
মেয়েটি তখন অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। লেখাপড়ায় ভালো। তবে তার মাথায় তত দিনে বাসা বেঁধেছে নাটকের পোকা। তো, ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ ক্যাম্পাসে বেড়ে ওঠা সেই মেয়েটি হঠাৎ একটি কাণ্ড করে বসল, বাবা-মাকে বলল, সে যদি অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পায় তবে তাকে ঢাকায় গিয়ে নাটক করতে দিতে হবে। মেয়ের মুখে এমন কথা শুনে সে সময় তার শিক্ষক বাবা-মা, যাঁরা ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, তাঁদের চক্ষু তো চড়কগাছ! তবে শেষমেশ তাঁরা মেয়ের শর্ত কবুল করলেন। অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পেল মেয়েটি। এরপর?
‘এরপর ঢাকায় এসে নাটক করা আর হয়নি। অনেক ছোট ছিলাম তো। তবে নাটকের প্রতি, মঞ্চের প্রতি কেমন যেন একটা টান অনুভব করতাম। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা অনুষ্ঠান, রবীন্দ্র কি নজরুলজয়ন্তীর নাট্যানুষ্ঠানে অংশ নিতাম। তখন ফাহ্মিদা খালাম্মা (সংগীতশিল্পী ফাহ্মিদা খাতুন) ছিলেন ক্যাম্পাসে। তাঁর তত্ত্বাবধানে নৃত্যনাট্য শ্যামাতে কাজ করেছি।’
সামিনা লুৎফা, নিত্রা নামে এখন যিনি নাট্যাঙ্গনে পরিচিত, আমরা শুনছি তাঁর গল্প, তাঁর ‘নাটকের মানুষ’ হয়ে ওঠার কাহিনি। ৫ অক্টোবর প্রথম আলো কার্যালয়ের ছোট্ট সভাকক্ষে বসে কথা বলছেন তিনি, আর তাঁর কথার ভেতর দিয়ে আমরা যেন দেখতে পাচ্ছি, সেদিনের সেই অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়েটি বড় হয়ে উঠছে, নাট্যমঞ্চের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে আস্তে আস্তে।
কিন্তু খনা নাটক রচনা ও এ প্রযোজনায় মধ্য দিয়ে যে নিত্রা প্রথম পাদপ্রদীপের আলোয় এলেন, ঢাকার মঞ্চে তাঁর শুরুটা অতটা কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। ১৯৯৬ সাল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নিত্রা। যোগ দিলেন ‘সুবচন নাট্য সংসদ’-এ। এখানে প্রথম অভিনয় রাষ্ট্র বনাম নাটকে। চরিত্রের নাম সমিরণ বেওয়া। এর মধ্যে নাট্যমঞ্চে জুতা সেলাই থেকে চণ্ডিপাঠ—সবকিছুই করেছেন।
‘তারপর নিয়তি আমাকে নাট্যকার বানিয়ে দিল।’ নিত্রার কথা শুনছি। ‘অভিনয়শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে এসেছিলাম নাট্যজগতে। কিন্তু দলের প্রয়োজনে প্রথমে উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের টুয়েলফ নাইট নাটকের অনুবাদের দায়িত্ব ঘাড়ে চাপল, এরপর মামুনুর রশীদের প্ররোচনার কারণে লেখা হলো তীর্থংকর। পরে লিখলাম খনা।’ এসবই নিত্রার সুবচন পর্বের ঘটনা।
মুহম্মদ আলী হায়দারের নির্দেশনায় খনাতে অভিনয়ের পর অভিনয়শিল্পী হিসেবে তরুণ এ নাট্যজনের আসন যেমন পোক্ত হয়েছে, তেমনি নাট্যকার হিসেবেও পেয়েছেন পরিচিতি। আবারও নিত্রার মুখের কথা, ‘খনা মঞ্চস্থ হওয়ার পর আলী যাকের ও সৈয়দ জামিল আহমেদ প্রযোজনাটি নিয়ে লিখেছেন, নিজে উদ্যোগী হয়ে কবীর চৌধুরী (তখনো জীবিত) নাটকটির ইংরেজি অনুবাদ করেছেন—এসব আমার এই ক্ষুদ্র জীবনের পরম প্রাপ্তি।’
কিন্তু খনা প্রযোজনার পরপরই সুবচন থেকে বেরিয়ে এসে ‘বটতলা’ নামে নাটকের নতুন দল করলেন তাঁরা। এ সময় উচ্চশিক্ষার্থে তিনিও পাড়ি জমালেন বিদেশে। এখানে একটি তথ্য জানিয়ে রাখি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার পাঠ শেষ করে তত দিনে নিত্রা শিক্ষক হয়েছেন। সহকারী অধ্যাপক হিসেবে এখন শিক্ষকতা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে।
বর্তমানে বটতলার প্রধান নির্বাহীর বড় দায়িত্বটিও তাঁর কাঁধে। কিন্তু এত দায়িত্বের ভারে অভিনেত্রী নিত্রা কি মিইয়ে গেছেন খানিকটা?
‘একদম না। আমাদের দলের সাম্প্রতিক প্রযোজনা দ্য ট্রায়াল অব মাল্লাম ইলিয়াতে আমি একই সঙ্গে তিনটি চরিত্রে কাজ করেছি। এ নাটকে কাজ করা আমার কাছে খুবই উপভোগ্য ব্যাপার। আর এর সঙ্গে বটতলা থেকে খনা প্রযোজনাটি তো আবার নতুন করে এনেছি আমরা। এখন আমি আর কাজী রোখসানা রুমা—দুজনে মিলে অভিনয় করি খনা চরিত্রে।’
নতুন কোনো নাটক লিখছেন?
‘না, একটা বিষয় প্রায়ই মনে হয় আমার, আমরা যে হরহামেশা বলি, দর্শক নাটক দেখতে আসেন না। আমরা কি দর্শকের জন্য, তাঁদের কথা বিবেচনায় রেখে নাটক করছি। দর্শক তো তাঁর গল্পটি দেখতে চান মঞ্চে; কখনোবা সেই গল্পের সঙ্গে একাত্ম হতে চান। কিন্তু আমরা কি সেই রকম গল্প, নিজেকেসহই বলছি, সেই রকম নাটক লিখতে পারছি?’
নিত্রা কেবল সেদিন প্রশ্নগুলো রেখেছিলেন। উত্তর হয়তো অন্য কারও জানা।