৪২ বন্ধু একত্র হয়ে মানুষের অভাব-দুঃখ লাঘবের লড়াই

৮৪ ইভেন্টের পক্ষ থেকে দুস্থ এক নারীকে দোকান করে দেওয়া হয়। এতে তাঁর পরিবারে স্বচ্ছলতা ফিরেছে। সম্প্রতি বরিশাল নগরের ব্রাউন কম্পাউন্ড এলাকায়ছবি: প্রথম আলো

এত দিন যে যাঁর সাধ্যমতো মানুষের পাশে দাঁড়াতেন তাঁরা। একসময় উপলব্ধি করলেন—ছোট ছোট প্রয়াসগুলো একসঙ্গে করলে আরও বড় কিছু করা সম্ভব। সেই ভাবনা থেকে সবাই মিলে গড়ে তুললেন একটি প্ল্যাটফর্ম। যার মাধ্যমে অসহায় নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের পুনর্বাসন করা হচ্ছে। সুপেয় পানির জন্য স্থাপন করে দেওয়া হচ্ছে গভীর নলকূপ। শিক্ষা ও চিকিৎসা সহায়তার পাশাপাশি দরিদ্রদের স্বাবলম্বী করতে ব্যবসার পুঁজি-উপকরণও দেওয়া হচ্ছে।

২০২৩ সালে গড়ে ওঠা প্ল্যাটফর্মটির নাম ‘৮৪ ইভেন্ট’, যা ৪২ জন সদস্যের নিরলস প্রচেষ্টায় মানবসেবার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংগঠনটি নিজেদের মধ্যে চাঁদা তুলে ২০ লাখ ৫০ হাজার টাকা বিভিন্ন সহায়তা কার্যক্রমে ব্যয় করেছে।

এই উদ্যোগের সদস্যদের কেউ প্রবাসী, আবার কেউ দেশে ব্যবসা কিংবা সরকারি চাকরিতে প্রতিষ্ঠিত। তাঁরা প্রতি মাসে ন্যূনতম এক হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা দেন। পাশাপাশি নিজেদের জাকাতের অর্থ থেকেও একটি অংশ এই তহবিলে প্রদান করেন।

২০২৫ সালে সংগঠনটি খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, গভীর নলকূপ স্থাপন, বৃক্ষরোপণ ও পুনর্বাসনসহ বিভিন্ন প্রকল্পে ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা সহায়তার দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এই কার্যক্রম সিরাজগঞ্জ, নরসিংদী, ঢাকা, মুন্সিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, উজিরপুর, ভোলা, বানারীপাড়া, খাগড়াছড়ি ও বরিশালে পরিচালিত হবে।

এই প্ল্যাটফর্মটি গড়ে তোলার চিন্তা এসেছিল সিরাজগঞ্জের বাসিন্দা শারমিন স্নিগ্ধার কাছ থেকে। রাজধানীর ইডেন কলেজ থেকে রসায়নে স্নাতক করা এই নারী দীর্ঘদিন স্বাস্থ্য বিভাগের বিভিন্ন বেসরকারি প্রকল্পে কাজ করেছেন মুন্সিগঞ্জ ও ঢাকায়। এরপর নিজের জেলায় ফিরে এসে একটি অনলাইন খাবারের দোকান চালু করেন।

শারমিন স্নিগ্ধা জানান, সচ্ছল পারিবারিক পরিবেশে বড় হলেও মানবসেবার এক অন্তর্নিহিত তাগিদ সব সময় তাঁকে তাড়িত করত। বছরের পর বছর ধরে তিনি দুস্থ নারী ও শিশুদের জন্য কাজ করে আসছিলেন। নিজের রান্না করা খাবার স্টেশনে গিয়ে অসহায় মানুষদের মাঝে বিতরণ করতেন। সেই হাস্যোজ্জ্বল মুখগুলোর প্রতিক্রিয়া তাঁকে আপ্লুত করত। কিন্তু একা কতটুকুই–বা করা যায়! তিনি চেয়েছিলেন আরও বড় পরিসরে কিছু করতে।

কিশোরগঞ্জে দুস্থদের সাবলম্বী করার জন্য ৮৪ ইভেন্টের পক্ষ থেকে ব্যবসার দেওয়া হয়
ছবি: সংগৃহীত

প্রথম দিকে তিনি ফেসবুকে নিজের ইচ্ছার কথা শেয়ার করতেন, কিন্তু সাড়া পাননি। পরে তিনি এসএসসি ৮৪ ব্যাচের ফেসবুক গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত হন। সেখানেও তাঁর ভাবনার কথা তুলে ধরেন। একদিন বরিশাল জিলা স্কুলের ৮৪ ব্যাচের ছাত্র যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী মির্জা শওকত তাঁর কাছে জানতে চান, তিনি আসলে কী করতে চান? শারমিন সবিস্তার তাঁর পরিকল্পনার কথা জানান। শওকত তাঁকে প্রথমে ক্ষুধার্তদের জন্য খাবার বিতরণের পরামর্শ দেন। কিন্তু শারমিন জানালেন, তিনি কেবল খাবার বিতরণেই সীমাবদ্ধ থাকতে চান না—তিনি চাইছেন অসহায় মানুষদের স্বাবলম্বী করে তুলতে।

শওকত তাঁর প্রস্তাবকে সমর্থন জানিয়ে বরিশাল জিলা স্কুলের তাঁদের সহপাঠী বন্ধু সাজ্জাদ পারভেজের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। সাজ্জাদ সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক। তিনি নীরবে-নিভৃতে মানবসেবামূলক কাজ করতেন। সাজ্জাদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি কাঠামো ও পরিকল্পনা তৈরি করা হয়। ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে বরিশালের মির্জা শওকত, শাহাদাত হোসেন, ফারুক মোদী, ফরিদা আখতার সেতু, জাকি মাহমুদ, ধীমান খীসাসহ আরও কয়েকজন বন্ধু একত্র হয়ে ৮৪ ইভেন্ট গ্রুপের যাত্রা শুরু করেন।

শারমিন স্নিগ্ধা প্রথম আলোকে বলেন, ‘মানুষ হিসেবে জন্ম নিয়ে যদি নিজেই ভালো থাকি, তাহলে এই জন্ম তো নিরর্থক। হয়তো আরও আগে কাজটা শুরু করতে পারলে আরও বেশি মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারতাম। আমাদের এই কাজটার পরিসর হয়তো খুব বড় নয়, তবে সবাই যদি যে যার অবস্থান এগিয়ে এসে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াই, তাহলে নিজেদের আত্মার যেমন পরিশুদ্ধিতা আসবে, তেমনি মানুষের অভাব-দুঃখ কিছুটা হলেও লাঘব হবে।’

বরিশাল নগরের বেলস পার্কের ল্যাম্পপোস্টের অস্পষ্ট আলোর নিচে সাত ও আট বছরের আমেনা, মোহাইমিনা গোলাপ ফুল বিক্রি করে। ওরা নগরের রসুলপুর বস্তিতে থাকে। মা–বাবা, তিন বোন এক ভাই মিলে ছয়জনের পরিবারে তিন বেলা খাবারও জোটে না। তাই পড়াশোনা বাদ দিয়ে সন্ধ্যায় উদ্যানে ফুল বিক্রি করে সামান্য আয় করে দুই বোন সংসারে সহায়তা করে। এই দুই শিশুর পাশে দাঁড়ায় ইভেন্ট ৮৪। দুই শিশুর পরিবারের সঙ্গে কথা বলে তাদের স্কুলের পোশাক, শীতের কাপড়সহ পরিবারকে অন্যান্য সহায়তা দেয়। একই সঙ্গে দুই শিশু যাতে অবসর সময়ে ফুল বিক্রি করতে পারে, সে জন্য সরঞ্জাম ও পুঁজি সহায়তা দেয়। আমেনা বলল, ‘অভাবের জন্য মোরা আগে পড়াল্যাহা করতাম না। এখন আবার স্কুলে যাই, ফুলও বেচি।’

এভাবে ৮৪ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে স্কুলড্রেস ও শিক্ষাসামগ্রী বিতরণ করে আবার বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে নিয়েছে দুস্থ পরিবারের শিশুদের। কিশোরগঞ্জে ১০ জন প্রতিবন্ধীকে ব্যবসার উপকরণ দিয়ে সহায়তা করেছে প্ল্যাটফর্মটি। এখন তাঁরাও পরিবারে ও সমাজের মূল ধারায় নিজেদের শামিল করতে পেরেছেন।

সুপেয় পানি নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন এলাকায় নয়টি নলকূপ স্থাপন করে দিয়েছে ৮৪ ইভেন্ট। ছবিটি সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার জগতগাতি গ্রামের
ছবি: সংগৃহীত

সংগঠনটির উদ্যোক্তারা জানান, সংগঠনটি প্রতিষ্ঠার পর এখন পর্যন্ত ১৭ জন অসুস্থ ব্যক্তিকে চিকিৎসা সহায়তা, ৯টি নলকূপ স্থাপন করে সুপেয় পানি নিশ্চিত করা, ১৮ জনকে উন্নত জাতের ছাগল, ৭ জনকে সেলাই মেশিন, ১০ জনকে হাঁস দিয়ে পুনর্বাসন করা হয়েছে। এবার ঈদ সামনে রেখে ২১২ জন নারী, শিশু ও বৃদ্ধকে নতুন কাপড়, ২০০ পরিবারকে এক মাসের খাদ্যসহায়তা, ৫০০ পরিবারকে ঈদসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে।

সংগঠনটির উদ্যোক্তাদের অন্যতম সাজ্জাদ পারভেজ বলেন, ‘আমরা এখানে যাঁরা একত্র হয়েছি, তাঁরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু মূল্যবোধের জায়গা থেকে আমরা মনে করি, মানুষ, সমাজ, পরিবেশ, প্রকৃতির জন্য আমাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে, যা আমরা অবজ্ঞা করতে পারি না। সে জন্য আমরা এমন উদ্যোগকে এগিয়ে নিচ্ছি। প্রতিবছর আমাদের তহবিল বাড়ছে, কাজের পরিসরও বাড়ছে। এই মানবিক সংগঠনটি প্রমাণ করেছে যে সঠিক উদ্যোগ ও সদিচ্ছা থাকলে বন্ধুত্ব কেবল ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা মানবতার কল্যাণে বিস্তৃত হতে পারে।’