নেতৃত্বশূন্য চট্টগ্রামের ব্যবসার অঙ্গন
দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়েছে বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন। এর মধ্যে ক্ষমতার পালাবদলের পর সবচেয়ে বেশি সংকট দেখা দিয়েছে ছোট সংগঠনগুলোতে। কারণ, এসব সংগঠনের নেতারা গত ১৫ বছরে ব্যবসার পাশাপাশি রাজনৈতিক মাঠেও সক্রিয় ছিলেন। মূলত আওয়ামী লীগ–ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী, শিল্পপতিদের দখলেই ছিল চট্টগ্রামের বেশির ভাগ বাণিজ্য সংগঠন।
চট্টগ্রামের বড় চেম্বারগুলোর মধ্যে শুধু চট্টগ্রাম চেম্বারে প্রশাসক বসিয়েছে সরকার। আর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বারের কমিটি থাকলেও নেই কোনো কার্যক্রম। আর পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ বর্তমানে চলছে প্রশাসক দিয়ে। আগে বিজিএমইএর কমিটিতে চট্টগ্রামের প্রতিনিধি থাকলেও এখন প্রশাসকের নেতৃত্বে পরিচালিত সংগঠনটিতে চট্টগ্রামের কোনো প্রতিনিধি নেই। এ ছাড়া গত নভেম্বরে চট্টগ্রাম উইমেন চেম্বারের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচিত হলেও কমিটির দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম শুরু করেনি।
দেশে ভোগ্যপণ্যের বৃহৎ আড়ত খাতুনগঞ্জের পণ্যভিত্তিক ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর অধিকাংশ নেতা এখন বাজারে আসছেন না। এসব সংগঠনের সভাপতিসহ অন্যান্য পদে ছিলেন আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীরা। খাতুনগঞ্জ এলাকারা ব্যবসায়ীরা বলছেন, পণ্যভিত্তিক বাণিজ্য সংগঠনের নেতাদের অনেকে ছিলেন স্থানীয়ভাবে রাজনীতির সঙ্গেও সম্পৃক্ত ব্যক্তিরা। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়েই তাঁরা এসব সংগঠনের নেতৃত্ব নেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এখন তাঁদের পাওয়া যাচ্ছে না।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম চেম্বার ও বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি এস এম নুরুল হক বলেন, চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো দেশের অন্যান্য জেলার ব্যবসায়ী সংগঠন থেকে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দেশের অর্থনীতিতে চট্টগ্রামের অবদান বেশি। তাই এখানকার ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো যাতে সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে পারে তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
চেম্বারে আসেন না আগের নেতারা
এক দশকের বেশি সময় বিনা ভোটে চট্টগ্রাম চেম্বার দখলে রেখেছিলেন আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এম এ লতিফের পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠজনেরা। তাতে চেম্বারটি চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের বদলে লতিফের চেম্বার হয়ে ওঠে। গত বছরের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চট্টগ্রাম চেম্বার নিয়ে ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ প্রতিবাদে রূপ নেয়। এমন অবস্থায় পদত্যাগ করে চেম্বারের পুরো পর্ষদ।
চেম্বারের সর্বশেষ পর্ষদ গত সেপ্টেম্বরে পদত্যাগ করার আগে সভাপতি ছিলেন ওমর হাজ্জাজ, যিনি এম এ লতিফের ছেলে। একই পর্ষদে জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি পদে ছিলেন সাইফ পাওয়ারটেকের স্বত্বাধিকারী তরফদার রুহুল আমীন। সহসভাপতি পদে ছিলেন মেসার্স রাইসা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী রাইসা মাহবুব। তিনি এফবিসিসিআই ও চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি মাহবুবুল আলমের মেয়ে।
এ ছাড়া পরিচালকদের মধ্যে ছিলেন আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠদের মধ্যে মো. অহিদ সিরাজ চৌধুরী, জহিরুল ইসলাম চৌধুরী, মাহফুজুল হক শাহ, অঞ্জন শেখর দাশসহ মাহবুবুল আলমের ভাই আলমগীর পারভেজ ও এম এ লতিফের আরেক ছেলে ওমর মুক্তাদির। চেম্বারের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পদত্যাগের পর তাঁরা কেউ আর চেম্বারে আসেননি।
দেশের অর্থনীতিতে চট্টগ্রামের অবদান বেশি। তাই এখানকার ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো যাতে সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে পারে তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার
বর্তমানে চেম্বারে প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) মুহাম্মদ আনোয়ার পাশা। গত ৯ সেপ্টেম্বর প্রশাসক দায়িত্ব নেওয়ার পর চেম্বারে সদস্য সংগ্রহ ও নবায়ন চলছে। আগের পর্ষদের কেউ সদস্য ফরম নিয়েছেন কি না জানতে চট্টগ্রাম চেম্বারের সহকারী সচিব (সদস্যপদ শাখা) সৈয়দ সালাওয়াত উল্লাহর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
নেতৃত্বশূন্য বিজিএমইএ চট্টগ্রাম
গত বছরের এপ্রিলে বিজিএমইএর সভাপতি নির্বাচিত হন এস এম মান্নান। তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর গত অক্টোবরে সংগঠনটির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ওই পর্ষদে চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে প্রথম সহসভাপতি হিসেবে ওয়েল গ্রুপের সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও সহসভাপতি হিসেবে এইচকেসি গ্রুপের রাকিবুল আলম চৌধুরী দায়িত্বে ছিলেন। বর্তমানে বিজিএমইএতে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান মো. আনোয়ার হোসেন। তবে সংগঠনটিতে বর্তমানে চট্টগ্রামের কোনো প্রতিনিধি না থাকায় এখানকার ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়েছেন।
চট্টগ্রামের পোশাকশিল্প–সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, নিজেদের প্রতিনিধি না থাকায় তাঁরা তাঁদের সমস্যাগুলো তুলে ধরতে পারছেন না। এ কারণে চট্টগ্রামের সংগঠনটিতে দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন।
বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, জানুয়ারি মাসের শুরুতে প্রশাসক বরাবর চিঠি দেওয়া হয়েছে। সেখানে ব্যবসায়ীরা তাঁদের নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন। কিন্তু এখনো কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
এদিকে গত নভেম্বরে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় উইমেন চেম্বারের ২৭ জনের পর্ষদ নির্বাচিত হয়। তাতে পুরোনোদের অনেকে পদে এসেছেন। সংগঠনটির সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন আবিদা সুলতানা। সংগঠনটির কার্যক্রম বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কয়েক মাস হয়েছে আমরা দায়িত্ব নিয়েছি। শিগগিরই সবার সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে কর্মসূচি হাতে নেওয়া হবে।’
মেট্রো চেম্বারে এস আলম–ঘনিষ্ঠরা
বর্তমানে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বারের সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন কেডিএস গ্রুপের চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান। আর সহসভাপতি হিসেবে আছেন আর্থিক খাতের অনিয়মের জন্য দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচিত এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম (এস আলম)। পরিচালক পদে আছেন এস আলমের ভাই আবদুস সামাদ। সরকার বদলের পর গত নভেম্বরে একটি মেলা আয়োজন ছাড়া এই চেম্বারের আর তেমন কোনো কার্যক্রম ছিল না। গত ৫ আগস্টের পর এস আলম ও তাঁর ভাইয়ের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। খলিলুর রহমানের অবস্থান সম্পর্কে জানেন না সংগঠনটির অন্যান্য নেতারা।
সংগঠনটির কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে পরিচালক এ এম মাহাবুব চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করেও তাঁকে ফোনে পাওয়া যায়নি।
খাতুনগঞ্জ নেতৃত্বশূন্য
খাতুনগঞ্জের পণ্যভিত্তিক সংগঠনের নেতারা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনুপস্থিত রয়েছেন। এমনকি তাঁদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও তাঁরা আসছেন না। খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের কার্যক্রম কার্যত বন্ধ। ২০১২ সাল থেকে সংগঠনটির দায়িত্বে ছিলেন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মাহবুবুল আলম। তিনি এফবিসিসিআইয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে আছেন আবুল বশর চৌধুরী। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত ৫ আগস্টের পর সংগঠনটির কার্যক্রম অনেকটা স্থবির হয়ে গেছে।
এ ছাড়া চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার ও ব্যবসায়ী সমিতি, চাক্তাই শিল্প ও ব্যবসায়ী সমিতিসহ আরও কয়েকটি সংগঠনের কয়েকজন ব্যবসায়ীর নামে মামলা হয়েছে। ফলে এসব সংগঠনের কার্যক্রমেও স্থবিরতা নেমে এসেছে।
জানতে চাইলে খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ ছগীর আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, আগামী ২৪ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন ঘোষণা করা হয়েছে। নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব উঠে আসবে। নতুন নেতৃত্ব সংগঠনটিকে গতিশীল করবে।