসা পাচ্ছি, সামনে ২০ কোটি মানুষের ভালোবাসা নিয়েই চলে যেতে চাই।’ রাজ্জাক মৃত্যুর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বাংলাদেশ ও বাঙালিদের সেই ভালোবাসায় ছিলেন। আজও তাঁর প্রতি ভালোবাসার কমতি নেই। ১৯৬৪ থেকে আমৃত্যু এ দেশের চলচ্চিত্রশিল্পকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করেছেন তিনি। সামাজিক ছবির সর্বজনপ্রিয় অভিনেতা যেমন ছিলেন, তেমনি ব্যক্তিগত জীবনেও অনুপ্রেরণা ও আদর্শবান একজন মানুষ ছিলেন। সমসাময়িক নায়কদের কাছেও তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিল দারুণ। পরের প্রজন্মের কাছে তো তিনি একজন আদর্শ। চলচ্চিত্র–সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশ ও বাংলাদেশি চলচ্চিত্র যত দিন থাকবে, রাজ্জাকের নাম উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়েই থাকবে।