মনিরামপুরে টিসিবির পণ্যের দাবিতে সড়ক অবরোধ, ইউএনওর অপসারণ দাবি

টিসিবি পণ্যের দাবিতে যশোরের মনিরামপুর পৌরসভা কার্যালয়ের সামনে যশোর-চুকনগর আঞ্চলিক মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ। সোমবার সকালে
ছবি: প্রথম আলো

যশোরের মনিরামপুর পৌরসভায় টিসিবির পণ্যের দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন বঞ্চিত ব্যক্তিরা। আজ সোমবার সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত মনিরামপুর পৌরসভা কার্যালয়ের সামনে যশোর-চুকনগর আঞ্চলিক মহাসড়ক অবরোধ করে প্রায় দুই হাজার মানুষ বিক্ষোভ করেন। এ সময় তাঁরা পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিশাত তামান্নার অপসারণ দাবি করেন।

বিক্ষোভকারীরা মহাসড়কে অবস্থান নেওয়ায় যশোর-চুকনগর আঞ্চলিক মহাসড়কের মনিরামপুর বাজারের দুই পাশে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। খবর পেয়ে সেনাবাহিনী ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) ঘটনাস্থলে এসে বিক্ষোভকারীদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেন। পরে উপজেলা বিএনপির সভাপতি শহীদ ইকবাল হোসেন এসে বিক্ষোভকারীদের আশ্বস্ত করে বাড়িতে পাঠান।

তবে মনিরামপুর পৌরসভার প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা মনিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিশাত তামান্না বলেন, সড়ক অবরোধ হয়নি। একসঙ্গে বহু মানুষ চলে আসায় পৌরসভার গেটে ভিড় হয়েছে।

ইউএনও বলেন, মনিরামপুর পৌরসভায় টিসিবি স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড আছে ২ হাজার ২৯৬টি। কার্ডগুলো গত বছরের ৫ আগস্টের আগে করা। তালিকায় ‘বিতর্কিত’ অনেকের নাম রয়েছে। এ জন্য কার্ডগুলো বিতরণ করা হয়নি। বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, জাতীয় পরিচয়পত্র দেখে গরিব মানুষদের বাছাই করে তাঁদের টিসিবির পণ্য দেওয়া হবে। কিন্তু এর আগে একটি রাজনৈতিক দলের একজন নেতা এসে হঠাৎ প্রশ্ন তোলেন, ‘আগে সাড়ে তিন হাজার কার্ড ছিল। বাকি কার্ড কোথায় গেল?’ এতে কিছুটা সমস্যা সৃষ্টি হয়। এ জন্য পণ্য বিক্রি স্থগিত রাখা হয়েছে। সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) প্রধান করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও ছাত্র প্রতিনিধিদের নিয়ে ১০ সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে। কমিটি তালিকা তৈরি করার পর টিসিবির পণ্য বিক্রি শুরু হবে।

পৌরসভা সূত্র জানায়, স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ডে রূপান্তরের আগে মনিরামপুর পৌরসভায় টিসিবির উপকারভোগী ছিলেন ২ হাজার ৭১২ জন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে টিসিবির ওই কার্ডগুলো স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ডে রূপান্তের পর কার্ডের সংখ্যা কমে হয় ২ হাজার ২৯৬। স্মার্ট কার্ডধারীদের জন্য ‘টিসিবি স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড সেবা’ নামে একটি সফটওয়্যার রয়েছে। তাতে প্রবেশ করে স্মার্ট কার্ড সক্রিয় করতে হয়। পৌরসভার এই সফটওয়্যারের ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড (ওটিপি) সাবেক পৌর মেয়র মাহমুদুল হাসানের মুঠোফোন নম্বরে সংযুক্ত। ওটিপি দিয়ে প্রবেশ করতে গেলে সেটা সাবেক মেয়রের কাছে চলে যাচ্ছে। তিনি পলাতক থাকায় তাঁর কাছ থেকে পাসওয়ার্ড উদ্ধার করা যাচ্ছে না। ওটিপি পরিবর্তনের জন্য বারবার আবেদন করেও সেটা সংশোধন করা যাচ্ছে না। এ কারণে স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে পণ্য বিতরণ সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে নিয়মতান্ত্রিকভাবে স্মার্ট কার্ডের বিপরীতে পণ্য বরাদ্দ এসেছে।

এ পরিস্থিতিতে আজ সকালে টিসিবির পণ্য বিতরণের কথা ছিল। কিন্তু তার আগে মাত্র কয়েক শ উপকারভোগীর মধ্যে জাতীয় পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে টিসিবি স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করা হয়। অন্যরা কার্ড না পেয়ে পণ্য বিতরণের খবর শুনে পৌরসভার গেটে এসে বিক্ষোভ করেন।

মনিরামপুর পৌরসভার হিসাবরক্ষক শাহিনুর রহমান বলেন, আজ সকালে টিসিবির পণ্য বিক্রি শুরু করার আগে লোকজন এসে হইচই শুরু করেন। এরপর পণ্য বিতরণ বন্ধ রাখা হয়।

মোহনপুর ওয়ার্ডের উপকারভোগী আমির হোসেন বলেন, ‘আগে আমাদের ওয়ার্ডে ৩০০ কার্ড ছিল। আজ সকালে সেখানে ১০০ জনের কার্ড দেছে। আমার কার্ড না পেয়ে পণ্যের দাবিতে রাস্তায় নেমেছি। আমরা বর্তমান ইউএনওর অপসারণ চাই।’

টিসিবির কার্ডধারী পৌরসভার বিজয়রামপুর গ্রামের ইউসুফ আলী বলেন, ‘আমাদের পাড়ার মধ্যে আমরা তিন ভাই গরিব। টিসিবির কার্ড শুরুর সময় থেকে আমরা তিন ভাই টিসিবির মাল পেয়ে আসছি। খবর পেয়ে আজ এসে আমাদের কার্ড খুঁজে পাইনি। মাল তো পেলামই না।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পৌর এলাকার এক উপকারভোগী বলেন, ‘আগে পৌর কাউন্সিলররা কার্ড বিতরণ করতেন। এখন তাঁদের পরিবর্তে এলাকার কয়েকজন এ দায়িত্ব পালন করেন। তাঁরা ঠিকমতো লোকজনকে চেনেন না। একজনের কার্ড অন্যজনকে দিয়ে দিচ্ছেন। আমি লোকজন ধরার পর আজ (সোমবার) সকালে একটা কার্ড দিয়েছে। তাতে অন্য নাম লেখা।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকার দেশের সব পৌরসভার মেয়র ও কাউন্সিলরদের বরখাস্ত করার পর মনিরামপুর পৌরসভার প্রতিটি ওয়ার্ডে ইউএনওর পক্ষ থেকে উপজেলা পরিষদের বিভিন্ন কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মাধ্যমে টিসিবির কার্ড বিতরণের কথা থাকলেও মনিরামপুরে সেটা হয়নি।

পৌরসভায় টিসিবির পণ্য বিতরণের দায়িত্বে থাকা পরিবেশকের এক সহকারী শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ২ হাজার ৩০৮ জনের পণ্য বরাদ্দ পাইছি। ৫৪০ টাকা মূল্যে প্রতি কার্ডের বিপরীতে পাঁচ কেজি চাল, দুই কেজি ডাল, এক কেজি চিনি ও দুই লিটার সয়াবিন তেল বিক্রির কথা ছিল। হট্টগোলের কারণে পণ্য বিতরণ করতে পারিনি।’