চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশের অর্থনীতি, অনিশ্চয়তার মধ্যে তৈরি পোশাকশিল্প

সাভারের পলাশবাড়ী এলাকার পার্ল গার্মেন্টস কোম্পানি লিমিটেড কারখানার সামনে নানা দাবিতে গতকাল বুধবার শ্রমিকদের বিক্ষোভছবি: প্রথম আলো

সারা বিশ্বের কম দামি পোশাকের প্রাণস্পন্দন বাংলাদেশের পোশাকশিল্প। বিশ্বের সব বড় ব্র্যান্ডের বিক্রয়কেন্দ্রে বাংলাদেশে তৈরি পোশাক বিক্রি হয়। এই শিল্পের বদৌলতে গত তিন দশকে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ হয়েছে।

বিবিসি নিউজ অনলাইনের এক সংবাদে বলা হয়েছে, তবে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগে পরে দেশে যে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তাতে এই শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

অন্তত চারটি পোশাক কারখানায় আগুন দেওয়া হয়েছে। কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় দেশব্যাপী ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়, তখন পোশাক উৎপাদন ব্যাহত হয়। আন্দোলনে শত শত মানুষ নিহত হন। ইতিমধ্যে তিনটি বৈশ্বিক বড় ব্র্যান্ড ভিন্ন বাজারের খোঁজ শুরু করেছে।

অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হওয়ার পর এখনো উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। মঙ্গলবার থেকে শ্রমিক অসন্তোষের জেরে ঢাকার আশপাশের অন্তত ৬০টি কারখানা বন্ধ। শ্রমিকেরা মজুরি বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে বিক্ষোভ করছেন।

তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, সম্প্রতি যা ঘটে গেছে, ব্র্যান্ডগুলোর আত্মবিশ্বাসে তার প্রভাব পড়েছে। সম্ভবত তারা এখন ভাববে, বাংলাদেশের ওপর আর এককভাবে নির্ভর করা ঠিক হবে কি না।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কেনে এমন এক কোম্পানি বিবিসি নিউজ অনলাইনকে বলেছে, সম্প্রতি বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে, তার জেরে চলতি বছর বাংলাদেশের রপ্তানি কমতে পারে ১০ থেকে ২০ শতাংশ। এই অঙ্ক মোটেও ক্ষুদ্র নয়। বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশই আসে এই কমদামি পোশাক থেকে।

শুধু যে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তা নয়, বরং আগে থেকেই বাংলাদেশের রপ্তানি ও অর্থনীতি খুব একটা ভালো অবস্থায় ছিল না। কোভিড-১৯সহ বিভিন্ন কারণে অর্থনীতিতে প্রভাব পড়েছে।

পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয়বহুল হয়েছে; একই সঙ্গে চাহিদা কমে যাওয়ায় বেচাকেনাও কমে গেছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি রপ্তানির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল হওয়ায় এই বিষয়টি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য মোটও ভালো নয়। রপ্তানি থেকে মুনাফা কমে গেছে; সেই সঙ্গে বাংলাদেশের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভও কমেছে।
তৈরি পোশাক খাত ছাড়াও বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে আরও কিছু সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে বিবিসির এই প্রতিবেদনে। বলা হয়েছে, শুধু একটি খাত দিয়ে অর্থনীতি বেশি দূর যেতে পারে না। শেখ হাসিনা সরকারের বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প সম্পর্কে বলা হয়েছে, লোকদেখানো কিছু প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে সরকারি তহবিল খালি হয়েছে। সেই সঙ্গে দেশে যে স্বজনতোষী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, তার জেরে ব্যাংক খাত দুর্বল হয়েছে। শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীরা ব্যাংকঋণ ফেরত দেয়নি।  

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর সম্প্রতি বিবিসির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বলেন, এটা নিছক অবহেলার কারণে হয়নি, বরং পরিকল্পিতভাবে দেশের আর্থিক খাতে ডাকাতি করা হয়েছে। এখন এই আর্থিক খাতের সমস্যা নিরসন করাই তাঁর মূল দায়িত্ব হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তিনি।

একজন তৈরি পোশাক উদ্যোক্তা বলেন, দেশের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ যেভাবে কমছে, ক্রেতাদের আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরাতে এই একটি কারণই যথেষ্ট। রিজার্ভে যথেষ্ট ডলার না থাকলে ভারত ও চীন থেকে সুতা আমদানি কীভাবে হবে, তা নিয়ে ক্রেতারা উদ্বিগ্ন। এমনকি অনেক ক্রেতা ভ্রমণ বিমা না পাওয়ায় ক্রয়াদেশ দিতে বাংলাদেশে আসতে পারছেন না।

কিন্তু এর চেয়েও বড় সমস্যা এখন মোকাবিলা করতে হবে। শেখ হাসিনাকে হটাতে ছাত্র-জনতার যে আন্দোলন হলো, তার মূল কারণ ছিল ভালো চাকরি না পাওয়া নিয়ে তরুণদের অসন্তোষ।

তৈরি পোশাক খাতে লাখ লাখ কর্মসংস্থান হলেও এসব চাকরির বেতন ভালো নয়। শ্রমিকেরা বিবিসিকে বলেছেন, যে মজুরি তাঁদের দেওয়া হয়, তা খুবই কম এবং মাস শেষে তাঁরা ঋণ নিতে বাধ্য হন। এই শ্রমিকেরাও ছাত্র-জনতার আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। এখন তাঁরা মজুরি বৃদ্ধিসহ অন্যান্য দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলন করছেন।

এক শ্রমিকনেতা বলেন, মজুরি দ্বিগুণ করতে হবে; তার চেয়ে কম মানা হবে না। জীবনযাত্রার ব্যয় যে হারে বেড়েছে, মজুরিতে তার প্রতিফলন থাকতে হবে।
আবু তাহের, মোহাম্মদ জামান, মোহাম্মদ জাইদুল, সরদার আরমান—এঁরা সবাই ছাত্র-জনতার আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। দুই থেকে পাঁচ বছর ধরে তাঁরা বেকার। বিবিসিকে তাঁরা বলেন, বেসরকারি খাতে কাজ করার ইচ্ছা তাঁদের আছে। কিন্তু যেসব কর্ম খালি আছে, সেই কাজের যোগ্যতা তাঁদের আছে বলে তাঁরা মনে করছেন না।

মোহাম্মদ জামান বলেন, দেশের শ্রমবাজার কতটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, এই বিষয়টি বাবা-মায়েরা বুঝতে চান না। প্রাপ্তবয়স্ক তরুণেরা বেকার থাকলে পরিবারে চাপ সৃষ্টি হয়। বেকার থাকলে পরিবারে তাদের হেয় হতে হয়। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা কেবল ডিগ্রি পাচ্ছি; কিন্তু কাজের জন্য যে দক্ষতা দরকার, সেটা পাচ্ছি না।’

তবে তরুণেরা আশাবাদী, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূস নিজেও উদ্যোক্তা ছিলেন। সে জন্য তরুণেরা আশাবাদী, তিনি তরুণদের জন্য কিছু করবেন।

সংবাদে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে এখন অনেক চ্যালেঞ্জ; অর্থনীতি স্থিতিশীল করার পাশাপাশি অবাধ ও সুষ্ঠ নির্বাচন আয়োজন করতে হবে এই সরকারকে। কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর হাত থেকে অর্থনীতিকে বের করে আনাও বড় চ্যালেঞ্জ।

আর এসব কিছু করতে হবে এমন একসময়ে, যখন বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাহিদার সংকট চলছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের বৃহৎ প্রতিবেশী ও বাণিজ্য অংশীদার ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির বিষয়টিও রয়েছে। এত এত চ্যালেঞ্জের সঙ্গে আছে মানুষের আশা—ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে যা আমলে নিতে হবে।