ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের কারণে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় পানি না থাকায় উত্তরাঞ্চল মরুভূমি হয়ে যাচ্ছে। আবার বর্ষায় এক থেকে দেড় কিলোমিটারের তিস্তা ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার হয়ে যাচ্ছে। বর্ষায় ভারত হঠাৎ পানি ছেড়ে দেওয়ায় তিস্তাপারের বাসিন্দাদের ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে এমন অবস্থা চললেও সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি। উল্টো তিস্তা মহাপরিকল্পনার নামে তাঁদের সঙ্গে ধোঁকাবাজি করা হয়েছে।
আজ রোববার বিকেলে রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার তিস্তা রেলসেতু-সংলগ্ন এলাকায় তিস্তা নিয়ে গণশুনানিতে তিস্তাপারের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও বাসিন্দারা তাঁদের দুঃখ-দুর্দশার কথা তুলে ধরেন।
রংপুর জেলা প্রশাসন আয়োজিত গণশুনানিতে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং স্থানীয় সরকার, পল্লি উন্নয়ন ও সমবায় উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
গণশুনানি উপলক্ষে রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার তিস্তাপারের কয়েক হাজার বাসিন্দা সকাল থেকে শুনানিস্থলে জড়ো হন। বেলা তিনটার দিকে দুই উপদেষ্টাসহ রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রবিউল ফয়সাল, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এ কে এম তারিকুল ইসলাম, জাতীয় নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব আখতার হোসেনসহ অতিথিরা মঞ্চে ওঠেন।
জাতীয় নাগরিক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক আতিক মুজাহিদ তিস্তা নদী ও নদীপারের মানুষের সুরক্ষায় সাত দফা প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। আতিক মুজাহিদ বলেন, তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে হবে, প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আদালতে যেতে হবে। তিস্তাপারের জেলাগুলোর মানুষ নদীভাঙনের শিকার হলে তাঁদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। তিস্তার অনেক চরে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের কার্যক্রম নেই। চরগুলোর মানুষের মধ্যে চরম বেকারত্ব। এসব সমস্যার সমাধান করতে হবে। নদী ভাঙলে কৃষকের জমি যেন খাস না হয়, সেই আইন করতে হবে।
গণশুনানিতে লালমনিরহাট, রংপুর ও নীলফামারীর জাতীয় নাগরিক কমিটি ও বিএনপির স্থানীয় কয়েকজন নেতা বক্তব্য দেন। জাতীয় নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন, তিস্তার দুই পাড়ে অরক্ষিত বাঁধের কারণে তিস্তাপারের জেলার মানুষের জীবন বিপন্ন হয়েছে। জমি উদ্ধার করে কৃষকের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
গণশুনানিতে তিস্তাপারের অন্তত ১০ জন বাসিন্দা তাঁদের দুঃখ-দুর্দশার কথা তুলে ধরেন। লালমনিরহাটের রাজপুরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক আবদুস সালাম বলেন, ‘হামার হইছে কপাল পোড়া। হামার দুঃখ কাইও দেখে না। হামার রাজপুর আর রাজপুর নাই। তিস্তা নদীর ভাঙনে রাজপুর ফকিরপুর হয়া গেইছে। একনা চরোত যাও, হামার বাড়িভাঙা না দেইখলে হামার দুঃখ বুঝবেন না। এবার হামাক ঠকান না বাহে।’
রংপুরের কাউনিয়ার চর হজরত খাঁ চরের বাসিন্দা আলমগীর হোসেন বলেন, তাঁর বাবার ৩০০ বিঘা জমি ছিল। কিন্তু তিস্তা নদীতে জমি বিলীন হওয়ায় তার বাবা ঢাকায় নিরাপত্তা প্রহরীর চাকরি করেন। মাঝেমধ্যে রিকশা চালান। তিনি তিস্তার ভাঙন রোধে অন্তর্বর্তী সরকারকে পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান।
গণশুনানির পর প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে আগে কী করা হয়েছিল, তা জানানো হয়নি। তাঁরা জেনেছেন যে তিস্তা মহাপরিকল্পনার কথা বলা হয়েছিল, তা টেকসই হতো না। তাঁরা চীনের পাওয়ার চায়নাকে বলেছেন, তিস্তাপারের মানুষের সঙ্গে আলোচনা করে তিস্তা মহাপরিকল্পনা করতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রবাহিত তিস্তা নদীর ৪০ কিলোমিটার এলাকা ভাঙনপ্রবণ। এর মধ্যে ২০ কিলোমিটার এলাকা অতি ভাঙনপ্রবণ। এই ভাঙন রোধে আগামী মার্চ থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ড নদীর তীর সুরক্ষার কাজ শুরু করবে।
স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, তিস্তায় দীর্ঘ চর জেগে উঠেছে। চরের জনসংখ্যার অনুপাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করা হবে। রংপুর অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন ব্যাপক হলেও শিল্প অবকাঠামো না থাকায় কৃষকেরা ফসলের দাম পান না। এ জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক কৃষিপণ্যের হিমাগার তৈরি করা হবে। মানসম্মত শিক্ষা বাড়াতে প্রতিটি উপজেলায় একটি করে আধুনিক পাঠাগার করা হবে।
গণশুনানিতে অন্যদের মধ্যে লালমনিরহাট সদর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা এ কে এম মমিনুল হক, কাউনিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি এমদাদুল হক, জাতীয় নাগরিক কমিটির নেতা আবু সাইদ প্রমুখ বক্তব্য দেন।