ব্যবসায়ীদের আস্থা ফেরাতে করনীতির ধারাবাহিকতা দরকার

করনীতি যখন-তখন পরিবর্তন করলে বিনিয়োগকারীরা সঠিকভাবে পরিকল্পনা করতে পারেন না। তাই করনীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা উচিত। এতে ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরে আসবে।

আজ সোমবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সংস্কার নিয়ে এক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। দ্য ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউনট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি) ও ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) যৌথভাবে এ আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। কারওয়ান বাজারের আইসিএবি ভবনে এই সভা হয়।

অনুষ্ঠানে এনবিআর সংস্কারে সরকার গঠিত পরামর্শক কমিটির সদস্য ও সাবেক এনবিআর চেয়ারম্যান নাসিরউদ্দিন আহমেদ বলেন, অর্থবিলের মাধ্যমে প্রতিবছর করনীতির নানা রকম পরিবর্তন হয়। কিন্তু এভাবে পরিবর্তন করা যাবে না। নীতির ধারাবাহিকতা রাখতে হবে। কমিটি এমন সুপারিশ করবে।

এনবিআর সংস্কারে সরকার গঠিত পরামর্শক কমিটির আরেক সদস্য ও সাবেক এনবিআর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, শুল্ক-করনীতির পরিবর্তন হলে এনবিআরকে নিয়মিত ব্যাখ্যা দিতে হবে। জাপানে প্রতি মাসের ২২ তারিখ রাজস্ব আদায়কারী প্রতিষ্ঠানের প্রধান নানা বিষয়ে ব্যাখ্যা দেন।

আইসিএবির সভাপতি মারিয়া হাওলাদার বলেন, এখনই এনবিআরের সংস্কারের প্রকৃত সময়। ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কর ব্যবস্থা তৈরি করা দরকার। বিদেশিরা বিদ্যমান করনীতির ওপর ভিত্তি করে পরিকল্পনা করে থাকেন। যখন-তখন নীতি পরিবর্তন করা হলে তাঁরা হতাশ হন।

এনবিআর সংস্কারে সরকার গঠিত পরামর্শক অপর সদস্য ফরিদউদ্দিন আহমেদ মনে করেন, বাংলাদেশে করভার অনেক বেশি। যতটা দৃশ্যত দেখা যায়, তার বেশি কর দিতে হয় ব্যবসায়ী ও করদাতাদের। নতুন ভ্যাট আইন ১৯৯১ সালের ভ্যাট আইনের চেয়ে খারাপ বলে তিনি মনে করেন।

রাজস্ব কমিশন নয়, বিভাগ হবে

সভায় মোহাম্মদ আবদুল মজিদ জানান, রাজস্ব খাতের নীতি প্রণয়নে রাজস্ব কমিশন নয়, বিভাগ হবে। শুল্ক-কর আদায়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও নীতি প্রণয়নে বিভাগ—দুটিই অর্থ মন্ত্রণালয়ের আওতায় থাকবে। এ ছাড়া রাজস্ব খাত ডিজিটালাইজেশন এবং শুল্ক, ভ্যাট ও কর—তিনটি আইন পর্যালোচনা করে হচ্ছে। এ বিষয়ে দুটি প্রতিবেদন দেওয়া হবে।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক হাফিজুর রহমানও রাজস্ব আদায় এবং নীতি প্রণয়ন আলাদা করার পক্ষে মত দেন।

রাজস্ব খাত সংস্কারে পরামর্শক কমিটির সদস্য ফরিদউদ্দিন আহমেদ বলেন, এনবিআরে এ পর্যন্ত যত সংস্কার হয়েছে, তাতে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সম্পৃক্ততা ছিল না। দাতা সংস্থা চেয়েছিল, রাজস্ব খাতের কার্যকারিতা বাড়ুক।

পরামর্শক কমিটির সদস্য আমিনুর রহমান বলেন, ‘আমরা ধনীদের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত কর আদায় করতে পারছি না। অথচ ধনীদের কাছে সম্পদ পুঞ্জীভূত হচ্ছে। এতে অপ্রদর্শিত অর্থনীতি বড় হচ্ছে এবং বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে।’

বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান মইনুল খান বলেন, এনবিআরের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে তাদের স্বাধীনতাও দিতে হবে।

সভায় পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বলেন, গত ১০ বছরে দেশের সরকারি অর্থায়ন ব্যবস্থাপনা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। এতে এনবিআরের ওপর রাজস্ব বাড়ানোর জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনৈতিক চাপ বেড়েছে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, কিছুদিন আগে এক শর মতো পণ্যে ভ্যাট বাড়ানো হলো। কোন প্রক্রিয়ায় তা বাড়ানো হলো? এমন প্রশ্ন তোলেন তিনি।

সভায় মোহাম্মদ আবদুল মজিদ আরও বলেন, হোটেলে বসে ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বিএবির পরামর্শে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই বিএবির সদস্যরাই ব্যাংক থেকে বিপুল টাকা নিয়ে গেছে। এসব নিয়ে এত দিন কোনো নিরীক্ষা প্রতিবেদন হয়নি। সনদপ্রাপ্ত হিসাববিদেরাও তাদের প্রতিবেদনে তা তুলে ধরেননি। বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন সাবেক ডেপুটি গভর্নরের বাসায় বিপুল পরিমাণ সোনাদানা, টাকাপয়সা পাওয়া গেছে। এত দিন কেন পাওয়া যায়নি?

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন আইসিএবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শুভাশীষ বসু, ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার, সমকালের সহযোগী সম্পাদক জাকির হোসেন প্রমুখ।