পঙ্গুত্ব নিয়েও আসবাবে নকশা আঁকায় পটু সুধাংশু, এগিয়ে চলেন মনের জোরে
ছোটবেলা থেকেই দুই পা অবশ। ঘর থেকে বের হয়ে চলাফেরা করাটাই একসময় প্রায় অসম্ভব মনে হচ্ছিল। কিন্তু পায়ে শক্তি না পেলেও মনের জোরে এগিয়ে চলছেন সুধাংশু সূত্রধর (৩৮)। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁর কর্মব্যস্ততায় কাটে। দুই হাতের ছোঁয়ায় বিভিন্ন আসবাবে ফুটিয়ে তোলেন চমৎকার সব নকশা।
সুধাংশু সূত্রধরের বাড়ি শেরপুরের নালিতাবাড়ী পৌর শহরের চকপাড়া মহল্লায়। পঙ্গুত্ব নিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি না করে নিজে কাজ করতে পারেন, এটা ভেবেই আনন্দে সব সময় সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলেন তিনি।
সুধাংশুর বাবা প্রয়াত হরি মোহন সূত্রধর ও মা মিনতি চন্দ্র সূত্রধর। ছয় ভাইবোনের মধ্যে সুধাংশু সবার বড়। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, তিন বছর বয়সে টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে দুই পা অবশ হয়ে যায় সুধাংশু সূত্রধরের। এরপর আর স্কুলে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। বাড়িতে সামান্য লেখাপড়ার সুযোগ হয়েছে।
সুধাংশুর বাবা হরি মোহন ভাড়া করা ঘরে কাঠমিস্ত্রির কাজ করতেন। তাঁর আয়ে স্ত্রী ও ছয় ছেলেমেয়েকে নিয়ে অভাবের সংসার চলত। শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ায় বড় ছেলে সুধাংশুকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন হরি মোহন। সুধাংশুর বয়স যখন সাত-আট, তখন হরি মোহন তাঁকে কখনো কোলে করে, কখনো রিকশায় করে দোকানে নিয়ে যেতেন। সেখানে সুধাংশু একই জায়গায় বসে বসে বাবার করা কাঠের নকশার কাজ দেখতেন। ধীরে ধীরে সুধাংশু তাঁর বাবার কাজে সহযোগিতা করতে শুরু করেন। এভাবে সুধাংশুর কর্মজীবনের হাতেখড়ি হয়।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ২০০১ সালে সুধাংশুর বাবা হরি মোহন মারা যান। তখন সংসারের সব ভার এসে পড়ে ১৪ বছর বয়সী বড় ছেলে সুধাংশুর ওপর। নিরুপায় হয়ে মনে সাহস নিয়ে বাবার ভাড়া করা দোকানে বসে খাটের নকশার কাজ শুরু করেন। সারা দিনে যা পেতেন, তা মায়ের হাতে তুলে দিতেন। সেই আয়ে কোনো রকম সংসার চলত। ওই বছরই একটি বেসরকারি সংস্থা থেকে সুধাংশুকে একটি হুইলচেয়ার দেওয়া হয়। সেই হুইলচেয়ারে করে ছোট ভাই সুব্রতের সহযোগিতায় সুধাংশু দোকানে যাতায়াত শুরু করেন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা আর অনিশ্চয়তা মোকাবিলা করে সুধাংশু এখন নিজেই স্বাবলম্বী।
বাবা বেঁচে থাকতেই সুধাংশুর বড় দুই বোনের বিয়ে হয়ে যায়। চার ভাইয়ের মধ্যে সুধাংশু ছাড়া তিন ভাই বিয়ে করে আলাদা সংসার গড়েছেন। সুধাংশু আর তাঁর মা একত্রে বসবাস করেন। বাবার রেখে যাওয়া ২০ শতক জমিতে একটি টিনের ঘর নির্মাণ করেছেন। সেখানে সুধাংশু ও তাঁর মা মিনতি চন্দ্র সূত্রধর ও ছোট ভাই সুব্রত সূত্রধর ওই ঘরে বসবাস করেন।
সম্প্রতি নালিতাবাড়ী বাজারে দোকানে গিয়ে দেখা যায়, ছোট একটি একচালা ঘরে কাজ করেন সুধাংশু। ঘরের ভেতরে একটি ছোট্ট মেশিন, বাটাল, করাতসহ নানা যন্ত্রপাতি। দোকানে খাটের বিভিন্ন সাইজের কাঠে তাতে বিভিন্ন নকশা করা। সঙ্গে তাঁর ছোট ভাই সুমন সূত্রধরও কাজ করছেন। কাঠের একটি খাটের নকশা করতে সুধাংশুর সময় লাগে দুই দিন। এতে তিনি পারিশ্রমিক পান ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা।
সুধাংশু সূত্রধর জানান, সকাল ১০টায় দোকানে আসেন, রাত ১০টায় দোকান বন্ধ করেন। দুপুরে শুধু খাওয়ার জন্য বাড়িতে যান। সংসারের খরচ বাঁচিয়ে অল্প অল্প সঞ্চয় করে ২০২৪ সালে ৭০ হাজার টাকায় ছোট আকারের একটি তিন চাকার স্কুটি কিনেছেন। এটাতে করেই প্রায় আধা কিলোমিটার দূরত্ব পারি দিয়ে দোকানে যাওয়া–আসা করেন। নিজেই হামাগুড়ি দিয়ে স্কুটিতে উঠতে পারেন। ফলে চলাচলে তেমন বেগ পেতে হয় না।
সুধাংশু সূত্রধর প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাবা চলে যাওয়ার পর ছোট ভাইদের নিয়ে শুরু হয় আমার বেঁচে থাকার লড়াই। একপর্যায়ে হতাশায় মুষড়ে পড়ি। দুই চোখে অন্ধকার দেখতাম। তবে পিছু হটিনি। বাবার দেখানো নকশার কাজ নিয়ে নেমে পড়ি আয়রোজগারে। আস্তে আস্তে কাজ পাওয়ায় আয়ের মুখ দেখতে পাই।’
সুধাংশু বলেন, ‘নকশার পাশাপাশি অন্য কাজ মিলিয়ে মাসে ১০-১৫ হাজার টাকা আয় করি। বর্তমান বাজারের হিসাবে আয় সামান্য হলেও আমাদের চলে যায়। কষ্ট হলেও কাজ করতাম। কারণ, কেউ যেন সমাজে বোঝা মনে না করে।’
বছর তিনেক হচ্ছে কাজের ফরমাশ কিছুটা কমে গেছে বলে জানালেন সুধাংশু। তিনি বলেন, ‘শহরের নকশা করার ডিজিটাল দুটি মেশিন রয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যে হয়ে যাওয়ায় সবাই এখন মেশিনের মাধ্যমে নকশার কাজ করান। আমি তো হাতে কাজ করি, এতে সময় একটু বেশি লাগে। এখন ভাবছি নকশা করতে একটি ডিজিটাল মেশিন কিনার। এতে আরও বেশি আয় করা যেত। একটা পুরোনো মেশিন কিনতে দেড় লাখ টাকা লাগে। কিন্তু টাকার অভাবে কিনতে সাহস পাচ্ছি না।’
এখনো বিয়ে করেননি সুধাংশু। সে প্রসঙ্গ তুলতে হাসিমুখে বললেন, ‘এখন তো সব সময় কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকি। মা–ও অসুস্থ তাই বিয়ে নিয়ে চিন্তা করার সময় কই। যদি বিয়ে কপালে থাকে তাহলে হবে।’
সুধাংশুর মা মিনতি চন্দ্র সূত্রধর বলেন, ‘শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকার পরও ছেলেটা কাজের প্রতি খুবই আগ্রহ। আগে কাজ কম হতো সংসারও চলত অনেক কষ্টে। এখন সুধাংশু সারা দিন কাজ করে যা আয় হয়, তা দিয়ে আমাদের দিন চলে যায়। কখনো ভাবতেই পারি নাই সুধাংশু নিজে উপার্জন করবে। সেই টাকায় আমাদের সংসার চলবে। ওর বাবা বেঁচে থাকলে এটা দেখে অনেক খুশি হতো।’
সুধাংশুর দোকানের সামনের সড়ক দিয়ে নিয়মিত যাতায়াত করেন নালিতাবাড়ী পৌর শহরের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর জহুরুল হক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সব সময় সুধাংশুকে কর্মব্যস্ত দেখি। প্রতিবন্ধী হয়েও শুধু মনের জোরে স্বাবলম্বী হওয়া যায়, সুধাংশু সূত্রধর এর বাস্তব উদাহরণ। সুধাংশু প্রতিবন্ধিতা ছাপিয়ে যে কাজ করেন, তা অন্যদের প্রেরণা হতে পারে।’