ভ্যাট বা মূসক বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে বগুড়ার প্রসিদ্ধ দই ও মিষ্টির বাজারে। বিক্রেতারা ইতিমধ্যে প্রতি কেজি মিষ্টির দাম ৩০ থেকে ৭০ টাকা, আর প্রতি সরা দইয়ের দাম ৩০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছেন। সেই সঙ্গে কনফেকশনারি বা বেকারি পণ্যের দামও বেড়েছে।
এমন অবস্থায় দই-মিষ্টিসহ কনফেকশনারি বা বেকারি পণ্যে ভ্যাট বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে বগুড়া জেলা হোটেল-রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি। সম্প্রতি এক সভায় বর্ধিত ভ্যাটের কারণে দই-মিষ্টি ও বেকারি পণ্যে ক্রেতাদের অতিরিক্ত মূল্য গুনতে হচ্ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এই সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক মহাসচিব ও বগুড়া জেলা শাখার সভাপতি এম রেজাউল করিম সরকার।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) গত ৯ জানুয়ারি আলাদা দুটি প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে শতাধিক পণ্যে ভ্যাট বা মূসকের (মূল্য সংযোজন কর) হার সাড়ে ৭ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করে। এরপর অবশ্য ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে ভ্যাট হার কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয় এবং কিছু পণ্য আগের ভ্যাট হারেই (সাড়ে ৭ শতাংশ) ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
ভ্যাট বৃদ্ধির এ সিদ্ধান্তের পর
বগুড়া রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি) বগুড়ার সরার দইকে গত বছরের ২৫ জুন ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
বগুড়া চেম্বার অব কমার্সের তথ্যানুযায়ী, এই জেলায় প্রতিদিন এক কোটি টাকার বেশি দই বিক্রি হয়। সেই হিসাবে বছরে প্রায় ৩৬০ কোটি টাকার দই কেনাবেচা হয়। আর মিষ্টি বিক্রি হয় প্রায় ৩০০ কোটি টাকার।
ভ্যাট বাড়ানোর আগে বগুড়ার প্রসিদ্ধ মিষ্টির দোকানাগুলোয় প্রতি কেজি সাধারণ মানের মিষ্টি ৩২০–৩৪০, স্পেশাল মিষ্টি ৫০০–৭০০, সন্দেশ ৫০০–৬০০ এবং প্রতি সরা দই (কড়া মিষ্টি) ২৮০–৩০০ ও হালকা মিষ্টির শাহি দই ৩৪০–৩৫০, চিনিমুক্ত দই ২৮০ এবং টক দই ২০০ টাকায় বিক্রি হতো। ভ্যাট বৃদ্ধির পর এখন প্রতি কেজি মিষ্টির দাম ৩০–৭০ টাকা এবং প্রতি সরা দইয়ে ৩০–৪০ টাকা বেড়েছে।
ভ্যাট ফাঁকির সুযোগ নেই বলে বর্ধিত ভ্যাট হার অনুযায়ী দই ও মিষ্টির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে ক্রেতাদের সমস্যা হলেও এনবিআরের সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই আমাদের।নুরুল বাশার চন্দন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এশিয়া সুইটমিট, বগুড়া।
জিয়াউল ইসলাম নামের একজন ক্রেতা এশিয়া সুইটমিটে প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিবছর ঈদ এলেই দুধের দাম বৃদ্ধির অজুহাতে দই-মিষ্টির দাম কেজিতে ২০ থেকে ৪০ টাকা বাড়ানো হয়। ভ্যাট বৃদ্ধির কারণে এবার ঈদের আগেই মিষ্টির দাম কেজিতে ৭০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
এশিয়া সুইটমিটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নুরুল বাশার চন্দন বলেন, ‘ভ্যাট ফাঁকির সুযোগ নেই বলে বর্ধিত ভ্যাট হার অনুযায়ী দই ও মিষ্টির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে ক্রেতাদের সমস্যা হলেও এনবিআরের সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই আমাদের।’
যেভাবে খ্যাতির শিখরে বগুড়ার দই ও মিষ্টান্ন
স্থানীয় বিক্রেতারা বলেন, দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিয়েশাদি থেকে শুরু করে ঈদ, পয়লা বৈশাখ বা নববর্ষসহ বিভিন্ন উৎসব ও সামাজিক অনুষ্ঠানে অতিথি আপ্যায়নে বগুড়ার সরার দই বেশ জনপ্রিয়। প্রবাসী বাংলাদেশি ও বিদেশি পর্যটকদের মাধ্যমে বগুড়ার বিভিন্ন স্বাদের দই এখন ভারত, সৌদি আরব, কুয়েত, পাকিস্তান, নেপাল, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ইতালি, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে।
প্রবীণ মিস্টি ব্যবসায়ীরা জানান, বগুড়ার শেরপুর উপজেলার ঘোষপাড়ার নীলকণ্ঠ ঘোষের হাত ধরে প্রায় দেড় শ বছর আগে ১৮৬০ কিংবা ১৮৭০ সালের দিকে বগুড়ার দইয়ের যাত্রা শুরু হয়। প্রথম দিকে এখানকার ঘোষ সম্প্রদায়ের লোকেরা টক দই বানিয়ে ছোট ছোট হাঁড়িতে ভরে তা গ্রামগঞ্জে বিক্রি করতেন। গেল শতকের শুরুর দিকে ঘোষপাড়ার শ্রী গৌর গোপাল পাল বগুড়া শহরে দই বিক্রি শুরু করেন। এরপর বগুড়ার নওয়াব আলতাফ আলী চৌধুরীর (পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলীর বাবা) পৃষ্ঠপোষকতায় গৌর গোপাল পাল বগুড়া শহরে দই উৎপাদন শুরু করেন। বগুড়া শহরের নওয়াববাড়ি সড়কে এখনো গৌর গোপালের দুই উত্তরসূরি বিমল চন্দ্র পাল ও স্বপন চন্দ্র পাল ‘শ্রী গৌর গোপাল দধি ও মিষ্টান্ন ভান্ডার’ নামে প্রাচীন দোকানটি চালাচ্ছেন।
জনশ্রুতি আছে, দেশভাগের পর একবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী পার্লামেন্টের সদস্যদের দই খাইয়ে বাহবা পেয়েছিলেন। বিদেশে প্রথম বগুড়ার দইয়ের সুখ্যাতি পৌঁছায় ১৯৩৮ সালে। ওই বছরের গোড়ার দিকে তৎকালীন বাংলার ব্রিটিশ গভর্নর স্যার জন এন্ডারসন বগুড়ার নওয়াববাড়িতে বেড়াতে এলে তাঁকে কাচের পাত্রে বিশেষ ধরনের দই খেতে দেওয়া হয়। সে দইয়ের স্বাদে মুগ্ধ হন তিনি। এরপর বগুড়ার দই ইংল্যান্ডে নিয়ে যান। আবার কোনো কোনো প্রবীণ ব্যক্তি বলেন, ইংল্যান্ডের রানির জন্যও নাকি বগুড়ার দই নেওয়া হয়েছিল। তবে এ সম্পর্কে লিখিত কিছু পাওয়া যায় না।
স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিরা বলেন, গত শতকের পঞ্চাশের দশকে ঘোষদের পাশাপাশি মুসলমানরাও দইয়ের ব্যবসায় নামেন। এর মধ্যে বগুড়া সদরের বাঘোপাড়ার আবদুর রহমানের রফাত দই ও শহরের মহরম আলীর দই উল্লেখযোগ্য।
গত শতকের আশির দশকে সরার দইয়ের প্রচলন শুরু হয়, যা স্বাদে ভিন্নতার কারণে অল্পদিনেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। আহসানুল কবির নামে এক ব্যবসায়ী বগুড়া শহরে ‘দইঘর’ নামে সুসজ্জিত শোরুম খুলে সরা ও হাঁড়িতে করে দই বিক্রিতে আধুনিকতা ও অভিনবত্ব আনেন। কাছাকাছি সময়ে এশিয়া সুইটসও ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের দই বানিয়ে সাড়া ফেলে দেয়। এরপর দ্রুত এই ব্যবসায়ের বিকাশ ঘটতে থাকে।
বর্তমানে বগুড়া জেলা শহরসহ ১২ উপজেলাতেই দই তৈরি হয়। তবে সদর ও শেরপুর উপজেলাতেই দইয়ের ব্যবসা বেশি হয়।
স্বাদ ও মান বিবেচনায় বগুড়ার প্রসিদ্ধ দই প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এশিয়া সুইটস, দই ঘর, আকবরিয়া গ্র্যান্ড হোটেল, শ্যামলী হোটেল, রফাত দইঘর, মহররম আলীর দই, গৌর গোপালের দই, রফাতের দই, চিনিপাতা দই, শেরপুর দইঘর, ফুড ভিলেজ, সাউদিয়া, জলযোগ, বৈকালী ও শুভ দধি ভান্ডার, শম্পা দধি ভান্ডারের কদর তুলনামূলক বেশি।
গৌর গোপাল দইঘরের মালিক বিমল চন্দ্র ঘোষ বলেন, ‘দাদু গোপালের হাত ধরেই বগুড়া শহরে দইয়ের বাজারজাত শুরু হয়েছিল। তাঁর স্মৃতি ও সুনাম ধরে রাখতেই গৌর গোপাল দইঘর এখনো দইয়ের আসল স্বাদ ও মান ধরে রেখেছে।’