বগুড়ায় দুদকের মামলায় যুবলীগ নেতা মতিন সরকারের ১৩ বছরের কারাদণ্ড
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলায় বগুড়ার আলোচিত যুবলীগ নেতা ও সাবেক পৌর কাউন্সিলর আবদুল মতিন সরকারকে ১৩ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অপরাধে তাঁকে ২ কোটি ২৮ লাখ ৩১ হাজার ৩১৫ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার বগুড়ার স্পেশাল জজ মো. শহীদুল্লাহ শুনানি শেষে এ রায় ঘোষণা করেন। আদালত অর্থদণ্ড ছাড়াও আবদুল মতিন সরকারের অবৈধভাবে অর্জিত ২ কোটি ২৮ লাখ ৩১ হাজার ৩১৫ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ রাষ্ট্রীয় অনুকূলে জব্দের নির্দেশ দেন।
আবদুল মতিন সরকার বগুড়া শহর যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি বগুড়া শহরের চকসূত্রাপুর এলাকার মৃত মজিবর রহমান সরকারের ছেলে। তাঁর বিরুদ্ধে ডজনখানেক হত্যা মামলা ছাড়াও অস্ত্র, মাদক আইনেও একাধিক মামলা রয়েছে। গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর নতুন করে একাধিক হত্যা মামলায় আসামি হওয়ায় তিনি আত্মগোপনে আছেন।
মামলা সূত্রে জানা যায়, আবদুল মতিন সরকারের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ওঠার পর ২০১৮ সালের মার্চে দুদক থেকে তাঁর কাছে সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশ পাঠানো হয়। ওই মাসেই মতিন সরকার দুদকে স্থাবর-অস্থাবর মিলে মোট ৩ কোটি ৫৮ লাখ ৭১ হাজার ৮৮১ টাকার সম্পদের হিসাব দাখিল করেন। কিন্ত দুদকের অনুসন্ধানে তাঁর বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত ২ কোটি ২৮ লাখ ৩১ হাজার ৩১৫ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও ১ কোটি ৪২ লাখ ১৯ হাজার ৪৯৩ টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ উঠে আসে।
এ পরিস্থিতিতে প্রাথমিক অনুসন্ধান শেষে বগুড়া সমন্বিত দুর্নীতি দমন কার্যালয়ের (দুদক) তৎকালীন সহকারী পরিচালক আমিনুল ইসলাম বাদী হয়ে বগুড়া সদর থানায় ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর দুদক আইন ২০০৪-এর ২৬ ও ২৭ (১) ধারায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেন। পরে তদন্ত শেষে দুদক মতিন সরকারের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে।
দুদকের আইনজীবী আবুল কালাম আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, মতিন সরকারের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আদালত তাঁকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন। এ ছাড়া সম্পদের তথ্য গোপন করার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আদালত তাঁকে আরও তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেন। এক মামলার সাজার মেয়াদ শেষে আরেক মামলার সাজা কার্যক্রম শুরু হবে বলেও আদালত আদেশে উল্লেখ করেছেন।
আদালত সূত্র জানায়, দুপুর সোয়া ১২টার দিকে আদালতে মতিন সরকারের বিরুদ্ধে করা দুদকের মামলার রায় শুনানি শুরু হয়। রায় পড়ে শোনানোর আগে বগুড়ার স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক মো. শহীদুল্লাহ দুদক আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলির কাছে জানতে চান, আসামি কোথায়? পিপি আবুল কালাম আজাদ এ সময় আদালতকে বলেন, আসামি পলাতক। আদালত এ সময় রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিকে জিজ্ঞাসা করেন, রাষ্ট্র আসামির কী শাস্তি চান? দুদকের পিপি আবুল কালাম আজাদ প্রত্যুত্তরে বলেন, সর্বোচ্চ শাস্তি।
যেভাবে উত্থান মতিন সরকারের
খুবই দরিদ্র পরিবারে জন্ম আবদুল মতিন সরকার ওরফে কসাই মতিনের। বাবা মজিবর রহমান শ্রমজীবী ছিলেন। বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল আলম ওরফে মোহনের ‘দেহরক্ষী’ হিসাবে রাজনীতিতে উত্থান মতিন সরকারের।
২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর মতিন সরকারের কপাল খুলে যায়। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় বগুড়া শহরে নানা অপরাধ নিয়ন্ত্রণ শুরু করেন। শহর যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদকের পদ বাগিয়ে নেন। পরে পরিবহনে চাঁদাবাজি, জায়গাজমি দখল, টেন্ডার বাণিজ্য, বড় বড় হাটের ইজারা নিয়ন্ত্রণ, মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণসহ নানা অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। আলিশান গাড়ি, বাড়ি শূন্য থেকে রাতারাতি কোটিপতি বনে যান। অস্ত্র, মাদক, হত্যা মামলা মাথায় নিয়েও বীরদর্পে বগুড়া শহরে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন তিনি। জেলা চামড়া ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং জেলা ট্রাক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদকের পদও দখল করেন।
আবদুল মতিন সরকার ২০০০ সালে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হন। সেই মামলায় ২০০৭ সালে ২৭ বছরের কারাদণ্ড হয় তাঁর। এ ছাড়া ১৯৯৮ সালে চকসূত্রাপুর এলাকার মো. রসুল হত্যা, ২০০১ সালে একই এলাকার আবু নাসের উজ্জ্বল হত্যা, ২০১১ সালে বগুড়া শহরের মাটিডালির বাণিজ্য মেলায় শফিক চৌধুরী হত্যা, ২০১৩ সালে যুবদল নেতা ইমরান হত্যা মামলা হয়। ২০১২ সালে মাদকসহ র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হলেও অল্পদিনেই বেড়িয়ে আসেন তিনি।
২০১৭ সালের ১৭ জুলাই কলেজে ভর্তির কথা বলে এক ছাত্রীকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে আবদুল মতিন সরকারের ছোটভাই তুফান সরকার ধর্ষণ করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। পরে তুফানের স্ত্রী ও তার বড় বোন নারী কাউন্সিলর এবং তুফানের লোকেরা ওই ছাত্রী ও তার মায়ের ওপর নির্যাতন চালান। এরপর দুজনেরই মাথা ন্যাড়া করে দেন। এ ঘটনায় ছাত্রীর মা বাদী হয়ে থানায় তুফানসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এ ঘটনার পর অভিযোগ ওঠে, বড় ভাই মতিন সরকারের প্রভাব খাটিয়েই তুফান এ অপকর্ম করেছেন। দুদকের মামলায় ১৩ বছরের সাজাপ্রাপ্ত তুফান সরকার বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।
আবদুল মতিন সরকার সর্বশেষ পৌরসভা নির্বাচনে বগুড়া শহরের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন।