সব বিভাগে হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ হতে পারে
জেলা পর্যায়ে বাণিজ্যিক আদালত।
কমিশনের প্রতিবেদন চূড়ান্ত পর্যায়ে।
আইনগত সহায়তা সংস্থা হবে অধিদপ্তর।
রাজধানীর বাইরে প্রশাসনিক বিভাগীয় সদরে হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী বেঞ্চ স্থাপনের পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়ে দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালতের কার্যক্রম সম্প্রসারণের প্রস্তাব করতে যাচ্ছে বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন। একই সঙ্গে সুনির্দিষ্ট কিছু জেলা আদালতে প্রয়োজন অনুসারে এক বা একাধিক বাণিজ্যিক আদালত স্থাপন করা যেতে পারে। কমিশনের সুপারিশের খসড়া সারসংক্ষেপে এ কথা বলা হয়েছে।
এর আগে সংবিধান সংস্কার কমিশনের সুপারিশে উচ্চ আদালতের বিকেন্দ্রীকরণ করে দেশের সব বিভাগে হাইকোর্টের স্থায়ী আসন চালুর কথা বলা হয়। এ কমিশন ১৫ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়।
একটি পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠা আইনজীবীসহ অংশীজনদের দীর্ঘদিনের দাবি। বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সুপারিশের খসড়ায় বলা হয়েছে, বিচার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ এবং সর্বোপরি নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগের পৃথক্করণে আলাদা সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় স্থাপন করতে হবে। এ জন্য একটি স্বতন্ত্র আইন বা অধ্যাদেশ প্রণয়ন করতে হবে।
উপজেলায় দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালতের কার্যক্রম সম্প্রসারণেরও প্রস্তাব দিচ্ছে সংস্কার কমিশন।
অবশ্য গত ২৭ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন থেকে একটি ধারণাপত্রসহ বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় গঠনের প্রস্তাব আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। কমিশনের খসড়া প্রস্তাবে সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগ, শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা এবং অপসারণ; সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় স্থাপন এবং বিচার বিভাগের প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ; বিচার বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণ ও সম্প্রসারণ, স্থায়ী ও স্বতন্ত্র সরকারি অ্যাটর্নি সার্ভিস গঠন; স্বতন্ত্র ফৌজদারি তদন্ত সংস্থা; জমা থাকা মামলার নিষ্পত্তি বা মামলাজট কমানো; বিচারকাজে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার; বিচার বিভাগের দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করাসহ আরও বেশ কিছু বিষয় রয়েছে।
এর আগে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের সুপারিশ পেতে অন্তর্বর্তী সরকার ১১টি কমিশন গঠন করে, যার একটি বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন। আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মোমিনুর রহমানকে প্রধান করে আট সদস্যের এ কমিশন গঠিত হয় গত ৩ অক্টোবর। ইতিমধ্যে কমিশন একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন শিগগিরই জমা দেওয়া হবে।
মানুষের দোরগোড়ায় বিচার পৌঁছে দিতে ঢাকার বাইরে বিভাগীয় সদরে হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী বেঞ্চ স্থাপনের প্রস্তাব করা হচ্ছে।তানিম হোসেইন শাওন, সদস্য, বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন
বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সদস্য আইনজীবী তানিম হোসেইন শাওন প্রথম আলোকে বলেন, বিচারকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে এবং আদালতের এখতিয়ার যাতে খণ্ডিত না হয়, এসব দিক বিবেচনায় ঢাকার বাইরে বিভাগীয় সদরে হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী বেঞ্চ স্থাপনের প্রস্তাব করা হচ্ছে। এ জন্য সংবিধানের ১০০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রস্তাব থাকছে। এ ছাড়া উপজেলা পর্যায়ে দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালতের কার্যক্রম সম্প্রসারণের প্রস্তাব করা হচ্ছে। কমিশনের সুপারিশসংবলিত পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন চূড়ান্ত পর্যায়ে, যা ই-মেইলের মাধ্যমে আজ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বরাবর পাঠানো হবে। প্রধান উপদেষ্টার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ৫ ফেব্রুয়ারি প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
বিচার বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণ ও সম্প্রসারণ
খসড়া সারসংক্ষেপে কমিশন বলেছে, প্রতিটি স্থায়ী বেঞ্চ কোন কোন এলাকা থেকে উদ্ভূত মামলা গ্রহণ করতে পারবে, তা সুনির্দিষ্ট করে দিতে হবে। তবে বিচারকাজ পরিচালনা এবং রায়, আদেশ, নির্দেশ ইত্যাদি প্রদানের ক্ষেত্রে হাইকোর্ট বিভাগের এখতিয়ারের পূর্ণাঙ্গতা বজায় রাখতে হবে। অর্থাৎ স্থায়ী বেঞ্চগুলো স্থাপনের কারণে দেশব্যাপী কর্তৃত্ব প্রয়োগের ক্ষেত্রে হাইকোর্ট বিভাগের এখতিয়ার কোনো ভৌগোলিক সীমারেখা দিয়ে বিভাজিত হবে না এবং রাষ্ট্রের একক চরিত্র ক্ষুণ্ন হবে না।
খসড়া সারসংক্ষেপে উল্লেখ করা হয়, প্রধান বিচারপতি স্বতঃপ্রণোদিতভাবে বা কোনো স্থায়ী বেঞ্চে বিচারাধীন মামলার কোনো পক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কোনো যৌক্তিক কারণে বা ন্যায়বিচারের স্বার্থে ওই মামলা অন্য কোনো যথাযথ বেঞ্চে স্থানান্তর করতে পারবেন। আরও বলা হয়েছে, স্থায়ী বেঞ্চগুলো সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য আদালত ও সহায়ক কার্যালয়, বিচারক ও সহায়ক জনবলের জন্য উপযুক্ত বাসস্থানসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। সবগুলো স্থায়ী বেঞ্চ একই সঙ্গে কার্যকর করা কঠিন বিবেচিত হলে প্রয়োজনে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে বিভাগীয় সদর দপ্তরগুলোতে স্থায়ী বেঞ্চ কার্যকর করা যেতে পারে।
উপজেলা পর্যায়ে আদালতের কার্যক্রম
কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করে উপজেলা পর্যায়ে দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালতের কার্যক্রম সম্প্রসারণের জন্য প্রস্তাব রয়েছে খসড়া সারসংক্ষেপে। সংস্কার কমিশন বলেছে, উপজেলা সদরের ভৌগোলিক অবস্থান ও বৈশিষ্ট্য, জেলা সদর থেকে দূরত্ব ও যাতায়াত ব্যবস্থা, জনসংখ্যার ঘনত্ব ও বিন্যাস এবং মামলার চাপ বিবেচনা করে কোন কোন উপজেলায় আদালত স্থাপন করা প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করতে হবে। বর্তমানে যেসব স্থানে চৌকি আদালত আছে, সেগুলো সচল রাখার প্রয়োজন আছে কি না বা সেগুলোর ভৌগোলিক এখতিয়ার পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন আছে কি না, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। উপজেলা আদালতগুলোতে সিনিয়র সহকারী জজ পর্যায়ের বিচারকদের পদায়ন করতে হবে এবং তাঁদের দেওয়ানি ও ফৌজদারি উভয় এখতিয়ার অর্পণ করতে হবে। আইনগত সহায়তা কার্যক্রম ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা, বিশেষত মধ্যস্থতা পদ্ধতি উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত সম্প্রসারিত করতে হবে।
বাণিজ্যিক আদালত স্থাপন
খসড়া সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য পৃথক বাণিজ্যিক আদালত স্থাপনে যথাযথ বিধানসংবলিত আইন প্রণয়ন করতে হবে এবং দেওয়ানি কার্যবিধিসহ অন্যান্য আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনতে হবে। সালিস আইন সংশোধন করে সালিস-সংক্রান্ত বিষয়াদি (আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সালিস ছাড়া) বাণিজ্যিক আদালতের ওপর ন্যস্ত করা বাঞ্ছনীয়। বাণিজ্যিক আদালত থেকে উদ্ভূত বিষয়াদির নিষ্পত্তির জন্য হাইকোর্ট বিভাগেও এক বা একাধিক সুনির্দিষ্ট ক্ষমতাসম্পন্ন বেঞ্চ গঠন করতে হবে। হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ বিভাগীয় সদরগুলোতে স্থাপিত হওয়ার পর বিভাগীয় পর্যায়ে এ ধরনের বেঞ্চ গঠন করা যেতে পারে। যেন স্থানীয় পর্যায়ে বাণিজ্যিক বিরোধগুলোর সহজ ও দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব হয়।
এদিকে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ ২৫ জানুয়ারি সিলেটে এক সেমিনারে বলেছেন, বিশেষায়িত বাণিজ্যিক আদালত প্রতিষ্ঠায় উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
দুর্নীতি প্রতিরোধ ও স্বচ্ছতা-জবাবদিহি
বিচার বিভাগকে দুর্নীতিমুক্ত রাখতে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরিভাবে নেওয়া প্রয়োজন বলে খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে। কমিশন বলেছে, তিন বছর পরপর সুপ্রিম কোর্ট এবং অধস্তন আদালতের বিচারকদের সম্পত্তির বিবরণ সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে পাঠানো এবং তা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে জনগণের সামনে প্রকাশ করতে হবে।
জেলা পর্যায়ের আদালতের বিচারকদের স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করতে কয়েকটি প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে খসড়া প্রস্তাবে।
আইনগত সহায়তা কার্যক্রমের প্রসারের বিষয়ে খসড়া সারসংক্ষেপে বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন বলেছে, জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার বিদ্যমান সেবাগুলোর পরিধি বাড়িয়ে আইনি সহায়তার পাশাপাশি মীমাংসা ও মধ্যস্থতার মাধ্যমে মামলা ও বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্র সৃষ্টি করে মধ্যস্থতার কার্যক্রমকে দেশে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এ জন্য এই সংস্থাকে একটি অধিদপ্তরে রূপান্তর করতে হবে। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট আইন রহিত করে একটি সময়োপযোগী আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক প্রথম আলোকে বলেন, আপাতদৃষ্টে সংবিধানের ৪৪ অনুচ্ছেদ অনুসারে কিছু জেলা জজ আদালতকে হাইকোর্টের ক্ষমতার অংশবিশেষ অর্পণ করে বিকেন্দ্রীকরণ পরীক্ষামূলকভাবে চেষ্টা করা যেতে পারে। তাহলে সংবিধানের ১০০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের বিরোধ এড়ানো যাবে। এ ছাড়া উপজেলা পর্যায়ে আদালত স্থাপন করলেই হবে না, আইনজীবীসহ আনুষঙ্গিক বিষয়গুলোর প্রয়োজন হবে।
শাহদীন মালিক মনে করেন, উপজেলা পর্যায়ে আদালত স্থাপনে যে অর্থ ও সম্পদের প্রয়োজন হবে, তার বদলে জেলা আদালতের বিচারকের সংখ্যা বাড়ানো হলে জনসাধারণের জন্য বিচার সহজলভ্য ও ত্বরান্বিত হবে।