সংস্কারে বদলে গেছে পঞ্চগড়ের ছেপড়াঝার মসজিদের স্থাপত্যগত ঐতিহ্য
পঞ্চগড়ের ছেপড়াঝার মসজিদ নিয়ে প্রচলিত আছে নানা কথা। ঠিক কবে, কারা এই মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন, তার সঠিক ইতিহাস স্থানীয়রা বলতে পারেননি। তবে মসজিদটি মোগল আমলে নির্মাণ করা হয়েছে বলে ভাষ্য গবেষকদের।
পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা ছেপড়াঝার-পাহারভাঙ্গা গ্রামে মসজিদটির অবস্থান। উপজেলা শহর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত মসজিদটি যুগ যুগ ধরে নজর কেড়েছে পর্যটকদের। একই উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মির্জাপুর শাহি মসজিদের স্থাপত্যরীতির সঙ্গে মিল রয়েছে তিন গম্বুজবিশিষ্ট এই মসজিদের।
তবে সময়ের বিবর্তনে মুসল্লিদের চাহিদা আর ধারণক্ষমতা বিবেচনায় কিছু সংস্কার ও সম্প্রসারণ করায় ঢেকে গেছে স্থাপত্যগত ঐতিহ্য। মসজিদটি এক যুগ আগে যাঁরা দেখেছেন, তাঁদের কাছে বর্তমান অবস্থা দেখলে অন্য রকম মনে হবে।
ছেপড়াঝার এলাকার প্রবীণ বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে আর বিভিন্ন ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, নকশা ও গঠন সাদৃশ্যের কারণে ধারণা করা হয় যে ছাপড়াঝার মসজিদ এবং মির্জাপুর শাহি মসজিদ দুটি মোগল আমলে একই সময়কালে নির্মিত। প্রশস্ত ইট ও চুন-সুরকি দিয়ে নির্মিত এই মসজিদের একসময় অনেক উচ্চতা ছিল। ভূমিকম্পে মসজিদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ধীরে ধীরে কিছু অংশ দেবে যাওয়ায় মূল দরজাগুলো স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা নিচে নেমে গেছে।
এই মসজিদের মূল কাঠামোর মেরামত করা না হলেও ২০১২ সালে মসজিদের বাইরের অংশ সম্প্রসারণ ও পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে, এতে ঐতিহাসিক স্থাপনাটির ঐতিহ্যগত সৌন্দর্যহানি হয়েছে।
পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও গবেষক নাজমুল হক তাঁর ‘পঞ্চগড়: ইতিহাস ও লোকঐতিহ্য’ বইয়ে লিখেছেন, ছেপড়াঝার মসজিদের দৈর্ঘ্য ২৫ ফুট এবং প্রস্থ ১৫ ফুট। মসজিদে প্রাপ্ত ভাঙা ফলক থেকে জানা যায়, ছেপড়াঝার মসজিদের নির্মাতা ছিলেন জনৈক শাহাদ মণ্ডল। এর নির্মাণকাল ছিল ১০৩৩ হিজরি। মোগল স্থাপত্যশৈলী বহনকারী ছেপড়াঝার মসজিদটিতে তিনটি গম্বুজ এবং চার কোণে চারটি ছোট আকারের চারটি মিনার আছে। মসজিদের দেয়ালে আছে টেরাকোটার চিত্র। গম্বুজের উপরিভাগ নকশাখচিত ও বলয় আকৃতির বেল্ট করা। মসজিদটিতে আছে প্রশস্ত ইটের তৈরি প্রাঙ্গণ, এর প্রবেশপথে আছে সুদৃশ্য তোরণ।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, মসজিদের ভেতরে অপূর্ব স্থাপত্যশৈলী। মসজিদের সামনের দেয়ালে আছে বেশ কিছু টেরাকোটা চিত্র। ভেতরে মিহরাবটি ঘিরে নানা নকশা। নতুন করে চারপাশের দেয়াল ও তিনটি গম্বুজ রং করা হয়েছে। সমানের দেয়ালে থাকা শিলালিপি প্রায় অস্পষ্ট। মসজিদের সামনে এখন আর প্রশস্ত প্রাঙ্গণ নেই। মূল মসজিদকে ঠিক রেখে মুসল্লিদের ধারণক্ষমতা বিবেচনায় বাইরের প্রাঙ্গণে নির্মাণ করা হয়েছে নতুন ভবন। এতে ভাঙা পড়েছে একসময় বাইরের প্রবেশপথে থাকা সুদৃশ্য তোরণটি। এতে মোগল স্থাপনাটি ঐতিহ্যগত সৌন্দর্য হারিয়েছে।
মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি আনিছুর রহমান বলেন, ছেপড়াঝার মসজিদটি মোগল আমলের ঐতিহ্য। একসময় এই মসজিদ এতটাই উঁচু ছিল যে ভারতের বিভিন্ন এলাকা থেকে দেখা যেত। কিন্তু দিন দিন এটি অনেকটা দেবে গেছে। এই মসজিদের ভেতরে একটি কাতারে ইমাম ছাড়া সর্বোচ্চ ১৭ জন নামাজ আদায় করতে পারতেন। এ জন্য স্থানীয় চাহিদা বিবেচনায় মূল মসজিদ ঠিক রেখে পেছনে প্রশস্ত করা হয়েছে। এতে মসজিদের মূল নকশায় কোনো পরিবর্তন করা হয়নি। তবে সংস্কারের কারণে সামনের অংশ ঢেকে গেছে।