দল বেঁধে বেড়ানোর যে উৎসব ছিল, তা আর নেই, কী কঠিন বড় হওয়াটা

মাসুদা সিদ্দিকা রুহীর ছোটবেলার স্মৃতি গেঁথে আছে যাপিত জীবনে একটা সুখের নদী হয়ে, একা হলে এই নদীগুলোতে তিনি ঝাঁপ দেন, শিহরিত হনছবি: আনিস মাহমুদ

তখন অনেক ছোট ছিলাম। আব্বা ঈদের দিনে আমাদের নিয়ে মসজিদে যেতেন। আব্বার আঙুল ধরে হাঁটতাম। মসজিদের কাছাকাছি যখন যেতাম, তখন দেখতাম সেখানে লেখা থাকত—‘সামনে মসজিদ, আস্তে চলুন’।

ছোটবেলার এই লেখাগুলো মনে যে দারুণ আলোড়ন তুলত, প্রাপ্তবয়সে সে আবেদন অনেকখানি গেল কমে। কিন্তু গেঁথে আছে যাপিত জীবনে একটা সুখের নদী হয়ে। একা হলে এই নদীগুলোতে ঝাঁপ দিই, শিহরিত হই। কম্পন জাগে, চোখটা কেমন ঝাপসা হয়ে আসে। আমি ফেলে এসেছি আমার সেই সব দিনরাত্রি। আমার ঈদ উৎসবে আজ একা হয়ে যাই। অথচ ছোটবেলায় দল বেঁধে বেড়ানোর যে উৎসব ছিল, তা আর নেই। কী কঠিন বড় হওয়াটা!

ছোটবেলায় ঈদে নতুন কাপড় আনলে লুকিয়ে রাখতাম কাঠের দেরাজ, নয়তো স্টিলের আলমারিতে। নতুন কাপড় দেখার জন্য চাচাতো বোনদের সে কী উঁকিঝুঁকি! কিন্তু কিছুতেই কাপড় দেখাতাম না, যদি ঈদ চলে যায়! যদি কাপড়টা পুরোনো হয়ে যায়! আহ, নতুন কাপড়ের ঘ্রাণ! সময়ের স্রোতে সেই ঘ্রাণটা যেন এখন বদলে গেছে।

আমাদের আব্বা-চাচা মিলে যৌথ পরিবার ছিল। নামাজ শেষ করে সব চাচাতো-মামাতো ভাই আসতেন আব্বা-আম্মাকে সালাম করার জন্য। সালাম শেষে যা পিঠা বানানো হতো, তাই পরিবেশন করা হতো। তার মধ্যে বকফুল মানে সিলেটি ভাষায় ‘নাইকোল পিঠা’ বলা হতো, তারপর লুচি, হান্দেশ, গ্লাসকাটা (কেউ বলেন নুনগড়া), সেমাই, হালুয়া ইত্যাদি নানা জাতের খাবার থাকত।

দুপুরে বড় ডেকচিতে রান্না হতো কোর্মা, পোলাও, মাংস ভুনা। রুটি দিয়ে আমরা মাংস খেতাম। চালের রুটি। এখন বড়বেলায় পিঠা তেমন একটা করি না। আমার ছোট সংসারে পিঠার বালাই নেই। রান্নাও ছোট সস প্যানে, ফ্রাই প্যানে। সেমাই এখন আর খেতে পারি না, তাই বানাইও না। আগে মা-চাচি-বোনেরা মিলে বাড়িতে একসঙ্গে পিঠা বানাতেন। বানানো পিঠাগুলো রাখতেন রসুইঘরের শিকেতে ঝুলিয়ে, যাতে বিড়াল আর আমাদের মতো কিছু দস্যির হাত থেকে রক্ষা পায়।

মাসুদা সিদ্দিকা রুহী
ছবি: সংগৃহীত

বিকেলে আইসক্রিম খেতে সিলেটের জিন্দাবাজার যেতাম। মামাতো-চাচাতো বোন মিলে রীতিমতো একটা ফুটবল টিম। রিকশাভাড়া যার যার। কজন মিলে ক্যামেরার রিল কিনতাম। ক্যামেরা হয়তো কারও কাছ থেকে ধার করা থাকত। আমরা ভাগ করে রিলের টাকা দিতাম। কোনো সময় ৩৬টা স্ন্যাপ, কখনোবা ৩২টা। সে কী আয়োজন! নেগেটিভ বের করে ছবি বাছাই করতাম। কার কতটা ছবি এবং তার টাকাও আলাদা। এই টাকাগুলো আমরা জমাতাম খুব যতনে। মাটির ব্যাংক তখন আমাদের ভরসা ছিল।

বড়বেলার ঈদের আনন্দ এতটা পানসে আর আবেগহীন হবে, কে জানত! এখন আর ঘুম থেকে জাগিয়ে দেওয়ার কেউ নেই। তাড়াতাড়ি উঠে গোসলে যাওয়ার তাড়া নেই। পুরুষেরা নামাজ থেকে আসার আগে আমাদের রেডি হওয়ার তোড়জোড় নেই। কোনোরকম কাকভেজা গোসল। নাশতা করে পারলে ঘুম। কী আশ্চর্য! আমি আমার স্বপ্নের দিন কোথায় ফেলে এসেছি।

আমি হাতভর্তি মেহেদি দিয়ে ঘুরছি এঘর–ওঘর। ছোট ভাইবোনকে মেহেদি পরিয়ে দিয়েছি। সেই আমি এখন মেহেদি পরি না। বড় হয়ে গেছি। আমার এখন কোনো যৌথ পরিবার নেই। বড় হেঁশেল নেই। কোথায় চলে গেল আমার ছোটবেলার ঈদ। এখন আর সুখ পোষা যায় না কেবল স্মৃতির দুয়ার খোলে চুপচাপ বসে রোমন্থন করা ছাড়া। আমাদের সুখস্মৃতি ছিঁড়ে গেছে; শিকড় যেমন ছিঁড়ে যায় তেমনি।

লেখক: কবি ও সহসভাপতি, সিলেট লেখিকা সংঘ; সাধারণ সম্পাদক, নন্দিনী সাহিত্য ও পাঠচক্র