প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তারা
অন্তর্বর্তী সরকারও ‘আদিবাসীদের’ স্বীকৃতিকে মুছে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে পা দিয়েছে
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের বৈষম্যহীন চেতনায় আঁকা হয়েছিল ‘আদিবাসী’ শব্দযুক্ত গ্রাফিতি। সেই চেতনা থেকে ওই গ্রাফিতি পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু একটি ‘ভুঁইফোড় সন্ত্রাসী সংগঠনের’ দাবিতে ওই গ্রাফিতি পাঠ্যবই থেকে আবার সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এর মাধ্যমে বৈষম্য দূর করার চেতনা নিয়ে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারও আদিবাসীদের স্বীকৃতিকে মুছে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে পা দিয়েছে। মতিঝিলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদ এবং পাঠ্যবইয়ে আদিবাসী শব্দযুক্ত গ্রাফিতি পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবিতে আয়োজিত এক মানববন্ধনে বক্তারা এ কথাগুলো বলেছেন।
আজ শুক্রবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের দুই অঙ্গসংগঠন যুব ঐক্য পরিষদ ও ছাত্র ঐক্য পরিষদ যৌথভাবে এ মানববন্ধনের আয়োজন করে। মানববন্ধনে দেশে চলমান বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক সহিংসতারও প্রতিবাদ জানান বক্তারা।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সুব্রত চৌধুরী বলেন, একটি ভুঁইফোড় সংগঠন পাঠ্যবই থেকে আদিবাসী শব্দযুক্ত গ্রাফিতি বাদ দেওয়ার দাবি কীভাবে তুলল? আর দাবি তোলার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাবোর্ড পাঠ্যবই থেকে সেই গ্রাফিতি বাদ দিয়েছে। অর্থাৎ আদিবাসীদের স্বীকৃতিকে চিরতরে মুছে দেওয়ার যে ষড়যন্ত্র, সেই ষড়যন্ত্রে অন্তর্বর্তী সরকার পা দিয়েছে। আর তরুণ ছাত্র-ছাত্রীরা এর প্রতিবাদ জানাতে গেলে, তাঁদের ওপর সেই সংগঠন আক্রমণ করল। লাঠিতে জাতীয় পতাকা বেঁধে ওই সংগঠনের মাস্তানেরা শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করে।
পাঠ্যবই থেকে আদিবাসী শব্দযুক্ত গ্রাফিতি সরিয়ে ফেলার প্রতিবাদে গত মঙ্গলবার রাজধানীর মতিঝিলে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) ভবনের সামনে যান ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্যরা। এ সময় ‘স্টুডেন্ট ফর সভারেন্টি’ নামের একটি সংগঠনের নেতা–কর্মীরা তাঁদের ওপর হামলা চালান বলে অভিযোগ। ওই হামলায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নির্বাহী কমিটির সদস্য রুপাইয়া শ্রেষ্ঠা তঞ্চঙ্গ্যাসহ বেশ কয়েকজন আহত হন।
ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুরা নিপীড়িত-নির্যাতিত হচ্ছে অভিযোগ করে সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে একটি বৈষম্যহীন সমাজ এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আশা করেছিলাম। বৈষম্যহীন এ তরুণ সমাজ সারা দেশের দেয়ালে দেয়ালে যে গ্রাফিতি এঁকেছিল, সেটা বাঙালি জাতির ইতিহাস হয়ে থাকবে। একটি গ্রাফিতি, যেখানে পাঁচটি পাতায় লেখা—হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও আদিবাসী। এটা জুলাই বিপ্লবের বড় পাওয়া। যে গ্রাফিতিতে বৈষম্যহীন সমাজ লিপিবদ্ধ হয়েছে সেই গ্রাফিতি কীভাবে পাঠ্যবই থেকে বাদ দেওয়া হয়?’
ঐক্য পরিষদের অন্যতম সভাপতি নিম চন্দ্র ভৌমিক বলেন, ‘দেশে এখনো সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়াশীল ও বিভেদকামী শক্তি তৎপর রয়েছে। তারা বিভিন্ন স্থানে হামলা চালাচ্ছে। বৈষম্যহীন বাংলাদেশের কথা বলা হলেও আদিবাসীদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। উল্টো বিভিন্নভাবে নিপীড়ন চালানো হচ্ছে। আশা ছিল আদিবাসীদের সমস্যা সমাধানে সরকার বা রাজনৈতিক দলগুলো কার্যকর ব্যবস্থা নেবে; কিন্তু আদিবাসীসংক্রান্ত গ্রাফিতি কোনো একটা ভুঁইফোড় বিভেদকামী সংগঠনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বাদ দেওয়া হয়েছে। আমরা এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানাই।’
হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের অন্যতম সভাপতি নির্মল রোজারিও বলেন, আদিবাসী ছাত্র-জনতার দাবি ছিল ন্যায়সংগত। পাঠ্যবই থেকে আদিবাসী শব্দযুক্ত যে গ্রাফিতি বাদ দেওয়া হয়েছে, এ দাবির সঙ্গে ঐক্য পরিষদ আছে। হামলার বিষয়ে সরকারের অবস্থান সুস্পষ্ট করতে হবে। হামলার সুষ্ঠু তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।
ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা দায়িত্ব নিয়ে বলেছিলেন, আমরা সবাই মিলে একটি পরিবার। কিন্তু আদিবাসীদের ওপর যখন হামলা হচ্ছে, তখন সরকার কোথায়? পাঠ্যবইয়ে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানের নাম যদি থাকতে পারে তাহলে আদিবাসীদের নাম কেন থাকতে পারবে না?’
মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ যুব ঐক্য পরিষদের সভাপতি শিমুল সাহা। ছাত্র ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক দিপংকর চন্দ্র শীলের সঞ্চালনায় এতে বক্তব্য দেন পরিষদের আদিবাসীবিষয়ক সম্পাদক উজ্জ্বল আজিম, যুব মহাজোটের সাধারণ সম্পাদক রাজেশ সাহা, উত্তরবঙ্গ আদিবাসী ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক মেলকি হাসদা, ছাত্র ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় সভাপতি সজীব সরকার, হিন্দু মহাজোটের নেতা প্রদীপ কান্তি দে, আদিবাসী ফোরামের কেন্দ্রীয় সদস্য রিপন চন্দ্র বানাই, দীপক চন্দ্র শীলসহ বিভিন্ন আদিবাসী ছাত্র ও যুব সংগঠনের প্রতিনিধিরা। মানববন্ধন শেষে প্রেসক্লাব থেকে পল্টন মোড় পর্যন্ত একটি মিছিল করা হয়।