বিদেশি বিনিয়োগে দুরবস্থা, এক ত্রৈমাসিকে ১১ বছরে সর্বনিম্ন

দেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) খরা কাটছে না, উল্টো পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) নিট ১০ কোটি ৪৩ লাখ ডলারের এফডিআই এসেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে যা ৭১ শতাংশ কম।

বাংলাদেশে এক প্রান্তিকে এফডিআই এতটা কমে যাওয়ার ঘটনা সম্প্রতি আর ঘটেনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা যায়, এক প্রান্তিকে এত কম এফডিআই গত ১১ বছরে কখনো আসেনি। ২০১৪ সাল থেকে প্রান্তিকভিত্তিক এফডিআইয়ের হিসাব প্রকাশ করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তার আগে ষাণ্মাসিক পরিসংখ্যান দেওয়া হতো। ফলে তার আগের বছরগুলোর সঙ্গে গত জুলাই-সেপ্টেম্বরের এফডিআইয়ের তুলনা করা যায়নি।

ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা চলছে। এমন প্রেক্ষাপটে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাবে না।

এফডিআই নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) নিট নতুন বিনিয়োগ বা ইকুইটি এসেছে মাত্র ৭ কোটি ৬৮ লাখ ডলার। তার আগের প্রান্তিকেও (এপ্রিল-জুন) নতুন বিনিয়োগ এসেছিল প্রায় তিন গুণ—২১ কোটি ডলার।

চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) মোট নিট এফডিআইয়ের ৭ কোটি ২৯ লাখ ডলার পুনর্বিনিয়োগকৃত আয় থেকে আসে। ফলে নতুন ও পুনর্বিনিয়োগ মিলে এসেছে মোট ১৪ কোটি ৯৬ লাখ। তা থেকে আন্ত কোম্পানি ঋণ ৪ কোটি ৫৩ লাখ ডলার বাদ দিয়ে নিট হিসাব দাঁড়ায় ১০ কোটি ৪৩ লাখ ডলার। বাংলাদেশের এফডিআইয়ের বড় অংশই আগে থেকে দেশে বিনিয়োগ করা কোম্পানির আয় পুনর্বিনিয়োগের মাধ্যমে আসে।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ অর্থবছরেও এফডিআই কমেছে। বিদায়ী ২০২৩-২৪ অর্থবছর দেশে ১৪৭ কোটি ডলারের এফডিআই এসেছে। এই বিনিয়োগ গত ২০২২-২৩ অর্থবছরের তুলনায় ৮ দশমিক ৮০ শতাংশ কম। ওই অর্থবছর ১৬১ কোটি ডলারের এফডিআই এসেছিল।

সামগ্রিকভাবে এফডিআই কমে যাওয়ার নতুন বিনিয়োগ (ইকুইটি) ও পুনর্বিনিয়োগ কমেছে। গত অর্থবছরে আসা মোট ১৪৭ কোটি ডলারের এফডিআইয়ের মধ্যে ৪৫ শতাংশ বা ৬৭ কোটি ডলার হচ্ছে নতুন বিনিয়োগ। অর্থাৎ নতুন বিনিয়োগ আসার হার দুই অর্থবছর ধরেই কমছে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, ‘জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে প্রবৃদ্ধির হারও অনেক কমে গেছে। ওই সময় রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল। ফলে এফডিআই কমে যাওয়াও স্বাভাবিক। এমনিতেই দেশের যে ব্যবসায়িক পরিবেশ, তাতে আমরা তেমন একটা এফডিআই পাই না। এর মধ্যে নতুন বিনিয়োগ আরও কম। ব্যবসায়িক পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। ফলে ২০২৫ সালেও এফডিআই বা দেশি বিনিয়োগেও তেমন একটা গতি আসবে বলে তিনি মনে করেন না।’

বছরের পর বছর বিভিন্ন সমস্যার কারণে আগে থেকেই বিনিয়োগে গতি কম। জিডিপির শতকরা হিসাবে বেসরকারি বিনিয়োগ তিন বছর ধরে কমছে। সম্প্রতি বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সিপিডির প্রকাশিত এক জরিপের ফলাফলে বলা হয়, দেশে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা-বাণিজ্যে মূল চ্যালেঞ্জ দুর্নীতি। চলতি বছরও প্রায় ১৭ শতাংশ ব্যবসায়ী দুর্নীতিকে ব্যবসা করার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

দুর্নীতিসহ অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা, বৈদেশিক মুদ্রার অস্থিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অদক্ষ আমলাতন্ত্র, উচ্চ করহারসহ ব্যবসা-বাণিজ্যে মোট ১৭টি চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছেন ব্যবসায়ীরা।