বৈষম্যহীন দেশ গড়ার এখনই সময়

মহান বিজয় দিবসে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান সর্বস্তরের মানুষ। গতকাল সকালেছবি: দীপু মালাকার

মহান বিজয় দিবসে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গতকাল সোমবার জাতীয় স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের ঢল নেমেছিল। তাঁদের অনেকের হাতে ছিল জাতীয় পতাকা। কেউ কেউ এসেছিলেন গালে-কপালে জাতীয় পতাকা এঁকে, আবার কারও কারও মাথায় ছিল বাংলাদেশের পতাকাখচিত ব্যান্ড। অনেকে ছিলেন লাল-সবুজের পোশাকে এবং হাতে পতাকা। তাঁরা স্মৃতিসৌধের বেদিতে ফুল দিয়ে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

তাঁরা বলেছেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জনের পর ৫৩ বছর পেরিয়ে গেলেও শোষণহীন, বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের যে আকাঙ্ক্ষা ছিল, সেটি বাস্তবায়িত হয়নি। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ গড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে নতুন করে। একটি শোষণমুক্ত ও বৈষম্যহীন দেশ গড়ার এখনই সময়।

ছেলের প্রাণের মূল্য হিসেবে একটি বৈষম্যহীন দেশ দেখতে চাই। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে যাঁদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে, সেসব হত্যার বিচারও চাই।
রমজান আলী, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ঢাকায় গুলিতে নিহত কিশোর মো. মোবারকের বাবা

গতকাল ভোরে প্রথমে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। কিছুক্ষণ পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং পূর্ব তিমুরের প্রেসিডেন্ট জোসে রামোস-হোর্তা সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। পুষ্পস্তবক অর্পণের পর তাঁরা সেখানে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। এ সময় সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর একটি চৌকস দল রাষ্ট্রীয় সালাম প্রদর্শন করে এবং বিউগলে করুণ সুর বেজে ওঠে।

এ সময় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, তিন বাহিনীর প্রধানরা, বীর মুক্তিযোদ্ধা, কূটনীতিক, বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি এবং বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণ সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। পরে বীরশ্রেষ্ঠদের পরিবার, মুক্তিযোদ্ধা ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, বাংলাদেশে অবস্থিত বিদেশি কূটনীতিক, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সর্বস্তরের মানুষ স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। জাতীয় স্মৃতিসৌধের মূল বেদি ফুলে ফুলে ভরে ওঠে।

মহান বিজয় দিবসে জাতীয় স্মৃতিসৌধে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। এসব দল ও সংগঠনের মধ্যে রয়েছে বিএনপি, জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), গণফোরাম, নাগরিক ঐক্য, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, গণ অধিকার পরিষদ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি, জাতীয় নাগরিক কমিটি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সর্বস্তরের মানুষ। আওয়ামী লীগ এবং অঙ্গসংগঠনের কোনো নেতা-কর্মীকে ব্যানার বা ফেস্টুন নিয়ে স্মৃতিসৌধে ফুল দিতে দেখা যায়নি। তবে পুলিশ বলেছে, আওয়ামী লীগের নামে ফুল দিতে আসা আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টিকে স্মৃতিসৌধের বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে দেয়নি পুলিশ।

গতকাল সকাল ১০টার দিকে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে জাতীয় স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অসুস্থ হয়ে মাটিতে শুয়ে পড়েন। দ্রুত তাঁকে সাভারের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে তাঁকে বাসায় নেওয়া হয়।

‘ঐক্যবদ্ধভাবে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে’

মহান বিজয় দিবসে জাতীয় স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে তরুণ প্রজন্মের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। তাঁরা বলেছেন, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে একটি নতুন বাংলাদেশের সূচনা হয়েছে। গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই মুক্তিযুদ্ধের এসব আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে হবে।

গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুর থেকে আসা ইকবাল সিদ্দিকী কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী সাকিব হাসান প্রথম আলোকে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষাগুলো বাস্তবায়িত হয়নি বলেই দেশে শোষণ-বৈষম্য দূর হয়নি। এখন সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই বাংলাদেশে সবার সমান অধিকার থাকবে।

ইকবাল সিদ্দিকী কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা প্রতিবারের মতোই ৬৪ ফুট লম্বা পতাকা নিয়ে স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে এসেছিলেন। তাঁরা সেই পতাকা উড়িয়ে সমৃদ্ধ ও সুন্দর দেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। ইকবাল সিদ্দিকী কলেজের শিক্ষক আল-আমিন প্রথম আলোকে বলেন, দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে জানাতে শিক্ষার্থীদের নিয়ে তাঁরা স্মৃতিসৌধে এসেছেন। মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করে দেশপ্রেমিক নাগরিক গড়ে তুলতেই প্রতিবছর বিজয় দিবস ও স্বাধীনতা দিবসে শিক্ষার্থীদের স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে নিয়ে আসেন।

ম্যান ফর ম্যান ফোর্স নামে একটি সংগঠন ৪০ ফুট দীর্ঘ একটি পতাকা প্রদর্শন করেছে। এই সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক রাজীবুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশের প্রতীক হচ্ছে লাল-সবুজের পতাকা। এই পতাকাকে ধারণ করলে কেউ অন্যায় করতে পারবেন না। তাই লাল-সবুজের বড় পতাকা প্রদর্শন করতে স্মৃতিসৌধে এসেছেন।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় ঢাকার গ্রিন রোডে গুলিতে নিহত কিশোর মো. মোবারকের বাবা রমজান আলী স্মৃতিসৌধে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের শ্রদ্ধা জানাতে গিয়েছিলেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, লাখো শহীদের আত্মত্যাগে একাত্তরে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল। তারপর যারাই ক্ষমতায় ছিল, দেশের স্বার্থে কেউ কাজ করেনি। ধীরে ধীরে বাংলাদেশ একটি বৈষম্যমূলক দেশে পরিণত হয়। এই বৈষম্য দূর করার লড়াইয়ে তাঁর ছেলে প্রাণ দিয়েছে। ছেলের প্রাণের মূল্য হিসেবে একটি বৈষম্যহীন দেশ দেখতে চান তিনি। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে যাঁদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে, সেসব হত্যার বিচারও চান তিনি।